মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস

60

মোস্তফা কামাল যাত্রা

 

প্রতিবছর ১০ অক্টোবর, বিশ্বব্যাপি পালিত হয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। ১৯৯২ সাল থেকে মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকর্মী গড়ে তোলা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের গুরুত্ব-প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জাতীয়-আন্তর্জাতিক নীতমালা প্রণয়নের প্রত্যয়ে বিশ্বব্যাপি একযোগে নানান আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ দিবসটি পালিত হয়।

বাংলাদেশে সরকারী পর্যায়ে ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ পালিত না হলেও বেসরকারীভাবে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ঘটা করে দিবসটি উদযাপন করে থাকে। চট্টগ্রামে স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থা উৎস এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে গঠিত জনসংগঠনের আঞ্চলিক মোর্চা ‘এলায়েন্স অব আরবান ডিপিও’স ইন চিটাগাং (এইউডিসি)’ বিগত এক দশক ধরে এ দিবস পালনের পাশাপাশি ২৩ জুলাইকে ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ হিসেবে ঘোষণার জন্য অধি-পরামর্শমূলক কর্মসূচির আয়োজন করে আসছে।

২০০৬ সালে জাতিসংঘে গৃহিত ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ’-এ মানসিক স্বাস্থ্যহানির কারণে সৃষ্ট জটিল মানসিক সমস্যা বা রোগকে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এ সনদের স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও ভূক্তভোগী জনগোষ্ঠী, তাদের পরিবার ও এই ইস্যুতে কর্মরত প্রতিষ্ঠানগুলো মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধে এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয় রোধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে একটি ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ ঘোষণার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে থাকে।

মূলত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’-এর পাশাপাশি ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ পালিত হয়ে থাকে। স্ব-স্ব দেশের মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুটিকে গুরুত্বসহকারে তুলে আনার স্বার্থে আমাদের দেশেও ২৩ জুলাইতে দিবসটি পালনের উদ্যেগ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কারণ হিসেবে যে বিবেচনাটি মুখ্য হয়ে উঠেছে তা হলো – এদিন মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে আমৃত্য কর্মরত মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মহসিন সিদ্দিক লুলুর মৃত্যু দিবস। ২৩ জুলাই, ২০০৭ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। জীবদ্দশায় তিনি মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সংগঠিত করে মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার আদায়ে নানান ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ১৯৭৬ সাল থেকে মানসিক সমস্যাক্রান্ত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর একটি সমাবেশের আয়োজন করা। এ সমাবেশ থেকে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একটি দাবিনামা উপস্থাপিত হতো। মহসিন সিদ্দিক লুলুর নেতৃত্বে আয়োজিত এ সমাবেশ পরবর্তী সময়ে (২০০৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত) আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ‘অ্যাকশন অন ডিজএ্যাবিলিটি এন্ড ডেভেলাপমেন্ট (এডিডি)’-এর সার্বিক সহযোগিতায় ‘মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় সম্মেলন’ হিসাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তার অপ্রত্যাশিত মৃত্যু পরবর্তী আলোচ্য সম্মেলন আয়োজনে এক ধরণের স্থবিরতা তৈরি করে। মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে তাঁর ভূমিকার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের প্রত্যয়ে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম ২০০৮ সালে প্রতিবছর ২৩ জুলাই মহসিন সিদ্দিক লুলুর প্রয়ান দিবসকে ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ ঘোষণার দাবির প্রেক্ষিতে যৌক্তিকতা তুলে ধরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছিল। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো- আজও এ দিবসটি স্বীকৃতি পায়নি।

একটু গভীরে তাকালে আমরা দেখতে পাবো, আমাদের দেশ একটি দুর্যোগপূর্ণ দেশ। নানান ধরনের মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণেও মানুষ মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। প্রাত্যহিক জীবনের নানান অসঙ্গতি, নিরাপত্তাহীনতা আর আর্থিক অনিশ্চয়তা মানুষের উপর যে চাপ সৃষ্টি করে, তা তাদের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে বাধ্য করে। ফলে মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের শিকার হয়ে, স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে, কর্মক্ষমতা হারিয়ে, আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মানসিক রোগীতে পরিণত হয়; যে অবস্থায় পর্যবশিত হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন মানুষ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সামাজিকতা রক্ষায় ব্যর্থ হন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের এ মনোবিপর্যয়ের কারণে তার পরিবারও সমাজের বিভিন্ন স্তরে নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে।

মূলত, মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি এবং মনোসামাজিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রযোজ্য ঔষধ ও চিকিৎসাকর্মী, সেবা ও সেবার মান উন্নয়ন এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্র প্রস্তুতেও এ দিবসটির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। এ দিবসকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর প্রসঙ্গটি নানান স্তরে আলোচিত হবে, প্রযোজ্য ইতিবাচক নীতিগত সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও পদক্ষেপগুলো গ্রহণে মতামত তৈরি হবে। আর দিবসটি যদি হয় মহসিন সিদ্দিক লুলুর মতো একজন একনিষ্ঠ আত্মত্যাগী মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার আদায়ের লড়াকু সৈনিকের মৃত্যু দিবস কেন্দ্রিক, তবে তা হবে যথার্থ। যার মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর অনবদ্য অবদানের প্রতিও সম্মান জানাতে পারব, দিতে পারব তাঁর কৃতকর্মের স্বীকৃতি।

এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের ইতিবাচক ভূমিকা ও কার্যকরী পদক্ষেপ আশা করছি, যার মধ্য দিয়ে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধের স্বপক্ষে অগ্রণী উদ্যোগ গ্রহণেরও অনবদ্য সুযোগ সৃষ্টি হবে।

 

লেখক: মোস্তাফা কামাল যাত্রা, নির্বাহী পরিচালক, উৎস, চট্টগ্রাম