ঘরে বসে আয়: প্রতিবন্ধী নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন

সগীর হোসাইন খান

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ইত্যাদি অধিকার ভোগে খানিকটা হলেও গতি পেয়েছে। তবে গন্তব্য রয়েছে আরও দূরে। দেশের অধিকাংশ প্রতিবন্ধী মানুষ এখনো কর্মহীন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নেতিবাচক প্রভাবের ফলে সরকারি অনেক সুযোগ তারা ভোগ করতে পারেন না।

চাকরি প্রদানের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ স্বল্পমাত্রার প্রতিবন্ধী মানুষকে প্রাধান্য দেন। দেশের অবকাঠমোগত বাধা এবং সামাজিক নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তন না হলে এই অবস্থা বিরাজমান থাকবে বলেই ধরে নেওয়া যায়। সময় এসেছে সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিবন্ধিতার ধরনের ভিত্তিতে চাকরির অধিকার নিশ্চিতে সরকারের সুদৃষ্টির।

এ দেশে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার অভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবাধ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। ঘরবন্দী জীবন যাপনকারীদের মধ্যে অন্যতম হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষ। এর মধ্যে আবার প্রতিবন্ধী নারীরা ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছেন। একে প্রতিবন্ধী মানুষ হিসেবে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন, তার ওপর নারী হিসেবেও মোকাবিলা করতে হচ্ছে সামাজিক বৈষম্য। প্রবেশগম্যতার অভাব এবং পারিবারিক অতিরিক্ত নিরাপত্তা চিন্তায় তটস্থ তারা।

এই অবস্থার মোকাবিলায় অনেকেই আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মক্ষম ও উপার্জনক্ষম হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। এমন একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী নারী ফারজানা সুলতানা জ্যোতি। আড়াই বছর বয়স থেকে তিনি ঘরবন্দী। ঘরে বসেই মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ শেষে দীর্ঘদিন কর্মহীন কাটিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ ২০১১ সালে। জীবনের মোড় খানিকটা হলেও ঘুরে যায়। অনলাইনে টুকিটাকি কাজ করে ঘরে বসে আয় করতে শুরু করেন তিনি। গ্রাফিক ডিজাইন শেখার সিদ্ধান্ত নেন ২০১৫ সালে। বিভিন্ন ভিডিও টিউটেরিয়াল দেখে শিখতে শুরুও করেন। তার এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এন্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান)। বি-স্ক্যান এর স্বেচ্ছাসেবী শাহ আলম দায়িত্ব নেন জ্যোতিকে অনলাইনে গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ শেখানোর। চট্টগ্রাম থেকে শাহ আলম স্কাইপের মাধ্যমে ঢাকায় বসবাসরত জ্যোতিকে গ্রাফিক ডিজাইনের হাতেখড়ি দেন। এরপর মিজানুর রহমান মিজান এবং সোহাগ হোসেনের কাছে অর্থের বিনিময়ে নিজের দক্ষতাকে আরও ঝালিয়ে নেন তিনি। গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে মাসে তিন হাজার টাকার বেশি আয় করতে পারেননি এখনও পর্যন্ত।

জ্যোতির মতোই আরেকজন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী তাহমিনা আক্তার। বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ পাস করেন। চাকরির বেশ কিছু প্রস্তাব পেলেও চলাফেরার সমস্যার জন্য গৃহবন্দী জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছেন তাহমিনা। কিন্তু জীবিকা নির্বাহের স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি তিনি। সিদ্ধান্ত নেন ঘরে বসে কাজ করবেন। এই চিন্তা থেকেই অথেন্টিক আইসিটি’র অনলাইন বিজ্ঞাপনের প্রতিবেদন তৈরির কাজ করতে শুরু করেন। নিজের কর্মদক্ষতাকে বৃদ্ধি করতে ২০১৮ সালের শেষে Coders Trust Bangladesh -এর মাধ্যমে অনলাইনে ওয়ার্ডপ্রেস কাস্টমাইজেশন এবং গ্রাফিক ডিজাইন শেখেন। এখন তার স্বপ্ন আর দশজন সাধারণ তরুণের মতো তিনিও ঘরে বসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করবেন।

জ্যোতি ও তাহমিনার মতো অনেকেই রয়েছেন, যারা নিজেদের সামান্য যোগ্যতা ও শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের এক অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার অপেক্ষায়। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীদের এগিয়ে নিয়ে আসতে সরকারের রয়েছে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ। বাংলাদেশের জনশক্তির অর্ধেকই নারী। আমরা ভালো করেই জানি, এই অর্ধেক শক্তিকে অলস বা অকার্যকর রেখে দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে পঞ্চম লক্ষ্যমাত্রায় নারী-পুরুষের সমতার মাধ্যমে নারী সমাজকে এগিয়ে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। মাইক্রোসফট এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে ২০১৫ সালে আয়োজিত ‘ইনোভেশন ফর ইমপ্যাক্ট’ শীর্ষক কর্মশালার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নারীদের অবস্থান মাত্র ৩৩.৭%। এ প্রেক্ষিতে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীদের দক্ষ জনশক্তি এবং নারী উদ্যোক্তা বৃদ্ধিতে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের মন্ত্রণালয়সমূহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। যেমন নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘Info Lady’ বা তথ্য আপা; মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহিলা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন একাডেমি, মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রয়াস কর্মসূচি ‘জয়িতা’ ইত্যাদি। এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীরা তাদের দক্ষতার বিকাশ ঘটিয়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়তে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে চুড়ান্ত স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে। এই সফলতায় পুরুষের সমপরিমাণ অবদান রেখে নারীও দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে। নারী-পুরুষ শ্রেণিভেদে এই সাফল্য বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। প্রতিবন্ধী মানুষও এর মধ্যে অন্যতম। সরকার নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বী করতে বিভিন্ন প্রকল্প প্রণয়ন করছে। অন্যদিকে নারীদের মধ্যেও আরও বেশি পিছিয়ে পড়া, বঞ্চিত প্রতিবন্ধী নারীরা সরকারের দৃষ্টি থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। আবার তাদের মধ্যে যারা গৃহবন্দী তারা সমাজে লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে যাচ্ছে। তাই তাদের বিশেষভাবে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেন তারা রাষ্ট্র ও পরিবারের বোঝা হয়ে না থাকে।

অনেক সময় ধারণা করা হয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রকল্প প্রণয়ন মানে ব্যয় ও কাজের চাপ বেড়ে যাওয়া। অথচ সরকার গৃহীত প্রকল্পগুলোতে প্রযুক্তির সহায়তায় কিংবা সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্তের মাধ্যমে বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবা ও প্রশিক্ষণ প্রদান এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

সরকারের বিশেষ কর্মসূচিগুলোতে নারীদের বিভিন্নভাবে ক্ষমতায়িত করা হচ্ছে। যেমন প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ঋণ প্রদান, ব্যাংকে বিশেষ সুবিধা প্রদান প্রভৃতি। সরকারের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোতে প্রতিবন্ধী নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। আরও বেশি প্রয়োজন অনলাইনভিত্তিক প্রশিক্ষণের। এতে গুরুতর শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘরে বসে অংশ নিতে পারবে। তা ছাড়া মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমসমূহে আবাসন ব্যবস্থা রাখলে প্রতিবন্ধী নারীরা সহজেই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারবেন। সরকারের বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ প্রকল্পের মধ্যে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জন্য ভ্রাম্যমাণ কম্পিউটার ল্যাব একটি চমৎকার উদাহরণ। এমন ভ্রাম্যমাণ সেবাগুলোকে আরেকটু বিস্তৃত করে গৃহবন্দী প্রতিবন্ধী নারীদের কর্মপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যারা একদমই ঘর থেকে বের হতে পারেন না, তারাও উপার্জনক্ষম জনশক্তিকে রূপান্তরিত হতে পারে, তার দৃষ্টান্ত আকবর হোসেন। দেড় বছর বয়সে পোলিও থেকে তিনি প্রতিবন্ধিতা বরণ করেন। চলাফেরার জন্য হুইলচেয়ার একমাত্র ভরসা। ঘরে বসে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেছেন। এরপর থেকে ঘরই তার পৃথিবী। কিন্তু তাই বলে ‘আমিও আয় করবো’ ভাবনাটা বাদ দেননি। ঘরে পড়ে থাকা কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সংযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি গ্রাফিক ও ওয়েব ডিজাইনে হাতেখড়ি নেন। বর্তমানে তিনি ঘরে বসে অনলাইনে কাজ করে মাসে গড়ে ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন।

আকবর হোসেন মনে করেন, আরও বেশি প্রশিক্ষণ পেলে কাজের পরিধি বাড়াতে পারবেন। তাছাড়া এই দক্ষতা সময়ের সঙ্গে বৃদ্ধি করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণও নিতে হয়। তার স্বপ্ন একটি ডিজাইন স্টুডিও খোলা। এ জন্য তিনি সরকারের কাছে সহযোগিতা চান। তিনি আরও মনে করেন সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইনভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা হয় তাহলে তার মতো আরও অনেকের স্বপ্ন সহজে বাস্তবে রূপ নেবে। আকবর হোসেনের উদাহরণই প্রমাণ করতে যথেষ্ট যে সামান্য কিছু প্রয়াস সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হলে জ্যোতি কিংবা তাহমিনাদের মতো আরও প্রতিবন্ধী নারী উপার্জনক্ষম হয়ে উঠতে পারবে। এর ফলে পরিবারের বোঝা থেকে তারা উত্তরণ পাবে। দেশের জিডিপিতেও অবদান রাখতে পারবে। এভাবেই সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে।