স্মরণে রফিক জামান: প্রতিবন্ধী মানুষের মুক্তির আন্দোলন ও আমরা

নিশাত আফরোজ কান্তা

শূন্যতা মানেই শেষ নয়। চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনের গন্তব্য শেষ হলেও মানুষের রেখে যাওয়া কর্ম, আদর্শ ও চেতনা তাকে অমর করে রাখে। রফিক জামান রিমু এমনই একজন, যিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা চর্চার বিরোধিতা করে সামষ্টিক এবং সামগ্রিক নেতৃত্ব চর্চার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে তাদের এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছিলেন।

প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে সমন্বয় এবং তাদের স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাত্রা চর্চা অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্য বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গত ১২ মার্চ প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) কার্যালয়ে ‘স্মরণে রফিক জামান: প্রতিবন্ধী মানুষের মুক্তির আন্দোলন ও আমরা’ শীর্ষক এক স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। সভায় উপস্থিত আলোচকগণ মনে করেন, রফিক জামানের শূন্যস্থান পূরণের মতো গ্রহণযোগ্যতা এ মুহূর্তে কারও নেই, তবু মুক্তবুদ্ধির চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও পথনির্দেশনাকে কর্মে পরিণত করতে প্রতিবন্ধী তরুণ নেতৃত্বকে হাল ধরতে হবে।

সভায় বক্তব্য প্রদানকালে শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন সোসাইটি অব দ্যা ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজারর্স (এসডিএসএল) ও পিএনএসপির সভাপতি এম ওসমান খালেদ বলেন, বাংলা ইশারা ভাষার স্বীকৃতি এবং প্রসারে রফিক জামানের ভ‚মিকা অনস্বীকার্য। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসংগঠন (ডিপিও) সমূহের মধ্যে সমন্বয় তৈরি ও তাদের প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্ব চর্চার প্রতি তাগিদ দিয়ে রফিক জামান কাজ করতেন। প্রতিবন্ধী মানুষের খাতে তার দশ বছরের কর্মজীবন কেটেছে এই প্রচেষ্টাতেই।

পিএনএসপির সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব বলেন, রফিক ভাই প্রতিবন্ধিতাকে মানববৈচিত্র্য হিসেবে স্বীকার করে আমাদের এ নিয়ে গর্ব করতে বলতেন। অসুস্থতা, অস্বাভাবিকতা ইত্যাদি নেতিবাচক ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মমর্যাদাসহ জীবনধারণে উদ্বুদ্ধ করতেন। সেই চেতনা নিয়ে রাজনৈতিক এবং বিভিন্ন কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মুক্তির পথকে আমাদের নিজেদের খুঁজে নিতে বলতেন তিনি। প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়নের প্রশ্নে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে পিএনএসপির পক্ষ থেকে আমাদের সাধ্যমতো কাজ করে যাব।

জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে বেসরকারি সেবা প্রদানকারী সংস্থায় কর্মরত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, রফিক জামানের শূন্যতা পূরণ সম্ভব নয়। কারণ, আমাদের মধ্যে সঠিক সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে এই সমন্বয় সাধনে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো গ্রহণযোগ্যতা এ মুহূর্তে আমাদের নেই। তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি রফিক জামানের ক্ষমতাকেন্দ্রিক আকাঙ্খা ছিল না। তিনি ছিলেন প্রতিবন্ধী মানুষমুখী। সার্বিকভাবে তিনি প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়নের প্রতি জোর দিয়ে কাজ করতেন। মোশাররফ মনে করেন, আমাদের মধ্যে যৌথ নেতৃত্ব চর্চার প্রয়োজন রয়েছে এবং এভাবেই একসময় যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হবে।

জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের সাবেক সমন্বয়কারী এবং বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশে কর্মরত জাহিদ কবির টিটু বলেন, রফিক জামানের আশপাশের মানুষ যখন অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম ও সমৃদ্ধিশালী হচ্ছেন, তখন তিনি প্রান্তিক মানুষের সামগ্রিক পরিবর্তনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন তৈরির লক্ষ্যে কাজ করেছেন। জাহিদ কবির মনে করেন, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটে এবং জীবনের গন্তব্য শেষ হয়। এ কারণেই রফিক জামানের অসমাপ্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের খাতে কাজ করতে এসে রফিক জামান তার রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সর্বস্তরে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বশীল সক্রিয় অংশগ্রহণের দিকে জোর দিয়েছেন। তবে প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতার অভাবে অপ্রতিবন্ধী মানুষেরা সুযোগ নিচ্ছে। ফলে প্রতিনিধিত্বের চর্চা করা তাদের জন্য কঠিন।

রফিক জামানের দীর্ঘ নয় বছরের সহকর্মী ইফতেখার মাহমুদ বলেন, আমাদের মধ্যে ঐক্যমতের অভাবের প্রকটতা ব্যাপক। এ কারণেই এ দেশে এখন পর্যন্ত কোনো সাংস্কৃতিক বা আদর্শতাত্তি¡ক বিপ্লবের সূচনা হয়নি। যা হয়েছে তা এনজিওনাইজেশন প্রক্রিয়ার ফল। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মুক্তচিন্তা চর্চার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকৃত অর্থে আমাদের মুক্তির পথ নিজেদের কাছেই অজানা। শুধু উন্নয়ন কর্মকান্ডের নামে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নিমজ্জিত এবং অংশগ্রহণের মধ্যে জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন জগৎ থেকে বেরিয়ে আসার তাড়নায় নিয়োজিত রাখা হয় আমাদের। ফলে মুক্তির সংগ্রাম ব্যক্তি হিসেবে অনেকেই করছে কিন্তু সামষ্টিক লড়াই প্রয়োজন।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রিফাত তালুকদার মনে করেন, প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব চর্চা সম্ভব তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। একই সূত্রে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রাজীব বলেন, রফিক ভাই পিএনএসপিতে নিয়মিত আড্ডা-আলোচনার মাধ্যমে মুক্তচিন্তার চর্চা করতেন। এতে প্রতিবন্ধী তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেন। রফিক ভাই আমাদের উদ্দীপ্ত করতে পারতেন। পিএনএসপির এই চর্চা অব্যাহত রাখতে প্রতিবন্ধী মানুষের একত্র হওয়ার ক্ষেত্রে তাগিদ দেন সগির হোসাইন, আসমা আহমেদসহ সভায় উপস্থিত অনেকেই।

রফিক ভাই অনেক গতিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন উল্লেখ করে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষক মাহমুদা বলেন, প্রতিবন্ধিতার ধরনগত বৈচিত্র্য অবস্থান এবং চিরায়ত বিচ্ছিন্নতার মধ্যে নিহিত রয়েছে প্রতিবন্ধী মানুষেরা। তাই হয়তো অনেকেই তার এই গতিকে ভয় পেতেন। পরিচয়ের প্রথম দিকে আমিও ভয় পেয়েছি। কিন্তু তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ধীরে ধীরে এই ভীতি ভেঙে যায় এবং অনুপ্রেরণা পাই স্বাধীন চলাচলের।

একা চলার মধ্যেও আত্মবিশ্বাস অর্জন এবং তার কারণে জীবন পরিবর্তন হতে পারে, তা রফিক জামানের কাছে শেখেন নুরুন্নাহার তনিমা। তিনি বলেন, ঘরের বাইরে বাবা-মায়ের সঙ্গেই চলাফেরা করতে হয়েছে। কারণ, তারা ভয় পেতেন, কিন্তু রফিক জামানই প্রথমে আমার ও মা-বাবার এই ভীতি ভেঙে দেন। একা বাইরে চলাচলের সাহস জোগান। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী তনিমা বলেন, এরপর থেকে ঘরের বাইরে একা একাই চলছি। রফিক জামান আমাদের প্রতিবন্ধী মানুষের মন থেকে ভয়ভীতি বা অন্ধকার দূর করতে পারতেন।