প্রতিবন্ধীদের মূলধারায় সম্পৃক্ত হওয়ার প্রধান অন্তরায় যাতায়াত ব্যবস্থা

38

আজ ২১ তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় সরকারী এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের সহযোগিতায় এ দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। আর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসে এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয়- “Removing barriers to create an inclusive and accessible society for all” বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রদত্ত বিভিন্ন অজ্ঞীকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ইতিমধ্যেই প্রণয়ন করেছে জাতীয় প্রতিবন্ধী বিষয়ক নীতিমালা এবং বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন-২০০১। বর্তমানে “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার আইন-২০১২” সংসদে উপস্থাপনের অপেক্ষায়। এ সকল নীতিমালা ও আইনে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সমসুযোগ, সমঅংশীদারীত্ব এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখতে পাই?

দেখুন, আপনি আপনার প্রতিবন্ধী সন্তানকে শিক্ষিত করে তুলতে সকল বন্দোবস্ত করলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রের সমস্ত নির্দেশনা প্রতিপালন করে ভর্তি করে নিল আপনার সন্তানকে, স্কুলেও পরিবেশ সৃস্টি করা হল সমস্ত সহায়ক সামগ্রী দিয়ে। কিন্তু এখন প্রশ্ন আসে আপনার সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাবেন কিভাবে! কতজনের সামর্থ আছে নিজেস্ব প্রাইভেট কারে করে নিত্যদিন স্কুলে আনা-নেওয়ার। আবার, যদি সবদিক বিবেচনায় আপনি যোগ্য হন চাকুরী করার, সেক্ষেত্রেও অফিসে যাওয়া-আসার প্রশ্নটি সামনে এসে যায় । আর বিনোদনের কথা উঠলে সবার আগে যাতায়াত ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতাই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। প্রতিবন্ধিবান্ধব অর্থাৎ হুইলচেয়ার এ্যক্সেসিবল যানবাহন ব্যবস্থার অপ্রতুলতাই প্রধান অন্তরায় বলে আমার কাছে প্রতিভাত হচ্ছে। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমি যা উপলব্ধি করেছি তা এখন আমি একটু শেয়ার করতে চাই।

আমার কোন পার্সোনাল ট্রান্সপোর্ট নেই। সেক্ষেত্রে কোথাও যেতে হলে কার/এ্যম্বুলেন্সের উপর নির্ভর করতে হয়। এক সময় ইয়েলো ট্যাক্সিক্যাব হায়ার করতাম আর মিটারে ভাড়া পরিশোধ করতাম। এখন যেমন ইয়েলো ট্যাক্সিক্যাব খুব একটা পাওয়া যায় না, তেমনি অন্য ক্যাবগুলোতে পিছনে গ্যাস-সিলিন্ডার সংযোজন করায় হুইলচেয়ার ফোল্ড করে রাখা যায় না। অন্য দিকে হুইলচেয়ার এ্যক্সেসিবিল এ্যম্বুলেন্স আমার চোখে পড়ে নি, উলটো সাধারণ এ্যম্বুলেন্সের আকার (আভ্যন্তরীণ স্পেস) দিন দিন এত ছোট হচ্ছে যে একটা হুইলচেয়ারই ফোল্ড করার জায়গা হয় না। আবার সিএনজিতে আমার মত মেরুরুজ্জে (স্পাইনাল কর্ডে) আঘাতপ্রাপ্ত হুইলচেয়ার নির্ভরশীলদের উঠা-নামা একেবারেই সম্ভব নয়।

আবার রেলপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে, রেলওয়ের প্লাটফর্ম থেকে বগির উচ্চতা বেশ উঁচুতে হওয়ায় এবং দরজার প্রশস্ততা সংকীর্ণ হওয়ায় একজন হুইলচেয়ার নির্ভরশীল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে যে বিপদজনকভাবে অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভর করে উঠতে হয়, তা যে কোন সচেতন নাগরিক স্বচক্ষে দেখলে আঁতকে উঠবেন। জীবনের এই চরম ঝুঁকি নিয়েই আমার মতো অনেক প্রতিবন্ধীকেই চলতে হয় ট্রেনে।

১অত্যান্ত বিপদজনক অবস্থায় জীবনের ঝুকি নিয়ে ট্রেনে উঠছেন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি

{দিল্লির একটি মেট্রোরেলে নির্বিঘ্নে হুইলচেয়ার নিয়ে প্রবেশ করা যাচ্ছে}

অথচ বহিঃবিশ্বের মত একটি পোর্টেবল র‌্যাম্প প্রতিটি স্টেশনে (স্টেশন মাস্টারের কাছে)/ ট্রেনে (গার্ডের কাছে) রাখার ব্যবস্থা করা গেলে খুব স্বাচ্ছন্দে এবং নিরাপদে ভ্রমণ করা যেত। আর নৌপরিবহনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এত প্রকট যে সেগুলো দূর করার আগে নৌপথে নিরাপদে ভ্রমনের কথা বিবেচনায় না আনাই ভাল।

সমাজে শারীরিক তথা হুইলচেয়ার নির্ভরশীল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশাপাশি মানসিক, বাক, দৃস্টি ও শ্রবণপ্রতিবন্ধীর মতো নানা ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও রয়েছেন। ঘনবসতিপূর্ণ এই বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল পাবলিক পরিবহনে এই অসহায় ও দূর্বল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উঠা-নামা যে কতখানি কষ্টকর এবং গ্লানিময় তা একমাত্র ভুক্তভোগীই জানেন। সরকারী নির্দেশনায় প্রতিটি বাসে মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৯টি সীট সংরক্ষিত থাকার কথা বলা হয়েছে, অথচ বাস্তবচিত্র হচ্ছে, প্রতিবন্ধী দেখলেই পাবলিক পরিবহনগুলো এড়িয়ে যেতে চায় আবার কোনমতে ঊঠা গেলেও ভিতরের পরিবেশে বাস-কন্ডাক্টরকে বার বার ধর্ণা দিয়েও সেই সীটে আর বসা হয়ে উঠে না ।

আর এই প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে দুটো পথ খোলা আছে, প্রথমত পাবলিক পরিবহনে হুইলচেয়ার এ্যক্সেসিবল বাস সংযোজন করতে হবে এবং দ্বিতীয়ত সমস্ত ফিডার রোড তথা অলিগলি থেকে যাতে একজন প্রতিবন্ধী সহজে ও স্বাচ্ছন্দে যাতায়াত করতে পারেন সেজন্য হুইলচেয়ার এ্যক্সেসিবল কার ও এ্যাম্বুলেন্স রাস্তায় নামাতে হবে। এ কাজে সরকারকেই প্রথম উদ্যোগ নিতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রধান প্রধান রুটগুলোতে স্বল্পসংখ্যক বাস মডিফাই করে এখনই পথে নামাতে হবে। সেই সংগে পাবলিক পুলে যখনই কোন নতুন বাস সংযোজিত হবে তাতে হুইলচেয়ার এ্যক্সেসিবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এবং ব্যক্তিগনকে সুযোগ দিতে হবে প্রয়োজনে প্রণোদনা দিতে হবে যাতে তারা এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে এগিয়ে আসতেই পারেন তারা। উল্লেখ্য, হুইলচেয়ার এ্যক্সেসিবল কার বা এ্যম্বুলেন্স (যা অবশ্যই একটা স্বপ্ন) যেটার কথাই বলি না কেন সবকিছুই নির্ভর করবে মূলত ভাড়ার ঊপর এবং সেটা সিএনজি’র কাছাকাছি থাকতে হবে। অন্যথায় সেটা কর্পোরেট ব্যক্তিগনের ক্লিনিকে যাওয়া আসার বাহন হবে, সর্বসাধারনের নয়। বিষয়টা আরও নির্ভর করবে প্রাপ্যতার উপর। মূলকথা, স্বল্প সময়ের নোটিশে কম ভাড়ায় কার বা এ্যম্বুলেন্স পাওয়া না গেলে তা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের কোনই কাজে আসবে না।

 

উন্নত বিশ্বে ব্যবহৃত এ্যাক্সেসিবল ট্যাক্সি ক্যাব ও বাস

এ দুটি ক্ষেত্রেই এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। সরকারের নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে একটি আন্তঃখাত ও সামগ্রিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যাতে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সরকারী সংস্থা, এনজিও ও সুশীল সমাজের অংশগ্রহণে একটা সফল প্রতিবন্ধীবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।

প্রতিবন্ধী তথা ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা সমাজেরই একটি অংশ, তাদের রয়েছে নিজেস্ব ব্যক্তিত্ব, নিজেস্ব স্বকীয়তা। সমাজের অন্যান্য সকলের মতো তারাও সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। এজন্য প্রয়োজন তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্য করে গড়ে তোলার পাশাপাশি দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ করে দেওয়া। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, জাতীয় আইন, সংবিধানিক অধিকার সবখানেই প্রতিবন্ধীদের জায়গা বাড়াতে সবাইকে আন্তরিক ও সচেষ্ট ভূমিকা রাখতে হবে, তবেই সেদিন বেশী দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশ হয়ে উঠবে ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য বাসযোগ্য যা দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্বের জন্য হবে এক অনুকরণীয় দৃস্টান্ত।

লেখক পরিচিতিঃ মেজর মোঃ জহিরুল ইসলাম। ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের অধীন অবজারভার মিশন জর্জিয়ায় (UNOMIG)  চীপ মিলিটারি অবজারভারের এডিসি হিসাবে কর্তব্যরত থাকা অবস্থায় অজ্ঞাত বন্দুকধারী কর্তৃক উপর্যপুরি গুলি বর্ষন ও গ্রেনেড হামলায় মেরুদণ্ডের স্পাইনাল কর্ডে এবং ডান হাতে গুলিবিদ্ধ হন এবং সেই সময় থেকে তিনি হুইলচেয়ার নির্ভরশীল জীবন যাপন করছেন। তিনি SIAB এর সাধারণ সদস্য এবং B-SCAN এর একজন একনিষ্ঠ শুভাকাক্ষী।