বাড়ি13th issue, December 2015সিজোফ্রেনিয়া ও মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি

সিজোফ্রেনিয়া ও মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি

 

বদরুল মান্নান

 

২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এমন লোকের দেখা মেলে নি, যিনি মনে করেন সিজোফ্রেনিয়ার কারণে প্রতিবন্ধিতা হয়। সিজোফ্রেনিয়ার অপরাধ, “এর চিকিৎসা আছে।” ডাক্তারদের সহানুভূতিশীল বাণী কানে মধু বর্ষায়, “ভাল হয়ে যাবে।” ‘চিকিৎসা‘ থাকলে প্রতিবন্ধিতা নয় এটাই বিচার! তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০১ এর প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “সিজোফ্রেনিয়া বিভিন্ন মাত্রায় প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টি করে।”

 

ভারতের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আইন ১৯৮৫ এ সিজোফ্রেনিয়া এককভাবে মানসিক প্রতিবন্ধী নামে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশে ২০০৩ সাল থেকে এ বিষয়ে দাবী জানিয়ে আসছি আমরা। অবশেষে ২০০৪ সালে এই বদ্ধ দুয়ার একটু খোলে যখন আমরা প্রতিবন্ধী বিষয়ক মেলায় ভাগ্যক্রমে একটি ষ্টল পাই। সেখানে আমাদের এই দাবী অনেকের টনক নাড়ায় এবং তার ফলে ২০০৫ সালে প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন-২০০১ এর চলমান সংশোধন প্রক্রিয়া সভায় আমাদের দাবীর বিষয় উপস্থাপন করার আমন্ত্রণ পাই। কাজটা খুবই কঠিন হবে ভেবেছিলাম এবং শুরুটাও কঠিন ছিল। কিন্তু অত সহজ কোন কাজ সম্ভবতঃ আমার জীবনে আর হয় নি। কারণ একটাই। আপত্তিকারী ছাড়া আর সকলেই আমাদের দাবীটিতে কান দিয়েছিলেন ও যাচাই করে তবেই আমাকে সভায় উপস্থিত করেছেন।

২০০১ সালের কল্যাণ আইন সংশোধন হলেও তা আলোর মুখ দেখে নি। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে অধিকার আইন পেয়েছি। সেই আইনে এই প্রতিবন্ধিতা গুবলেট করা হয়েছে। অতি সরলিকরণের ফলে এখানে সিজোফ্রেনিয়াকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

এই বিষয়ই এবারের প্রতিপাদ্য। সম্মান, অসম্মান নয়। কাকে সম্মান? যাকে এতদিন অবজ্ঞা করে এসেছি, সিজোফ্রেনিয়া এর সম্মুখীন সেই ‘পাগল‘কে? যার চালচুলো নেই, যার অবস্থান আশ্রিতের সেই মানসিক স্বাস্থ্যকে? হাসির ব্যাপার। বড় জোর মুখেমুখে সম্মান করা সম্ভব। মন থেকে সহজে না।

 

হ্যাঁ, প্রশ্ন। মানসিক স্বাস্থ্যের চালচুলো নেই, অবস্থান আশ্রিতের কিভাবে? মনে রাখতে হবে, প্রশ্নটা সম্মানের। রবি ঠাকুরের ভাষায়, ‘যাহারা গর্ব করে তাঁহারা গৌরব পায়।‘ স্বাস্থ্য জনিত ক্ষতির (DALY) ১৫% মানসিক স্বাস্থ্যের কারণে হলেও স্বাস্থ্য খাতে সরকারের মোট ব্যয়ের মাত্র ০.৫% ব্যয় হয় মানসিক স্বাস্থ্য খাতে। কি প্রচন্ড অবহেলা! অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে স্বাস্থ্যের তিনটি অংশ- শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য। এরা কেউ কারো অধীন নয়। কিন্তু কার্যতঃ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নেই কোন বরাদ্দ। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নেই ডাক্তার। শরীরের ডাক্তারই মনের চিকিৎসা করেন। তাদের কাছে মগজই মন। মনের আলাদা কোন সত্ত্বা নেই। তারা এমবিবিএস পড়ে, মনের ডাক্তার হন। তারা সরাসরি মনকে দেখবেন কিভাবে? তারা মনকে দেখেন শরীরের মাধ্যমে যেমন মগজকে মন দেখেন। সরাসরি মনের ডাক্তার হবার ব্যবস্থাও নেই। অথচ দেহের অংশ হওয়া সত্ত্বেও দাঁতের ডাক্তার হন সরাসরি। বিশেষায়িত হতে হতে অদূর ভবিষ্যতে ডান পা ও বাম পায়ের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়ত আলাদা হবেন কিন্তু মনের ডাক্তার কেউ হতে পারবেন না।

 

সিজোফ্রেনিয়া প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে আমাদের দেশে ছিনিমিনি খেলা চলছে অনেকদিন ধরেই। ভারতের আইনে ১৯৮৫ সালে একে মানসিক প্রতিবন্ধিতা বলা হয় আর মেন্টাল রিটার্ডেশনকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা বলা হয়। আমাদের দেশে কল্যাণ আইনেই মেন্টাল রিটার্ডেশনকে মানসিক প্রতিবন্ধিতা বোঝানো হয়েছিল। সেখানে সিজোফ্রেনিয়ার স্বীকৃতিই ছিল না। আর ২০১৩ সালের আইনে এর সাথেই সব রকমের মানসিক সমস্যা ঢুকিয়ে এর সম্মানের ঐতিহাসিক প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে, বারটা বেজেছে। আবার যখন বিশ্বে সিজোফ্রেনিয়াকে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা বলা হচ্ছে তখন আমাদের দেশে বিভ্রান্তিকর অপব্যাখ্যা দিয়ে ট্রমাকে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা বুঝানো হচ্ছে। অথচ ট্রমা কখনোই প্রতিবন্ধিতা নয়। সমাজ ট্রমা সম্মুখীন ব্যক্তিকে দূরে ঠেলে দেয় না বা দূরে রাখে না। বরং ট্রমা ব্যক্তিরা নিজেরাই গুটিয়ে থাকেন। তাই তাদের একাকিত্ব বা সমাজ বিচ্ছিন্নতা কোন ক্রমেই সামাজিক প্রতিবন্ধিতা নয়। এহেন ছিনিমিনি খেলা ও অসম্মান যেমন মঙ্গলদায়ক নয় তেমনই হঠকারি।

 

আর অসম্মান করতে খসড়া মানসিক স্বাস্থ্য আইন-২০১৪ আরেক ধাপ এগিয়ে। এই খসড়ায় মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বাধ্যতামূলকভাবে চিকিৎসা নামক প্রক্রিয়া নিরাপদে চালানোর জন্য ‘অপ্রতিবাদী রোগী‘ নামক আখ্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে [ধারা ২(২) ]। বন্দি অবস্থান থেকে মানসিক অসুস্থ আখ্যায়িত ব্যক্তিটি কিভাবে প্রমাণ করবেন যে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন? আর আছে ইচ্ছে বিরুদ্ধ চিকিৎসার [ধারা ২০(১) (গ) অনিচ্ছাকৃত ভর্তি ] বিধান। কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে চিকিৎসা নামক প্রক্রিয়া চালানো কোন মতেই সম্মানজনক ভাবা যায় না। তবে অনেকেই হয়ত অসম্মানের বিষয়টি ও ইচ্ছার প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবেন না। কারণ তাদের হিতৈষী মত এতই প্রবল যে উপকার তাকে করতেই হবে। কিন্তু ভাবুন তো যদি কোন আইন সম্মত সংস্থা নিজ জ্ঞানে আপনার জীবনের নিরাপত্তার জন্য আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আপনাকে জেলে আটকে রাখে আপনি তাহলে কেমন সম্মানিত বোধ করবেন? আপনি কি ভাবতে পারবেন, আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও আমার ভালই করছে। পারলেও কত মাস পারবেন? ব্যাপারটা এমনই। আর ইচ্ছার ব্যাপারটাই তো ধর্ষণের প্রধান নির্ধারক। ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিবেচনা এমনই। তাছাড়া এই আইনে কোন অপরাধ না করা সত্ত্বেও ইচ্ছার বিরূদ্ধে আটক রেখে চিকিৎসা নামক প্রক্রিয়া চালানোর ব্যবস্থা আছে [ধারা ২৬ ]। আবার স্বেচ্ছায় চিকিৎসা নিতে এসে আটকে যাওয়ার বিধানও এই আইনে আছে [ধারা ২১(৩), (৪)]।

 

আবেগ নয়, স্বার্থ নয় বরং সুবুদ্ধি তাড়িত কর্মই প্রার্থিত সম্মান প্রদানে সক্ষম। সে দিন যতই এগিয়ে আসবে ততই মঙ্গল।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ফর মেন্টাল হেল্থ এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন

 

সর্বশেষ

বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে শিক্ষা উপকরণ সংকট; নানামুখী সমস্যায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা

অপরাজেয় প্রতিবেদক পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সঠিক রঙের ব্যবহার, সহায়ক উপকরণ, ইন্ডিকেটর বা সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণে সহায়ক সফটওয়্যার ও অডিও বইয়ের অভাবসহ নানামুখী সমস্যার কারণে সাধারণ...

মাসিক আর্কাইভ

Translate | অনুবাদ