উপেক্ষিত সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা তথা ইমারত বিধি আইন

39

 

মুহাম্মদ মহিদুল ইসলাম

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (ইমারত বিধি) আইনে থাকলেও নেই তার কার্যকারিতা। কোন প্রতিষ্ঠান, ভবন মালিক বা সংলিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেউই মানছেন না। প্রতিবন্ধি ব্যক্তিদের সর্বক্ষেত্রে (সর্বজনীন) প্রবেশগম্যতা এতে করে উপেক্ষিত।

১৯৯৩ সালে হাইড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে প্রনীত হয় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)। এছাড়া  Building Construction Act-1952 (Act no. 11 – 1953) এর সেকশেন ১৮ এর প্রদত্ত সমতাবলে সরকার ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, সংরক্ষন ও অপসারন) চিঠিমালা ২০০৮ আইন প্রণয়ন করেন। কিন্তু সেই আইন যথাযথ কার্যকর না হওয়ায় প্রতিনিয়ত বিল্ডিং কোড অগ্রাহ্য হলেও কেউ শাস্তি পাচ্ছে না। সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও চাহিদা। তাদের সহায়ক চলাচলের ব্যবস্থা না থাকার দরূন বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা অসুবিধার সম্মুক্ষিন হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ৭ম অধ্যায়ের ৬৪ নং ধারায় উল্লেখ আছে যে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সর্বজনীন গম্যতার ও গৃহীত বিশেষ ব্যবস্থা নিম্নরূপ হবে। যথা-

ক) সকল ইমারতে পার্কিং স্পেস হতে সংলগ্ন তলায় লিফট (যদি থাকে) পর্যন্ত সর্বজনীন গম্যতার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

খ) ১০০ বর্গ মিটারের উপর ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট সকল ব্যবহার উপযোগী ইমারাত সমূহে (যেমন- হোটেল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, স্বাস্থ্য সেবা, সমাবেশ ও বানিজ্যিক ব্যবহার) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সর্বজনীন গম্যতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

গ) প্রযোজ্য সকল ইমারতের প্রতিতলায় নূন্যতম একটি টয়লেট অথবা সার্বিক টয়লেট সংখায় ৫% (যাহা অধিক) পরিমাণ টয়লেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সর্বজনীন গম্যতার জন্য সহজেই প্রবেশগম্যতার যোগ্য এবং সুনির্দিষ্ট ভাবে দিক নির্দেশিত করতে হবে।

ঘ) প্রযোজ্য প্রতিটি ইমারতে ন্যূনতম একটি পার্কিং অথবা সর্বমোট প্রয়োজনীয় সংখার ৫% (যাহা অধিক) পরিমাণ পার্কিং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সর্বজনীন গম্যতার জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে।

এবং পরিশিষ্ট – ২ এ কক্ষ, করিডোর, চলাচলের পথ, হুইলচেয়ার ঘুরাবার জন্য জায়গা, দরজার সাইজ, রেইলিং, রেম্প, সিঁড়ি, লিফট, পার্কিং, সিটিং কি রুপ হবে তা স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া গৃহায়ন ও মন্ত্রানালয় ৭ ডিসেম্বর ২০০৯ সালে “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহার উপযোগী র‌্যাম্প ও টয়লেট নির্মাণ প্রসঙ্গে” একটি জারি করে সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে চিঠি প্রেরন করে দিলেন। তা সত্তেও এই চিঠিমালা লঙ্ঘন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত না হওয়াতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিশেষকরে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিরা শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে মানুষের মৌলিক চাহিদা থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমঅধিকার বঞ্চিত রয়ে যাচ্ছে। মোট জনসংখ্যার ১৫ ভাগ অর্থাৎ প্রায় ২.৫ কোটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি (বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে) অবহেলিত জীবন যাপন করছেন।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অবিলম্বে বিল্ডিং কোড প্রয়োগ ও ভবন নির্মাণ কর্মকাণ্ড তদারকের জন্য একটি নিয়ন্ত্রন বা নীতি নির্ধারণী কমিটি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এই কমিটি স্থান ও এখতিয়ার ভেদে মাঠ পর্যায়ে বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন নির্বাহী সংস্থাকে দায়িত্ব দিতে পারেন। পাশাপাশি সব পর্যায়ে প্রকৌশলীদের বিল্ডিং কারিগরি বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষন দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। আর আইন অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তির বিধানে আনার জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে যথাযথ মনিটরিং প্রয়োজন। তবে বেশ কিছু সরকারী ও কিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, ভবনে বর্তমানে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মনে আশার সঞ্চার করছে।

সকল ধরনের সরকারী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, ভবন, পার্ক, ফুটপাতে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা বাস্ত -বায়ন করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কঠিন যাত্রাকে সহজ ও আরামদায়ক করা গেলে দেশের উন্নয়নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব। কারণ মোট জনসংখ্যার ১৫ ভাগ মানুষকে দূরে সরিয়ে রেখে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়।