প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় ইশারা ভাষা দিবস

16

আহমেদ ইশতিয়াকঃ প্রধানমন্ত্রী ইশারা ভাষা দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ঘোষণা দেয়ার পাঁচ বছর পেরুলেও মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের অনুমোদনের ব্যাপারে কোন অগ্রগতি হয় নি আজ অবদি। এতে করে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাবেই শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোসাইটি অব দ্যা ডেফ এন্ড সাইন ল্যাংগুয়েজ ইউজারস (এসডিএসএল) এর সভাপতি এম ওসমান খালেদ বলেন, বাংলা ইশারা ভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে নেতৃত্বে একটি সভা ডাকা হয়েছিল ২০১১ সালে। সেই সভায় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে ২০১২ সালের ৭ ফেব্র“য়ারি থেকে পালিত হচ্ছে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস। কিন্তু নানান জটিলতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে এখন পর্যন্ত বিষয়টি সচিব কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায়।

জানা যায়, ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনক্রমে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বাংলা ইশারা ভাষার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের পরিপত্র জারি করে। সে বছরই পহেলা ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলা উদ্বোধনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলা ইশারা ভাষাকে দেশের অন্যতম ভাষা হিসেবে অভিহিত করেন।

 

২০০৯ এর ৩১ অক্টোবর, এসডিএসএল সহ সারা দেশের শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন সংগঠন সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেন এই দিবস পালনের দাবীকে জোরালো করতে। এরপরে বিভিন্ন ভাবে দাবী উঠতে থাকে। ক্যাবিনেটে এই দাবী উঠলেও পরবর্তীতে নানান জটিলতায় অনুমোদনের বিষয়টি পিছিয়ে পড়তে থাকে। অবশেষে ২০১১ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক সভায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সি ক্যাটাগরিতে প্রতি বছর এই দিবসটি পালিত হবে।

এদিকে, ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হবার পর এখনও পর্যন্ত এই ইনস্টিটিউটেও বাংলা ইশারা ভাষা নিয়ে কোন কার্যক্রম দেখা যায়নি। যদিও ইশারা ভাষার নিজস্ব ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং নিজস্ব ভাষাতাত্ত্বিক উপাদান রয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে এম ওসমান খালেদ বলেন, জনসংখ্যার বিচারে ইশারা ভাষাই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা। অথচ এই ভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদানেরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দফতর, কিংবা আদালতেও আলাদা কোনো সুবিধা নেই। বিটিভি ও বেসরকারি চ্যানেল দেশ টিভিতে খবর পাঠের সাথে ইশারা ভাষার ব্যবস্থা রাখা হলেও অন্যান্য অনুষ্ঠান এবং দেশের আর কোন টিভি চ্যানেল এ এই ব্যবস্থা রাখা হয় নি। আমরা আশা করছি, ইশারা ভাষা দিবস স্বীকৃতি পেলে ভাষার স্বীকৃতির ব্যাপারটি তরান্বিত করবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ৩০ লাখ (এসডিএসএল’ এর তথ্য অনুযায়ী)। বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন অ্যানুয়াল সেক্টর পারফরমেন্স রিপোর্ট (এএসপিআর) ২০১২ অনুসারে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেই শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। অপরদিকে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত স্কুলের সংখ্যা মাত্র ৭টি। যেসব স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষকেরই নেই তেমন প্রশিক্ষণ। জানা যায়, আশির দশকের শেষদিকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বেশ কিছু শিক্ষকের অধিকাংশই বর্তমানে অবসরে আছেন। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থার (বিএনএফডি) সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ বলেন, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ভাষা জটিলতা কমাতে এবং এই ভাষার স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ভাবে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস উদযাপনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

 

বাংলাদেশ মহিলা বধির কল্যাণ সংস্থার সভাপতি শিরীন বেগম এর মতে, দিবসটি স্বীকৃতি পেলে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশু সহ শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা অনেক সহজ হয়ে যাবে। এছাড়া প্রতিবছর উদযাপিত হলে সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে যেমন ভূমিকা রাখবে তেমনি দেশের অনেকেই এই ব্যাপারে এগিয়ে আসতে আগ্রহী হবে। সকল প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতা দূর করে দ্রুতই এই দিবসের স্বীকৃতি পাওয়ার ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেন তিনি।