বিশেষভাবে পারদর্শী লোকেদের জন্য কিছু করি

31

– অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী

একে কিভাবে দেখব? একে কি বলব – দুর্ভাগ্য নাকি দৈবদুর্ঘটনা? সমাজে আমাদেরই আত্বীয়স্বজন কেউ না কেউ এর শিকার – তাদের স্বাভাবিক জীবনে কোনো না কোনো প্রতিবন্ধকতার দেয়াল এসে দাঁড়িয়েছে। সমাজ তাদেরকে বলে প্রতিবন্ধী অথচ এতো কোনো অসুখ নয়, একটি অবস্থামাত্র। যারা এর শিকার তারা যতটা না নিজেদের পরিস্থিতির কারনে তারচেয়ে বেশি চারপাশের মানুষের নেতিবাচক মনোভাবের কারনে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। যারা এই পরিবেশকে সাহসের সাথে মোকাবেলা করেন তারাও কোনরকমে টিকে থাকেন, কিন্তু এদেশে তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম!

প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে মানুষ কমই জানে। অথচ যাদেরকে প্রতিবন্ধী বলা হয় তারাও কোনো না কোনোভাবে দক্ষ, বিশেষভাবে পারদর্শী। তাদেরও মেধা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকে যা অনেক সময় সমাজের অনেক মানুষের চেয়ে বেশি। সমাজের মূলধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ঢোকাতে পারলে তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করলে, করুনা বা অনুকম্পার দৃষ্টিতে না দেখে সহমর্মিতার দৃষ্টিতে দেখলে দেশেরই লাভ হত।

মূলত অজ্ঞতার কারণেই এদেশের মানুষ ব্যক্তির আগে তার প্রতিবন্ধকতাকে দেখছে। তাই আসল পরিবর্তনটা দরকার দৃষ্টিভঙ্গিতে।

বাংলাদেশী সিস্টেমস চেঞ্জ এডভোকেসি নেটওয়ার্ক (বি-স্ক্যান) একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এর মুল লক্ষ্য প্রতিবন্ধী মানুযের মৌলিক অধিকার সম্বন্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। বাংলাদেশের আর দশজন মানুষের যতটুকু নাগরিক অধিকার তারচেয়ে অনেক কম নিয়ে তারা বেঁচে আছেন এবং প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন। আর তাই এই সংগঠনটি সকল ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষের একীভ’ত শিক্ষা, সহায়ক যাতায়াত ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, সর্বক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতা ও সামাজিক মর্যাদা আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে।

প্রবেশগম্য ভবনের তৈরির লক্ষ্যে সভা সেমিনার করছে, আমাদের চোখ খুলে দিতে রিহ্যাব সহ সকল ইমারত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিচ্ছে। একীভ’ত শিক্ষা ব্যবস্থার দাবীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে করছে গণস্বাক্ষর অভিযান। ‘ভেঙ্গে যাক সকল বাধা, তৈরী হোক চলাচলের সমতা’ এই স্লোগান নিয়ে বি-স্ক্যান তাই হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে র‌্যালী ও সমাবেশের আয়োজন করে সহায়ক যাতায়াত ব্যবস্থার দাবীতে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মূল ধারায় আনতে সচেতনতা সৃষ্টিতে তারা শর্ট ফিল্ম, ডকুমেন্টারি তৈরিসহ বেশ কিছু সফল আয়োজন করেছে বি-স্ক্যান। কিন্তু সমস্যা সমাধানে খুব বড় একটা অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে হয় না। সরকারসহ অনেকে এগিয়ে এসেছেন ব্যক্তি পর্যায়ে ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে। তবে বড় রকমের কোনো উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায় না। একটি প্রস্তুতিমূলক শুমারিতে জানা যায় বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৯.০৭%  প্রতিবন্ধী। দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠির এই বিশাল অংশটি এখনো অবহেলিত। তাদের জন্য শিক্ষার অধিকার এখনো অর্জিত হয়নি। বেশিরভাগ স্কুলেই এদেরকে যতœ নিয়ে মর্যাদা দিয়ে শিক্ষাদানের দৃষ্টিভঙ্গি নেই, সুযোগ সুবিধা যাও বা আছে তাও অনেক সীমিত। একীভ’ত শিক্ষা অর্থাৎ একি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য সব ধরণের প্রতিবন্ধী তথা ভিন্নভাবে সক্ষম শিক্ষার্থীগণ যেন নির্বিঘেœ পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে একে একীভ’ত শিক্ষা ব্যবস্থা পদ্ধতি বলে। আর এর জন্যে শুধু মাত্র সহায়ক কিছু ব্যবস্থার সাহায্য প্রয়োজন তাদের। শিক্ষিত হয়ে উঠলেই পাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ। আর একারণেই তো তারা বিশেষভাবে পারদর্শী বা ভিন্নভাবে সক্ষম।

কিন্তু বেশিরভাগ ইমারত ও দালানসমূহ প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলার পথের বাধা সিঁড়ি, কিন্তু ছোট একটি র‌্যা¤প বা ঢালু পথ সকলের জন্যে উন্মুক্ত। এমনকি ঘরের বাইরে গিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিশ্চিন্তে দীর্ঘক্ষণ অবস্থানের জন্যে কোথাও সহায়ক টয়লেট সুবিধা পর্যন্ত নেই। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যে সিঁড়ির সাথে, ফুটপাথে, রাস্তায় কোথাও ব্রেইল ব্লক নেই। সকল নাগরিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। প্রতিবন্ধী আইনেরও সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই কোথাও, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। শৈশব থেকেই তারা প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্যর শিকার। শিল্পোন্নত দেশসমূহে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দৈহিক, মানসিক ও আবেগগত ভাবে বেড়ে উঠার জন্য পরিবার তথা সমাজ থেকে সবিনয়ে যে অবলম্বন ও সাহায্য দেয়া হয় তেমন সাহস বা উৎসাহ নেই এদেশে তাদের জন্য। পারিবারিকভাবে অবহেলার শিকার হয় বলেই সমাজ থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকে তারা। এ বড় দুর্ভাগের ব্যাপার। এজন্য যে বিশাল আয়োজন প্রয়োজন তা নয়, মনের একটু আন্তরিকতা ও সহমর্মিতার উদ্যোগ হলেই যথেষ্ঠ।

আসুন তাই আমরা একসাথে কাজ করি ভিন্নভাবে সক্ষম এই লোকেদের জন্য। তারা আমাদের কারো না কারো পরিবারেরই একজন। তাদের প্রাপ্য অধিকার যেন তারা পায় এজন্য লড়াই করি। তাদের বাসযোগ্য একটি দেশ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হই।