আমার পথ ফুল বিছানো হোক এটা নয়, কাঁটামুক্ত করাটা সবার দায়িত্ব

61

প্রতিবন্ধী! জীবনের ২৯টি বছর পেরিয়ে গেছে। প্রতিটি মুহুর্ত কাটছে প্রতিবন্ধকতার চাদর জড়িয়ে। সমাজের অন্যান্য মানুষদের চেয়ে একটু ভিন্নভাবে চলাফেরা করতে হয় আমাকে। কেননা, আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। সমাজের বিরূপ মনোভাবের কারণে আমরা ভীষণভাবে অবহেলিত। ভাই-বন্ধু-স্বজন সবই আছে। কিন্তু আমাদের সামনে এগিয়ে নেয়ার মতো ¯েœহার্দ কোন হাত নেই। আসলে প্রতিবন্ধিতাকে আমরা সমস্যা বলে মনে করি না। কারণ অন্ধকার না থাকলে আলোর মূল্য কোথায়!! তারপরও কেনই বা এত অনাকাংখিত মানসিকতা, অনুচিত অনুদার্যতা কাজ করে সবার মধ্যে। স্রষ্টা হয়তো আমাদের কোথাও অসম্পূর্ণতা দিয়েছেন, কিন্তু সেই সাথে দিয়েছেন কিছু অসাধারণ ক্ষমতা। যা আমাদের জীবনকে সুষম গতিতে চলতে সাহায্য করে। কিছু কথা বলতে হচ্ছে। ধুরন্ধর-চতুর আর ফিকিরবাজ মানুষেরা আজ সমাজে জ্ঞানী নামে পরিচিত। অন্যের অধিকার নষ্ট করার ভেতর দিয়েই নিজের জীবিকা নির্বাহ করছে এরা। বর্তমানে দেশে যত রকম ব্যবসা প্রচলিত আছে, তার মধ্যে প্রতিবন্ধী মানুষ নিয়েই একটি রমরমা ব্যবসা চলছে। কেউ কেউ হাজার হাজার ডলার সংগ্রহ করছেন ঘরে বসে। শুধু মাত্র প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিবন্ধী হাড্ডিসার মানুষের ছবি প্রয়োজন। তারপরে বাকি কাজ ইন্টারনেটে ক্লিক করে বাইরের দাতা নামক দেবতাদের মন আকৃষ্ট করতে পারলেই হল। আর কেনই বা হবে না- মানুষ মানুষের জন্য কাজ করাটা দোষের কি ? ঐ বিদেশী মানুষগুলো আমাদের উদ্দেশ্যে কোন কিছু পাঠালে আমরা কি সেগুলো যথার্থ পাই ? পাই না, এক বর্ণে বলতে পারি। আর তাই তো এদেশের কেউ কেউ ঈদের বাজার করেন আমেরিকায় গিয়ে, কেউ বা আবার ঈদের দিনেও থাকে অনাহারী। আমি প্রতিবন্ধী মানুষ। কিন্তু আমার আপন ভাই তো অপ্রতিবন্ধী। তবে কেন আমার সহায়ক উপকরণ পেতে হয় অন্য এনজিও থেকে ? আপন এবং দেশী ভাইদের চেয়ে বিদেশী দাদারা কি আমাদের যন্ত্রণা বেশী বোঝেন ? অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আজ শিক্ষিত হয়েছেন। আর এই শিক্ষা বা ডিগ্রী অর্জন করতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়তে হয়েছে তাদের। আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হতে হয়েছে। এভাবেই জমানো স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখছে উদ্যোমী, ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষগুলো। প্রতিবন্ধী এবং এতিম মিলিয়ে সরকারী চাকরিতে ১০% কোটা বরাদ্দ থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগ কতটুকু ? শতকরা ১ ভাগও নয়। ১০% কোটা ব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগ হলে দেশে কোন শিক্ষিত প্রতিবন্ধী বেকার থাকে না। তবে প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন করে লাভ কী ? কিছু কিছু এনজিও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ফান্ড তৈরী করছে। অপ্রতিবন্ধী কর্মচারী দিয়ে তা পরিচালনা করছে। এখানে শিক্ষিত, যোগ্য, এবং বেকার প্রতিবন্ধীদের প্রতি কতটুকু ভালবাসা দেখানো হলো ? আমাদের দেশে যেসব এনজিও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে, সেগুলোর বিস্তারিত নাম-ধাম আমি সংগ্রহ করার সময় পাই নি। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল অটিজম শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করছেন। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। ধন্যবাদ পুতুলকে। বিশ্বের অন্য কোন রাষ্ট্রপ্রধানের পরিবারের সদস্যদের প্রতিবন্ধী মানুষ নিয়ে কাজ করার এমন নজির নেই। তবে, হুইলচেয়ারে বসে আমেরিকা শাসন করেছেন প্রেসিডেন্ট এফডি রুজভেল্ট নামক একজন ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তি। যিনি পরপর ৪ বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, তার দুটি পা’ই পোলিওজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্থ ছিল। সাহায্যকারী ছাড়া চলতে পারতেন না। তার হুইলচেয়ারসহ ছবি খুব কমই পাওয়া গেছে। হুইলচেয়ারসহ ছবি তোলা থেকে তিনি বিরত থাকতেন। কংগ্রেস লাইব্রেরীতে রুজভেল্ট এর ৫ হাজারের অধিক ছবি রয়েছে, তারমধ্যে দু’টো ছবিতে তার প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত হয়েছে। জানুয়ারী ২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের অন্যতম একটি কাজ ছিল, ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এর একটা প্রতিমূর্তি উন্মোচিত করা। এটি তৈরির পূর্বে মার্কিন কংগ্রেসে তুমুল বিতর্ক হয় যে, রুজভেল্ট সর্বদাই যেমনটি চাইতেন তেমন ভাবেই তাকে দেখান হবে, তার প্রকৃত চেহারা নয়। অবশেষে বাস্তবতার জয় হল এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রপতিকে তার মৃত্যুর ৫৭ বছর পর তাকে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী হিসেবে তুলে ধরা হল। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস এখনও তার বিজ্ঞান, চিন্তা ও আবিষ্কার অব্যাহত রেখেছেন একজন প্রতিবন্ধী মানুষ হওয়া সত্ত্বেও। দেশ বা জাতির ঘুমন্ত অন্দরে সাড়া জাগাতে পারে এমন প্রতিবন্ধী মানুষ আমাদের দেশেও আছেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও কেউ অলংকৃত করে আছেন সংস্থা প্রধানের পদ। কেউ বা হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের উকিল। কারো প্রতিভা তাকে করে তুলেছে সকলের শ্রদ্ধাভাজন। তবে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এবং প্রতিভা বিকাশের যথাযোগ্য সুযোগ করে দিলে আমরাও পারবো। আমরা প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আলাদা মসজিদ, মন্দির, বিদ্যালয় তৈরির দাবী জানাচ্ছি না। এখানে বলতে চাচ্ছি, প্রতিবন্ধী মানুষেরা যেন সর্বস্তরের মানুষের সাথে মিলে সমাজ, দেশ বা জাতির উন্নতি সাধনে অংশগ্রহন করতে পারেন। সব সৃষ্টিগত বৈষম্যকে জয় করার সাথে সাথে একে অপরের সহায়ক হিসেবে কাজ করে পৃথিবীতে নিজেদের সাফল্য প্রমাণ করাটাই আমাদের প্রকৃত যুদ্ধ। প্রতিবন্ধী মানুষেরা তো আমারই ভাই, আপনাদেরই স্বজন। ¯্রষ্টার বিচিত্র বাগানে প্রতিটি ফুলই আপন রূপে শোভা বৃদ্ধি করে। সব ফুল রূপ-রস-গন্ধে সম্পূর্ন পৃথক হয়ে থাকে। যে কোন মুহুর্তে একজন সুস্থ মানুষও প্রতিবন্ধী হয়ে যেতে পারেন। এটা অভিশাপ নয়, বাস্তবতা। টিভি বা গণ-মাধ্যমগুলোর দিকে দেখুন, দেখবেন নানান বিষয়ে প্রতিবন্ধী মানুষদের বিচিত্র প্রতিভার অনন্য স্বাক্ষর। যারা শারীরিক সমস্যাগ্রস্থ হওয়া সত্ত্বেও আজ সামনের সারিতে অবস্থান করছেন। বিজ্ঞান, দর্শন, আবিষ্কার, ইন্টারনেট সব স্থানেই কিছু কিছু প্রতিবন্ধী বন্ধুরা আছেন। আমাদের সাফল্যের পালে তারা দিচ্ছেন জোড়ালো হাওয়া। এ’জন্য তাদেরকে সাধুবাদ জানাই। দেশে শুধু প্রতিবন্ধী মানুষদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি বিশেষ নিয়োগ বিজ্ঞাপন দেয়া হয় নি। বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের অধীনে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের জন্য অনেক কর্মসুচী হাতে নেয়া হয়েছে । কিন্তু, বাস্তবায়নকৃত কর্মসূচীর সংখ্যা এতই কম যে, সে সম্পর্কে হিসাবে না যাওয়াই শ্রেয়। ইদানিং ক্যামেরায় শুধু অনুষ্ঠান উদ্বোধনের ছবি ধারন করা হয়, তবে প্রধান অতিথি চলে যাওয়ার পরের দৃশ্য কেউ ধারন করে না। এখানে এ’ কথাও বলা দরকার যে, অধিকার ও ক্ষমতা নীরবে এসে ঘরের দরজায় কড়া নাড়বে না। তা আদায় ও অর্জন করতে হবে নিজেকেই। এ জন্য দরকার সৎ সাহস ও সুশিক্ষার। তাই আমাদের সমাজে সামগ্রিক উন্নয়ন করতে হলে, ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের বোঝা না ভেবে, সম্পদে পরিণত করতে হবে। আমি হলফ করে বলতে পারি, সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন প্রতিবন্ধী মানুষেরাও সাত সাগরের দিগন্ত ছুঁয়ে যাবেন। সুউচ্চ পাহাড়ে ছড়িয়ে যাবে তাদের প্রত্যয়ী কন্ঠস্বর। মহাকাশের অনন্ত জগত চষে বেড়াবে তারা অজানার সন্ধানে। আপন প্রতিভার উজ্জ্বল আলোয় পথ খুঁজে পৌঁছে যাবেন মহাকাশের দূরতম নক্ষত্রটির কাছে। নতুন করে লেখা হবে ভিন্নভাবে প্রতিবন্ধী মানুষের ইতিহাস। মানুষকে ভিক্ষা দেয়ার চেয়ে, করুণা করার চেয়ে, তাকে কর্মী হতে সাহায্য করাটাই অতিব জরুরী। উপার্জনের পথ পেলে তারাও স্বাধীনভাবে চলতে পারবে মুক্ত আকাশের নীচে। একজন মুক্ত মানুষের মতো করে। আমার পথ ফুল বিছানো হোক এটা নয়, অন্তত কাঁটামুক্ত করাটাই সবার দায়িত্ব । এটাই হোক আজকের দিনের শপথ।

মোঃ সাইফুল ইসলাম
তাড়াশ, সিরাজগঞ্জ।