শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা নিয়েই আমার এই পথ চলা

71

 

জাহেদুল ইসলাম

 

এই রাত শেষ হবে, থেমে যাবে ঝড়

মেঘ ফুঁড়ে উড়ে যাবে বেদনার খড়

সাহসী জোয়াড় এলে ভরে যাবে কূল

নবীন তারার চোখে সাত রঙা ফুল।

 

সবে মাত্র কৈশোরে পা দিয়েছি। তখনো স্কুলের গণ্ডি পেরোই নি। স্বপ্ন আমার আকাশছোঁয়া। পড়ালেখা শেষ করে বড় ডাক্তার হবো। মানুষের সেবা করবো। কিন্তু হঠাৎ আমার সেই স্বপ্নে ভাঙ্গন ধরতে শুরু হলো। কোন এক অজানা কারণে আমার দুই কানেই মারাতœক ইনফেকশন দেখা দিলো। এরপর ডাক্তার, হাসপাতাল, ছুটোছুটি। অতঃপর দুই কানেই অপারেশন। অবস্থার কোন উন্নতি না হওয়ায় পর পর আরো তিনবার অপারেশন হলো। ততদিনে ডাক্তারের অবহেলা আর ভুল চিকিৎসায় আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার দুই কানের স¤পূর্ণ শ্রবণ শক্তি। হারিয়েছি আমার শিক্ষা জীবনের অমূল্য দু’দুটো বছর। আমি মানুষ, এর সাথে নতুন যোগ হলো শ্রবণ প্রতিবন্ধী হিসেবে সমাজে পরিচিতি আর একরাশ হতাশাচ্ছন্ন অন্ধকার ভবিষ্যৎ।

 

আমার বাবাকে তখন নানাজনে নানা পরামর্শে দিচ্ছে। কেউ কেউ পরামর্শ দিলো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিশেষায়িত স্কুলে আমাকে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দিতে। আমি তখন গভীর বিষন্নতায় আক্রান্ত। সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা মেনে নিতে পারছিলাম না। দিশেহারা আমি দিনরাত্তির এক করে কেবলই ভাবি প্রতিবন্ধিতাকে সাথী করে আমি কিভাবে পড়ালেখা চালিয়ে যাবো? ডাক্তার হয়ে সমাজের মানুষের সেবা করা কি তবে আমার পক্ষে সম্ভব নয়? নানা প্রশ্নের ঝড় ধাওয়া করে অবিরত।

 

পরিবার বিশেষায়িত স্কুলে ভর্তি করানোর চিন্তা ভাবনা শুরু করার আগেই সিদ্ধান্ত নিলাম যে করেই হোক মূলধারাতেই পড়াশোনা চালিয়ে যাবো। আমি জানতাম সমাজের মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সহায়ক কোন ব্যবস্থা নেই। কিন্তু আমি অনড়। পিছিয়ে পড়তে চাইনা, সমাজের মুলধারায় নিজেকে যোগ্য করতে চাই এই পণ নিয়ে শুরু হলো আমার নতুন অধ্যায়।

 

সেসময় মাধ্যমিক পরীক্ষার আর মাত্র ছয় মাস বাকী। আমি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম। স্কুলের স্যারদের যথেষ্ট আন্তরিক সহযোগিতা পেয়ে কৃতিত্বের সাথেই পাশ করলাম। ততদিনে আমার মনে যে ভয় আর সংশয় ছিলো তা অনেকখানি মিলিয়ে আÍবিশ্বাস জায়গা করে নিলো সেখানে। মাধ্যমিকের সাফল্যের ধারায় এবার উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার প্রস্তুতি নেয়ার পালা। আমার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। আল্লাহ্তায়ালার অপার কৃপায় ভালো একটা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে গেলাম এই ভেবে স্কুলের মতো কলেজেও স্যারদের আন্তরিক সহযোগিতা পাবো। কিন্তু বিধি বাম!

 

কলেজের শিক্ষকদের প্রচণ্ড অনীহা। কেউ আমাকে আলাদা সময় দিয়ে কোচিং করাতে চায়না। কোন শিক্ষক আমার পড়ালেখার খোঁজ খবর নেয় না। কেউ সাহায্য করতে চায়না। আমার এমন কোন বন্ধু ছিল না যারা আমার শিক্ষা জীবন এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে। যে কয়জন বন্ধু ছিলো তারা নিজেদের নিয়ে সবসময় ব্যস্ত। কাহাতক আর একজন প্রতিবন্ধী বন্ধুকে সময় দেয়া যায়? কানে না শোনার কারণে ক্লাসে কি লেকচার দেয়া হচ্ছে তা আমি বুঝতাম না। বোকার মতো স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম। ততদিনে এইটুক বুঝে গেছি যা করার তা নিজেকেই করতে হবে। কাউকে পাওয়া যাবে না যে আমাকে স্যারের লেকচার বুঝিয়ে দেবে। নিজে নিজেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াগুলো ছিলো বেশ কঠিন। নিজে বুঝে উঠা বেশ কষ্টসাধ্য এদিকে হাতে সময়ও খুব অল্প। স্যারদের অসহযোগিতার কারণে উচ্চ মাধ্যমিকে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল করতে পারলাম না। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন জলাঞ্জলী দিতে হলো। আবার কিছুটা হতাশা গ্রাস করে ফেলছিল। কিন্তু ভেঙ্গে পড়লে তো চলবে না!

 

আবারও নিজের মনের সাথে লড়াই করে নিজেই নিজেকে সাহস দিলাম। আরও উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য কোথাও কোচিং করা সম্ভব হল না। আমাকে আলাদা যত্ন নিয়ে সামান্য সময় খরচ করে পড়া বুঝিয়ে দেবে এমন কোন সহায়ক কোচিং সেন্টার কোথাও নেই। সারা দেশ ঘুরে ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা দেয়াও আমার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। আমার জেদ বা লক্ষ্য, সমাজের মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজের শিক্ষা জীবন শেষ করা। অনেক কষ্টে নিজে নিজে প্রস্তুতি নিয়েই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চট্টগ্রামের একটা স্বনামধন্য কলেজে ইংরেজী বিভাগে অনার্সে ভর্তি হয়ে গেলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে মিশ্র অভিজ্ঞতা হলো। এখানে পড়াশোনার পদ্ধতি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এখানে সবসময় ক্লাশে বসে লেকচার শুনতে হয়। প্রতিটা আলাদা আলাদা প্রশ্নের হ্যান্ড নোট সংগ্রহ করতে হয়। স্যার ম্যাডামদের সাথে সবসময় যোগাযোগ রক্ষা করতে  হয়। কিন্তু আমি নিরূপায়। ক্লাশে লেকচার শুনবো কি, কিছুই তো বুঝি না! নিজের দু’কানে শব্দে শব্দে সাজানো পৃথিবীর অজস্র বাক্য না শোনার অপারগতা নিয়ে স্যার ম্যাডামদের সাথে কিভাবে যোগাযোগ রক্ষা করবো? ঘুরেফিরে চোখের সামনে সেই একি দৃশ্য, সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এখানেও স্যার ম্যাডামেরা আলাদা করে সময় দিতে চায়না। প্রতি পদে পদে অসহযোগিতা। বিভিন্ন পাঠ্য সহায়ক বই কিনে নোট এবং সাজেশন তৈরী করে নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে নিজেকে শিক্ষাদান শুরু করলাম আবারও। এ এক অসম্ভবকে সম্ভব করার যুদ্ধ! তবে এ ক্ষেত্রে পারিবারিক সহযোগিতা না পেলে শত প্রতিকূলতা সাথে নিয়ে আমার একার পক্ষে এভাবে নিজের শিক্ষা জীবন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না।

 

আরেকটি বিষয় আমাকে একা পথ চলাচলে কিছুটা সাহস যুগিয়েছে তা হলো মানুষের ঠোঁট পড়ার পদ্ধতি যাকে বলা হয় লিপ রিডিং। আমি কারো কথাই শুনতে পাই না, আর প্রায় কৈশোরের শুরুর দিক থেকে কথা না বলতে বলতে মুখে জড়তা এসে গিয়েছে খানিকটা। লিপ রিডিং বলে কিছু আছে আমার জানা ছিলো না। মায়ের ঠোঁটের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে ঠোঁটের নাড়াচাড়ায় আমি কিছুটা অনুমান করতে পারতাম তিনি কি বলতে চান। এই আইডিয়া কাজে লাগানোর চেষ্টা করতাম রাস্তাঘাটে যত্রতত্র। কিন্তু সবার ঠোঁটের নড়াচড়া একি রকম নয়। কেউ দাঁতে দাঁত ঘষে মুখের ভেতর থেকে কথা বলে। কেউবা আবার ভালো ভাবেই ঠোঁট নাড়িয়ে কথা বলে। যাদের সাথে দীর্ঘদিন দেখা সাক্ষাৎ হয় তাদের ঠোঁটের নড়াচড়ার ফলে মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসা শব্দ একটু আধটু পড়তে পারি। আবার নতুন কেউ বা অপরিচিত কারো কথা প্রথম প্রথম বুঝতে কষ্ট হয়। অনেক সময় আবার দেখা যায় কারো কারো কথা বুঝতেই পারছি না একেবারে। এই লিপ রিডিং পদ্ধতি স্যার ম্যাডামদের লেকচার শোনার কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু যেহেতু কোথাও ভালোভাবে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাই নি তাই সেভাবে কাজে লাগাতে পারি নি। তবে ঘরের বাইরের টুকটাক দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পারি লিপ রিডিং করে যদিও সেটা দিনের আলোতে। রাতের অন্ধকারে ঘরের বাইরে একা চলাচল আমার জন্য বেশ কঠিন।

 

যা হোক চার বছরের অনার্স কোর্স যখন শেষের পথে আচমকাই আমার জীবনের মোড় ঘুরে যাবার মত একটি সংবাদ নিয়ে এলেন বাবা। তিনি আমাকে ইন্ডিয়া নিয়ে মাথার ভেতরে একটি শ্রবণযন্ত্র লাগাতে চান। আর এই অপারেশনের পর আমি ডাক্তারের আশ্বাস মতে ধীরে ধীরে শোনার ক্ষমতা অর্জন করবো আবারো। আমিও স্বপ্নের জ্বাল বুনছি নিজের মনে, মেশিনের সাহায্যে শুনতে পাবো। স্যার ম্যাডামদের লেকচার বুঝতে আর ঝামেলা পোহাতে হবে না। নানা পরীক্ষা শেষে অপারেশন হয়েও গেলো। একটু একটু শুনতে পাচ্ছি সে খুশিতে আমি অস্থির উত্তেজিত। মানুষের কন্ঠ শুনি। পাখির কিচির মিচির শুনি। মিউজিক প্লেয়ার ছেড়ে গান শুনি। আর আড়ালে বুঝি স্রষ্ঠা মুচকি হাসেন আমার কাণ্ড দেখে। মাস না পেরোতেই আবারো ইনফেকশন ধরা পড়লো আমার কানে। কোন আওয়াজ কানে গেলেই ভয়াবহ অসহনীয় ব্যথা। সহ্যের বাইরে চলে গেলো মাথার ব্যথা। বাবা আবারো ইন্ডিয়াতে নিয়ে গেলেন আমাকে। আবারো অপারেশন টেবিলে যেতে হলো। খুলে নেয়া হলো মেশিন। আবারো পড়াশোনায় ছেদ পড়ল। ডাক্তার নার্স ঔষধ আর ইনজেকশনের সিরিঞ্জ তখন আমার নিত্যদিনের সঙ্গী।

 

মাঝে মাঝে ভাবি এই শ্রবণ প্রতিবন্ধী শব্দটি আমার জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে গেঁথে দিয়েছেন স্রষ্ঠা। বারেবারে একি ঘটনার পুনরাবৃত্তি। গত ১৪ বছরে সবমিলিয়ে আমার কানে ছয় বার অপারেশন হলো। এই পুরোটা সময় কি পরিমাণ শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশে আমি সম্ভবত অক্ষম। আমার অনার্স কোর্স থেকেও কিছু সময় হারিয়ে গেছে। ঠিক সময়ে পরীক্ষা দিতে পারি নি। কিন্তু আমি হাল ছেড়ে দেবার কথা একবারো ভাবি নি। দাঁতে দাঁত কামড়ে নিজেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে অবিচল থেকেছি।

 

আজ এতবছরে সেদিনের সেই শৈশব পেরোনো কিশোর আমি আজ পরিপূর্ণ যুবক। অবশেষে এই তো কিছুদিন আগেই ইংরেজী বিভাগ থেকে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাশ করেছি। এখন আমার লক্ষ্য মাষ্টার্স শেষ করা। কর্মজীবনে প্রবেশ করে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। আমার বিশ্বাস আমি সেটাও পারব। প্রতিবন্ধিতা আমাকে ভুগিয়েছে কিন্তু পরাজিত করতে পারেনি। যারা আমার মতো বিভিন্ন প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন তাদের বলি, সাময়িক ব্যর্থতায় কখনো হাল ছেড়ো না বন্ধু। সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাও। লক্ষ্যের পথে অবিচল থাকলে সাফল্য আসবেই। আমি বিশ্বাস করি,