অশ্রু

46

তান্নি চৌধুরী

 

 

আনমনে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে হঠাৎ উন্মাদের মতো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে নির্ঝর। ক্রমেই হেসে চলেছে সে। আড় চোখে তাকালাম তার দিকে। আমার দিকে একটু তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল নির্ঝর। তারপর চুপচাপ, মূর্তির মতো বসে রইল চেয়ারে। ছোট্ট করে একটু ডাকলাম, নির্ঝর………… কোন সাড়া দিল না নির্ঝর, শুধু বোবার মতো তাকিয়ে রইল আমার দিকে। গভীরভাবে চোখে চোখ রেখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। করুণ নিঃসীম মায়াবী দুটি চোখ নির্ঝরের। দু’ চোখের বোবা চাহনি জুড়ে বিরাজ করছে এক সমুদ্র শূন্যতা। ধীরে ধীরে কাছে গেলাম নির্ঝরের। হাত রাখলাম তার এলো চুলে। মুহূর্তে আমার হাতটা সজোরে চেপে ধরে সে।

 

–   নির্ঝর সোনা, কি হয়েছে তোমার? কোমল কণ্ঠে জানতে চাইলাম। নিরুত্তর নির্ঝর।  শুকনো ঠোঁট দুটো থর থর করে কাঁপছে। কি যেন বোঝাতে চাইছে আমাকে, কিন্তু কষ্ট নামের পাথরটা তাকে বলতে বাধা দিচ্ছে। পরম মমতায় বুকের মধ্যে চেপে ধরলাম। দু হাতে শক্ত করে আমাকে আঁকড়ে ধরল সে। আমার বুকে মাথা রেখে বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। জানি না কি হয়েছে এই নিঃসঙ্গ অবুঝ মেয়েটির। হয়তো নিদারুণ অবহেলায় পৃথিবী অসহ্য হয়ে উঠেছে তার কাছে। বন্দী চার দেয়ালের মাঝে হারিয়ে ফেলেছে সমস্ত চাঞ্চল্য ও উচ্ছ্বলতাকে। নিঃসঙ্গতাই তার প্রতিদিনের সঙ্গী। বুকে মুখ গুঁজে অবিরাম কেঁদে চলেছে নির্ঝর। কাঁদার জন্য বারণ করছি না তাকে। আমি চাই নির্ঝর কাঁদুক, অশ্রু হয়ে ভেসে যাক তার হৃদয়ের অব্যক্ত বেদনাগুলো।

 

২৯ শে এপ্রিল, আজ নির্ঝরের জন্মদিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে ছুটে যাই তার কাছে। বিছানায় শুয়ে আছে নির্ঝর। মনে হয় ঘুমোচ্ছে। পাশে একটা খোলা ডায়েরি পড়ে আছে। তার পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে বিভিন্ন কলম এবং রং পেন্সিল। ডায়েরিটা হাতে নিলাম, দেখলাম ছোট ছোট অক্ষরে কি যেন লেখা, ভাবলাম পড়ব। কিন্তু পড়া উচিত হবে না ভেবে রেখে দিলাম নির্ঝরের পাশে। তারপর আস্তে আস্তে হাত রাখলাম নির্ঝরের মাথায়। ছোট্ট করে ডাকলাম, “ নির্ঝর সোনা, ঘুমিয়ে গেলে বুঝি”! চোখ তোলে আমার দিকে তাকাল নির্ঝর। আমাকে দেখেই শোয়া থেকে উঠে বসল।

 

– হ্যাপী বার্থডে টু ইউ। হাসি মুখে বললাম আমি।

– থ্যাংকস। মুখে সামান্য হাসি টেনে ছোট্ট করে বলল নির্ঝর। তারপর চুপচাপ।

একটু পর বললাম, নির্ঝর আমি এখন যাই, পরে আবার আসবো।

– এখন কেন এসেছো? প্রচণ্ড অভিমানের সুরে বলল নির্ঝর।

– নির্ঝর লক্ষ্মী আমার, আমি আবারো আসব।

 

– আসতে হবে না, আমি একা থাকতে চাই। তোমরা কেউ আসবে না, যাও; বলে বালিশে মুখ গুঁজে রইল সে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম নির্ঝরের দিকে। পাশে বসে হাত বুলাতে লাগলাম তার পিঠে। নির্ঝরকে কিছু বলার কোন ভাষা খুঁজে পেলাম না। কেন জানি অনুশোচনায় জর্জরিত হচ্ছি বারবার। একটা অপরাধ বোধ আমাকে নাড়া দিচ্ছে অবিরত। নিজেকে খুব স্বার্থপর ও ছোট মনের মনে হচ্ছে। কিছুতেই স্বস্তি মিলছে না। বাহু ধরে ছোট্ট একটু ঝাঁকুনি দিয়ে ডাকলাম নির্ঝরকে।

 

– নির্ঝর সোনা উঠো, দেখ আজকের সকালটা বেশ মনোরম। জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে দেখ ভোরের পাখিরা কিচির মিচির করে গান গাইছে। আজ কিন্তু আমি সারাদিন তোমার কাছে থাকবো। আমরা একসাথে খাব, একসাথে ঘুমাবো, অনেক অনেক মজা করবো। আরো কতো কী!

 

– সত্যি বলছ?

– হ্যাঁ হ্যাঁ সত্যি, এই যে তোমার মাথা ছুঁয়ে বলছি।

–  কি মজা! আমার গলা জড়িয়ে ধরে উল্লাসে মেতে উঠে নির্ঝর। রীতিমতো খুবই অবাক হলাম আমি। নির্ঝরের এমন আনন্দ উচ্ছ্বাস এর আগে কখনো দেখি নি। যে মেয়ে দিন রাত পাগলের ন্যায় আচরণ করে, বোবার মতো তাকিয়ে থাকে, সে মেয়ে এতো প্রাণোচ্ছ্বল? বুঝতে পারলাম, এই মেয়েটির প্রয়োজন একটু মমতা, একটু স্বাধীনতা, আর একজন বন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সঙ্গ পেলে মেয়েটি শীঘ্রই ফিরে পাবে তার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন। ফিরে পাবে হারিয়ে যাওয়া নির্মল আনন্দকে। নির্ঝরকে এই অবহেলিত অন্ধকার সমাজ থেকে তুলে আনতে হবে একটি আলোকিত সমাজে। মনে মনে ছোট্ট শপথ নিলাম আমি।

 

গত দু মাসের চেয়েও বেশিদিন হচ্ছে প্রতিদিন বিকেলে যাই নির্ঝরের কাছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকি ওর কাছে। গল্প করে, গান শুনিয়ে, ছবি এঁকে বিপুল আনন্দে ভরিয়ে রাখি তাকে। আমাকে দেখলেই উদ্বেল আনন্দে মেতে উঠে নির্ঝর। দিন দিন আমাকে নিবিড় মমতার মায়া জালে আবদ্ধ করে রাখছে সে। আগের সেই উন্মাদনা নেই নির্ঝরের মাঝে। সে এখন আনন্দ উচ্ছ্বলতায় মাতোয়ারা এক কিশোরী। আমার অবসরের সঙ্গী নির্ঝর।

 

ভাবতে অবাক লাগে, এতো অল্প সময়ে নির্ঝর কী ভাবে এতোটা বদলে গেল! জানা ছিল না চুপচাপ মূর্তিমান নির্ঝরের মাঝে লুকিয়ে থাকা একটি অতি সুশোভিত অকৃত্রিম অনুরাগী হৃদয় আছে। নির্ঝরের সেই সুললিত অতি মূল্যবান স্নিগ্ধ হৃদয়ের সন্ধান আমি পেয়েছি। সে তার অভ্যন্তরে আমাকে স্থান দিয়েছে। খুব সুন্দর করে গান গায়। তারপর মিষ্টি করে হেসে বিজ্ঞের মতো বলে, গানটা তেমন ভালো হলো না। আরো চেষ্টা করতে হবে, তাই না?

ওর ছোট্ট চিবুক ধরে মুখটা তুলে ধরি আমার চোখের সামনে। লাজুক হেসে দুহাতে মুখ ঢাকে। তারপর কানে ফিস ফিস করে বলে, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঐ গানটি শোনাও না!

– কোন গানটা নির্ঝর সোনা?

– বারে, জানো না বুঝি! ঐ তো “তোর সাথে যে নদীর অনেক মিল, নদীর নামে তোকে যে তাই ডাকি….”

– হু শোনাব,  তবে তার আগে বলো আমার কথার অবাধ্য হবে না তো?

– তোমার কোন কথাটি আমি শুনি নি? মুখ ভার করে বলে নির্ঝর।

– আমি হেসে ওর মিষ্টি গালে টোকা দিয়ে বলি, আমার নির্ঝর খুব ভালো। শুনো, ভালো করে পড়াশুনায় মনোযোগ দিতে হবে কিন্তু!

– তুমি থাকলে অবশ্যই। তবে একটা কথা রাখবে আমার?

– কী কথা?

– আমাকে ছেড়ে তুমি কখনো কোথাও চলে যাবে না তো?

 

 

আমি চুপচাপ। নির্ঝরের প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলাম না আমি। কীভাবে বলবো তাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না! পৃথিবীর বাস্তবতা যে বড়ই কঠিন! কর্তব্যের টানে সবাই যে যার আপন গন্তব্যে ফিরে যায়, ফিরে যেতে হয়। হাজারো মমতার নিবিড় বন্ধনে বেঁধে রাখলেও প্রিয় মানুষটিকে কখনো চিরকাল আপন সান্নিধ্যে রাখা যায় না, এটাই পৃথিবীর নিয়ম। কিন্তু একথা কিভাবে বোঝাব নির্ঝরকে? অবুঝ চঞ্চল কিশোরী কি মেনে নিতে পারবে এ চির সত্য বাস্তবতাকে? জানি এ কথা বোঝাতে চাইলে তার কচি মনে প্রচণ্ড আঘাত লাগবে। ভালোলাগার নতুন পৃথিবীটা মূহুর্তে তীব্র যন্ত্রণায় পরিণত হবে। না, কিছুতেই তা হতে দেয়া যায় না। তাছাড়া নির্ঝরকে আমি প্রাণাধিক বেশি ভালোবাসি। “নিশান, আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না যে? ” নির্ঝরের ডাকে চমকে উঠলাম।

– ও হ্যাঁ, কি যেন বলেছিলে নির্ঝর? হু, মনে পড়েছে। আমি যেখানেই থাকি তুমি আমার পাশে থাকবে।

– সত্যি বলছ তো?

– হ্যাঁ, নির্ঝর।

 

 

দিন দিন আমি দুর্বল হয়ে পড়ছি মেয়েটির প্রতি। ইচ্ছে করে সারা দিনরাত ওর পাশে থাকতে। যখন একা থাকে, তখন অতি উৎসাহে যত্ন করে রং-তুলির আঁচড়ে আমার ছবি আঁকে। কখনো কখনো ছোট্ট দুটি বেণী দুলিয়ে ছড়া শোনায় আমাকে। জানি না আমাকে এতো ভালোবাসে কেন নির্ঝর। তবে এটা জানি আমার হৃদয়ের অতল গভীরে সারাক্ষণ নির্ঝরের বিচরণ। তাকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। সে একদিন অনেক বড় হবে, আর অফুরন্ত ভালোবাসা ছড়িয়ে দেবে তার মতো নির্ঝরদের মাঝে।

 

বেশ কিছুদিন ধরে নির্ঝর খুব অসুস্থ। হঠাৎ করে এত বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ল কেন জানি না। তীব্র জ্বরের প্রকোপে কাতরাচ্ছে। ওষুধ চলছে নিয়মিত, তারপরও কোন কাজ হচ্ছে না। সারাক্ষণ বসে থাকি নির্ঝরের পাশে। নির্ঝরের মা মাহবুবা খান সারাক্ষণ থাকেন বাইরে বাইরে। নির্ঝরকে দেখাশুনা করে একজন কাজের মেয়ে। মেয়ের এতো অসুস্থতা মাহবুবা খানকে ব্যস্ততা থেকে দূরে রাখতে পারে নি। বরং চাকুরীর কাজে আরো বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি।

 

শত অসুস্থতার মাঝেও আমাকে সামান্যটুকু মুহূর্তের জন্যও ভুলে থাকতে পারে নি নির্ঝর। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ঝুলিয়ে রেখে আমাকে সান্ত্বনার আলোয় আলোকিত করার চেষ্টা করছে অবিরত। মাঝে মধ্যে আমার হাত তার বুকে চেপে ধরে। পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকাই নির্ঝরের মেঘে ঢাকা নিষ্পাপ স্নিগ্ধ মুখটির দিকে। হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে। দু’চোখে নেমে আসে অশ্রুর  ধারা। চমকে উঠি আমি। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলি, নির্ঝর তোমার চোখে জল?

– কই, না তো। ঠোঁট চেপে ধরে সে।

– মিথ্যা বলো না নির্ঝর সোনা।

– নিশান, আমি কি সুস্থ হব আবার?

– অবশ্যই!

– আমার খুব ভয় হয় নিশান।

 

ডুকরে কেঁদে উঠে নির্ঝর। দু’হাতে কাছে টেনে নিই তাকে, মুখ মুছে দিয়ে বলি, এই বুকের খাঁচায় তোমার বসবাস। তোমাকে সুস্থ হয়ে উঠতে হবে আমার জন্য। তোমার মতো আরো অজস্র নির্ঝরের জন্য। কোন কথা না বলে আমার কাঁধে মুখ গুঁজে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। অশ্র“তে ভেসে যাচ্ছে আমার কাঁধ। কেন জানি আমার হৃদয়টা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। কান্না পাচ্ছে ভীষণ। তবুও অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করলাম।

 

কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল নির্ঝর। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম নির্ঝরের অশ্র“্রুসিক্ত ঘুমন্ত মুখের দিকে। অপূর্ব লাগছে, যেন এক-ফালি শশী। এই মাত্র মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে আলোকিত শশী। কপালে হাত রাখলাম নির্ঝরের। নাহ! একটুও জ্বর নেই এখন। শরীরে হাত রাখলাম, পুরো শরীর ভীষণ ঠাণ্ডা ! অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলাম আমি, গভীরভাবে চোখ রাখলাম নির্ঝরের দিকে। নির্ঝরের মুখটা ভীষণ শান্ত মনে হচ্ছে, দু’চোখ বন্ধ। ঠোটের কোণে এক টুকরো হাসির আভা দেখা যাচ্ছে।

 

মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ডাকলাম নির্ঝর……… কোন সাড়া নেই নির্ঝরের। বুঝলাম, গভীর ঘুমে মগ্ন নির্ঝর। পরম তৃপ্তিতে ঘুমাচ্ছে সে। পৃথিবীর যত অবহেলা, ভয়, কষ্ট তাকে একদিন শান্তিতে ঘুমোতে দেয় নি। আজ আমার নির্ঝর পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি। জানি, এই ঘুম কোনদিন ভাঙবে না তার। পৃথিবীর ওপারে চির সুখের রাজ্যে হাসি গানে মুখরিত হয়ে সেখান থেকেই আমার স্বপ্নের পৃথিবীকে সাজিয়ে দেবে আনন্দিত দু’হাতে।