প্রসঙ্গ; প্রতিবন্ধী নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন

সালমা মাহবুব

জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ খুব বেশি দিনের পুরোনো নয়। মূলত ১৯ শতকের শেষ থেকে নারীরা বিভিন্ন দেশে তাদের নির্বাচনে ভোটাধিকার অর্জন করতে শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ নারীদের ভোটের অধিকারকে উৎসাহিত করে এবং ১৯৭৯ সালে নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী ১৮৯টি দেশে তাদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সৌদি আরব এই সনদের তোয়াক্কা না করেই নারীদের ভোটাধিকার দেয়নি। যদিও ২০১৫ সালে তারা নারীদের ভোটাধিকার দিতে বাধ্য হন।

ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ইউএন ওমেন এর এক জরিপে দেখা যায়, ১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন দেশের সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব স্বতন্ত্র অথবা সংসদের নিম্ন কক্ষে আসন পাওয়ার হার ধারাবাহিকভাবে ১২ থেকে ২৩ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নারীর ক্ষমতায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ফলে বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নে উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮-এর সরাসরি ভোটে ২২ জন নারী সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। বিভিন্ন উচ্চ প্রশাসনিক পদে নারীদের নিযুক্ত করা হচ্ছে। সরকারি বা বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাÐ সংক্রান্ত কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব ছাড়া আমরা এখন ভাবতে পারি না। কিন্তু এই কমিটি বা শুধু নারীকেন্দ্রিক কমিটিগুলোতেও প্রতিবন্ধী নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায় না। বরং তাদেরকে কল্যাণের দৃষ্টিতে দেখা হয়, যেমনটি আগে সকল নারীকেই দেখা হতো।

যদিও জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদের ধারা ৬-এ নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে এবং ধারা ২৯-এ প্রতিবন্ধী মানুষের রাজনৈতিক ও জনজীবনে অংশগ্রহণ, ভোট প্রদান এবং নির্বাচিত হওয়ার অধিকার ও সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু এই সনদের আলোকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ তৈরি হলেও এখানে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন তো দূরের কথা, প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য আলাদা করে কোনো কিছুই তেমনভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষ উভয়েরই সাংবিধানিকভাবে ভোট প্রদানেই রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। অবাক করার মতো ব্যাপার হচ্ছে, মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষের ভোট দেওয়ার বিষয়ে এখনো আমাদের চিন্তাভাবনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা নিজেরাই এখনো মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারের বিষয়ে সচেতন নই। তারা নির্বাচনে ভোট দেবেন এবং প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন, এটা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য। জেলখানার কয়েদিদের ভোটাধিকার প্রয়োগে যারা সোচ্চার, তারা মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষের বিরোধিতা করে বলেন, মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষ বুঝেশুনে ভোট দিতে পারবেন না, প্রতিনিধি হবেন কীভাবে! যদিও তাদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা মোটেও সহজ কাজ নয়। ভোট পাওয়ার জন্য ভোটারদের কাছে গিয়ে বোঝাতে হয়। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষেরাও নির্বাচিত হওয়ার অধিকার অর্জন করতে পারেন। তবে তার জন্য প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ। আমাদের দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী মানুষের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রশিক্ষণ কাঠামোতে পরিবর্তন আনলে এ বিষয়ে ভাল ফল পাওয়া যাবে।

যেহেতু সুরক্ষা আইনের ধারা ৩৬-এ বলা হচ্ছে, প্রতিবন্ধিতার কারণে কারও প্রতি বৈষম্য করা যাবে না। অন্যদিকে সিডও-এর ৭ ধারায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে সকল নারীর জন্য। এছাড়াও নারী উন্নয়ন নীতিমালা, ২০১১-এর ধারা ৩২ এ নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ উল্লেখ করা হয়েছে। এই নীতিমালার জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৩ এর ধারা ৩২.৭ এ আলাদাভাবে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য সংসদে দুটি আসন সংরক্ষিত করা হয়েছে। সরকার প্রণীত এই কর্মপরিকল্পনাটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত করার কথা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত প্রতিবন্ধী নারীদের গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে প্রচারণাসহ কোনো রকম উদ্যোগ গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রাক-নির্বাচন, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময় মিলে চলে নির্বাচনী চক্র। এই চক্রের প্রতিটি ধাপে প্রতিবন্ধী নারীদের অংশগ্রহণ বা অন্তর্ভুক্তি জোরদার করা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার অর্জনের কার্যক্রমে যেমন প্রতিবন্ধী নারীর বিষয়টি গুরুত্ব পায় না, তেমনি সাধারণ নারীদের জন্য নেওয়া পদক্ষেপেও প্রতিবন্ধী নারীর বিষয়টি আমলে নেওয়া হয় না।

এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রতিবন্ধী নারীদের নির্বাচনী অধিকার বা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের চিত্র প্রায় একই হলেও কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য রয়েছে। যেমন ২০০৪ সালে আমাদের পাশের দেশ ভারতে নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করা হয়। ফলে সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদা বিবেচনায় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে। এ ছাড়া ভারতের মধ্যপ্রদেশ, তামিলনাড়–সহ নেপালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের সক্রিয় ভ‚মিকায় সেখানকার নির্বাচন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব করা হচ্ছে।

আমাদের দেশেও প্রতিবন্ধী নারীদের সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে তাদের প্রতিবন্ধী নারী সংগঠন গঠনের মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে একযোগে কাজ করতে হবে। তার লক্ষ্যে সরকারকে চাপ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সকল ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ও ভোটাধিকার রক্ষায় বিশেষ চাহিদা বিবেচনায় রেখে নির্বাচনী আচরণ ও পরিচালনা বিধি সংশোধন করতে হবে। ভোটকেন্দ্রে প্রবেশগম্যতা ও ভোটদানে গোপনীয়তা বজায় রেখে স্বাধীন পদ্ধতিতে ভোটদানের ব্যবস্থা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ধরনের ওপর সহায়তাকারীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অনুসারে ব্যক্তির সব ধরনের প্রতিবন্ধিতার তথ্য সংরক্ষণ এবং গোপনীয়তার অধিকার রক্ষা করতে হবে। তা ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রার্থী হিসেবে অন্তর্ভুক্তি, নির্বাচনী জনসচেতনতামূলক প্রচারণায় প্রতিবন্ধী নারীর উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াসহ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সকল পর্যায়ের কমিটিতে প্রতিবন্ধী নারীর জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একীভূত প্রশিক্ষণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পোলিং কর্মকর্তাদের প্রতিবন্ধী পুরুষ ও নারী সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের ওপর প্রশিক্ষণ ও বিভ্রান্তি দূরীকরণে সহায়কসংবলিত তথ্যপত্র প্রকাশ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবিষয়ক ফোকাল কর্মকর্তার কার্যাবলি ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করতে হবে, যাতে করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারে। নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কোটা বাস্তবায়ন ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটদানের বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে কেন্দ্রভিত্তিক প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষ আলাদা তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। প্রয়োজনে নির্বাচনের দিন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেন যানবাহন ব্যবহার করতে পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিবন্ধী নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনসমূহকে পর্যবেক্ষণের কাজে সম্পৃক্ত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সিআরপিডি সনদকে মূল সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করে ভোটাধিকার বা রাজনীতিতে অংগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাক্্-নির্বাচন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াকে হালনাগাদ করতে হবে।

ম্যানেজমেন্ট বডিজ অব সাউথ এশিয়া (ফেমবোসা) এর ষষ্ঠ সভায় সম্মিলিতভাবে সকল দেশের নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিবৃন্দ একটি ন্যূনতম সাধারণ মান তৈরিতে একমত হয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনার এ সভায় উপস্থিত থাকলেও এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিষয়টি বাস্তবায়নে অন্য ৮টি সদস্যদেশ কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা নজরে রাখতে হবে। প্রতিবন্ধী মানুষকে কীভাবে আরও বেশি স¤পৃক্ত করা যায়, সেই বিষয়ে আমাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের দেশ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে। এসডিজি লক্ষ্য ১০.২ তে বয়স, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা ইত্যাদি অবস্থা নির্বিশেষে ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। তাই অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাসহ সকল রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় প্রতিবন্ধী নারীর বিষয়গুলো আবশ্যিকভাবে এখনই অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোকে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ নেওয়াতে বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই। তা না হলে কাউকে পিছনে ফেলে নয় এই নীতি বাস্তবায়ন দূরূহ হয়ে পড়বে।