শোষণের বিরুদ্ধে এবং শোষিতের পক্ষে আন্দোলনকারী আন্তোনিও গ্র্যামসি

জাহেদ খান

আঠারো শতকের শেষ ভাগে জন্ম নেওয়া এবং উনিশ শতকের শুরুর দিকে ইতালির সবচেয়ে সাহসী সাংবাদিকতার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত আন্তোনিও গ্র্যামসির জীবনদর্শন এখনো অনেকের জীবনে প্রভাব রাখে। চিরকাল শোষণের বিরুদ্ধে এবং শোষিতের পক্ষে নির্ভীক কলমসৈনিক হিসেবে কাজ করে যাওয়া গ্র্যামসির জীবন নিয়ে প্রবল আগ্রহ রয়েছে অনেকের মধ্যেই।

আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। অসীম সমস্যা কাঁধে নিয়ে ছোট্ট গ্র্যামসি বেড়ে উঠেছেন। হার মানেননি নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কাছে। নতি স্বীকার করেননি নির্মম নিষ্ঠুর বাস্তবতা তথা দারিদ্র্যের কাছে। লড়াই চালিয়ে গেছেন নিজের ও সমাজের সঙ্গে। পরবর্তীকালে সমাজে প্রতিষ্ঠা অর্জনের পর লড়াই করেছেন স্বৈরাচারী শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে। বৈষম্যপীড়িত মানুষদের পক্ষে লড়াই করতে করতেই মানুষটি দেহ ত্যাগ করেন। 

নিপীড়িত শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে এবং কম্যুনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে লেখালেখি করার ফলে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরাগভাজন হন গ্র্যামসি। পার্লামেন্টে সদস্যপদ থাকা সত্ত্বেও ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে চরমপন্থী সরকার তাকে রোমে গ্রেপ্তার করে। অন্যায়ভাবে বিচারে দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাদন্ড দেওয়া হয় তাঁকে। শোষিত শ্রেণির এতটাই বিরাগভাজন ছিলেন তিনি, এমনকি বিচারকার্য চলাকালীন এক প্রসিকিউটর উত্তেজিত হয়ে দাবি করেন, গ্র্যামসির মস্তিষ্ক যত নষ্টের গোড়া, তাই বিশ বছরের জন্য কর্মহীন করে দিতে হবে এই মস্তিষ্ককে। বিচারক কথা রাখলেন এবং গ্র্যামসির শারীরিক প্রতিবন্ধিতাকে আগ্রাহ্য করে ২০ বছর ৪ মাস ৫ দিনের জন্য কারাবন্দী থাকার রায় দেওয়া হয় বিচারে। ইতালীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এই নেতাকে অন্যান্য কমিউনিস্ট নেতার সঙ্গে ১৯২৮ সালের ৪ জুন এই সাজা দেওয়া হয় এবং মাত্র ৯ বছর পরেই ১৯৩৭ সালের ২৭ এপ্রিল কারাগারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বৈষম্যপীড়িত মানুষের এই বন্ধু।  

কারাগারে বন্দীকালীন তিনি ডায়েরি লেখা শুরু করেন। তাঁর জীবনের ঘটনাবলি, চিন্তা-চেতনা, দার্শনিক আদর্শÑ সব ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ রাখেন। কারাগারে তাঁর ডায়েরিতে লেখা দর্শন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক বছর পর্যন্ত দিনের আলোয় আসেনি। তিনি কারাগারে বসে প্রায় ৫০০ চিঠি লিখেছিলেন। ফ্যাসিবাদের উত্থান, বামদের জয়জয়কার, পশ্চিমা পৃথিবীর স্বৈরাচারী মনোভাব, সমাজতন্ত্রের প্রয়োগ ও বৈশ্বিক মাত্রা এবং তাঁর সমাজতান্ত্রিক দর্শন সে সময়ে প্রচন্ড আলোড়ন তোলে। তাঁর লেখা রাজনৈতিক দর্শনে নতুন বাস্তবতা এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। 

গ্র্যামসির মৃত্যুর তেরো বছর পর ১৯৫০ সালের শেষের দিকে তাঁর লেখাগুলো প্রকাশ হতে শুরু করে এবং সবার দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়।

ইতালির সারডিনিয়ায় ১৯৮১ সালের ২২ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী আন্তোনিও গ্র্যামসির ছেলেবেলা কেটেছে চরম দারিদ্র্যে। তাঁর পিতা অন্যায়ভাবে জালিয়াতির অভিযোগে ১৮৯৭ সালে ৫ বছরের জন্য কারারুদ্ধ হন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অভাবে মা, ভাই, বোনকে নিয়ে বিপদে পড়েন গ্র্যামসি। তাই অর্থ উপার্জনে নামতে হয় তাঁকে। বাবা কারাগার থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর উপার্জিত অর্থেই চলেছে পরিবার। এগারো বছর বয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে গ্র্যামসি ট্যাক্স অফিসে দুই বছর কাজ করেন। তাঁর বাবার ৫ বছরের অনুপস্থিতির কারণে পরিবারকে নিয়ে টিকে থাকার জন্য প্রচুর সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁকে। গ্র্যামসির মেরুদন্ডে সমস্যার কারণে তিনি কুঁজো হয়ে চলাফেরা করতেন। ধারণা করা হয়, জন্মের সময় আয়ার হাত থেকে পড়ে গিয়ে মেরুদন্ডে আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। ফলে তিনি দীর্ঘদেহী ছিলেন না। উচ্চতায় তিনি ৫ ফুটের কম ছিলেন।

দুর্দশা আর দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে তিনি বিদ্যালয়ে ভালোভাবে শিক্ষার সুযোগ না পেলেও জ্ঞান আহরণের নেশা তাঁকে সব সময়েই প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। ছাত্র হিসেবে বেশ মেধাবী ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি নিজ প্রচেষ্টায় পড়াশোনা অব্যাহত রেখে স্কুলের বিভিন্ন বিষয়ে ভালো গ্রেড অর্জন করেন। 

তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ আসে তাঁর। যদিও দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যগত কারণে পড়াশোনা করতে যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তাঁর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি বিপ্লবী কারখানা পরিষদের আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে জড়ান। 

১৯১৫ সালে একজন প্রতিশ্রুতিশীল একাডেমিক স্কলার হওয়া সত্ত্বেও গ্র্যামসি পিএসআইয়ের সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠেন এবং সাংবাদিকতায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। তিনি তুরিন এডিশনে নিয়মিত কলাম লিখতেন, যা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়।