দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের রাস্তায় একা চলাচল

82

নুরুন্নাহার তনিমা

হঠাৎ আমার জীবন বদলে গেল। শ্যামলীর আদাবর, সড়ক ১২তে একটি সংগঠন আছে যার নাম প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ, সংক্ষেপে পিএনএসপি। সেখানকার পরিচালক রফিক জামান ভাই জাদুর মতো আমার জীবন বদলে দিলেন। আমাকে রাস্তায় একা চলতে শিখিয়ে, আমার সব ভুল ধারণা ভেঙে দিলেন। শুধু আমার নয়, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের রাস্তায় একা চলাচল বিষয়ে আমাদের বাবা-মায়ের মনোভাবও বদলে দিয়েছেন তিনি। আমার জীবনের গতিপথ একেবারে পাল্টে দিয়েছেন এই রফিক ভাই এবং তার সংগঠন পিএনএসপি। আমার সকাল-বিকেলের অলস সময়গুলো হারিয়ে গেছে কোনো এক জাদুর কাঠির স্পর্শে।
এখন আমি একা বাজার করি। ঘরের বিভিন্ন কাজ করতে একা রাস্তায় বের হয়ে যাই। আমার জন্য একটা কাজের পথও জুটিয়ে দিয়েছেন রফিক ভাই। আমি একাই সেই বিদ্যালয়ে পড়াতে যাই।

আমরা তিন বোন ঢাকাতেই থাকি। দু’বোনের দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা ছোটবেলা থেকে। আমার বাবা-মা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সন্তানদের শিশুকাল থেকে স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে সচেতন ছিলেন না। বড় আপা বিদ্যালয়ে যেত। আমরা ঘরে থাকতাম। বড় আপা বেড়াতে যেত। আর আমরা ভাবতাম যদি যেতে পারতাম! কিন্তু বাবা-মাকে বলতে সাহস হতো না। ছোট ছিলাম, তাই বুঝতাম না আমরা অস্বাভাবিক এক জীবন যাপন করছি।

তবে আমরা দুই বোন হলাম বাবা মায়ের কলিজার টুকরা। দুজনেই সব সময় চেষ্টা করতেন আমাদের খুশি রাখতে। আমরা যখন যা চাইতাম, তারা তাই আমাদের এনে দিতেন। গান খুব ভালোবাসতাম। তাই বাবা আমাদের বাসায় শিক্ষক রেখে গান শিখিয়েছেন। কিন্তু অভিজ্ঞ ও ভালো শিক্ষকের কাছে না গেলে ভালো করে গান শেখা যায় না। অনেক আশা নিয়ে অভিজ্ঞ এক শিক্ষককে গান শেখানোর অনুরোধ করলাম, তিনি বললেন, আমি বাসায় গিয়ে কখনো গান শেখাই না। আমাদের দুই বোনকে দুই হাতে ধরে রাস্তায় হাঁটতে আমার মামণির খুব ঝামেলা হতো। তাই কখনো কখনো তিনি চাইতেন, বড় আপা আমাদের সঙ্গে যাক। তাহলে মামণি একজনকে ধরে রাস্তায় হাঁটবেন আর বড় আপা আরেকজনকে ধরবেন। আপা যেত। কিন্তু যখন অনেক সময় গানের রেওয়াজ বেশি সময় ধরে চলত, আর আমাদের জন্য আপা ও মামণিকে সব কাজ ফেলে আমাদের বাসায় ফিরিয়ে নেওয়ার অপেক্ষায় থাকতে গিয়ে বড় আপার কাজে দেরি হয়ে যেত; তখন ও বিরক্ত হতো। যদিও মামণিকে না করতে পারতো না। অথচ ওর কাজের ক্ষতি হতো। আমরা দুই বোন মন খারাপ করে ভাবতাম, যদি এমন হতো আমরা দুজন মাসে একবার করে চোখে দেখব, তাহলে কারুর সাহায্য নিতে হতো না। 

মা-বাবা ভয় পেতেন আমাদের একা রাস্তায় ছাড়তে। আমরাও ভাবতাম দৃষ্টিহীন মানুষেরা একা রাস্তায় বের হয় না। আমাদের সবার বদ্ধমূল ধারণা ছিল সম্পূর্ণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ কখনোই একাকী রাস্তায় চলতে পারেন না।

যত বড় হচ্ছি, আমাদের প্রয়োজন বাড়ছে। প্রয়োজনের তাগিদে মনের ওপর চাপ বাড়ছে। ঘরের বাইরে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে না পারার যাতনা কুরে কুরে খাচ্ছে আমাকে। সবচেয়ে বেশি হতাশ হয়ে পড়তাম যখনই মনে হতো, বাবা-মায়ের অবর্তমানে আমাদের দুজনকে বড় আপার বাসায় থাকতে হবে, তখন আমার কিছুই ভালো লাগত না।

কিন্তু হঠাৎ আমার জীবন বদলে গেল। শ্যামলীর আদাবর, সড়ক ১২তে একটি সংগঠন যার নাম প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ, সংক্ষেপে পিএনএসপি। সেখানকার পরিচালক রফিক জামান ভাই জাদুর মতো আমার জীবন বদলে দিলেন। আমাকে রাস্তায় একা চলতে শিখিয়ে, আমার সব ভুল ধারণা ভেঙে দিলেন। শুধু আমার নয়, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের রাস্তায় একা চলাচল বিষয়ে আমাদের বাবা-মায়ের মনোভাবও বদলে দিয়েছেন তিনি। আমার জীবনের গতিপথ একেবারে পাল্টে দিয়েছেন এই রফিক ভাই এবং তার সংগঠন পিএনএসপি। আমার সকাল-বিকেলের অলস সময়গুলো হারিয়ে গেছে কোনো এক জাদুর কাঠির স্পর্শে।

এখন আমি একা বাজার করি। ঘরের বিভিন্ন কাজ করতে একা রাস্তায় বের হয়ে যাই। আমার জন্য একটা কাজের পথও জুটিয়ে দিয়েছেন রফিক ভাই। আমি একাই সেই বিদ্যালয়ে পড়াতে যাই। ফিজিওথেরাপি শিখে, ফিজিওথেরাপি সেবা দিতে যাই মানুষকে। টিউশনি করি। এখন আমার একা বের হতে কোনো সমস্যা হয় না। মনেই হয় না, মাসে এক দিন চোখে দেখলে ভালো হতো। বাসার কারও সাহায্য আর দরকার হয় না আমার। বাবা-মাও আমার দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হওয়াকে আমার দুর্বলতা ভাবেন না।

গত বছর রোজার ঈদের দিন থেকে আমি বাদে বাসার সবার জ্বর হয়েছিল। দোকান থেকে আমি সবার জন্য ওষুধ কিনে আনি। এই কাজটা করার পর আমার বাবা এতটাই খুশি হন যে অতি আবেগে তিনি কেঁদে ফেলেন। আমিও বাবা-মায়ের পাশে থেকে তাদের সেবা করতে পেরে খুব খুশি।

আমি এখন বুঝি, রাস্তায় বের হতে দৃষ্টি যতটা জরুরি, তার চেয়ে অনেক বেশি দরকার হলো মানুষের মনের সাহস। কারণ, সাহস না থাকলে কোনো কাজই করা যায় না। এ লেখা পড়ে যদি সব বাবা-মায়ের মনের ভুল ধারণা ভেঙে যায় এবং যদি তারা বুঝতে পারেন স্বাভাবিক যা, তা-ই সুন্দর- তাহলেই আমার নিজের জীবনের এই গল্পটি বলা সার্থক।

বাংলাদেশের সকল বাবা-মায়ের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা আপনাদের প্রতিবন্ধী সন্তানদের সাহস দিয়ে তাদের মনোবল বাড়াবেন, ভয় দেখিয়ে তাদের ঘরে আটকে রাখবেন না।