স্থাপত্য নকশায় পুরস্কৃত আগা খান মসজিদ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব নয়

115

মাহমুদুল হাসান

কয়েকজন বন্ধু মিলে স্থাপত্য নকশায় পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। একজন নারী স্থপতি আধুনিক স্থাপত্য ধারণার প্রতিফলন ঘটিয়ে মসজিদটির নকশা করেছেন। ঢাকার দক্ষিণখানের ফয়েদাবাদে অবস্থিত এই মসজিদের নাম বায়তুর রউফ। স্থপতির নাম মেরিনা তাবাসসুম। স্থাপত্য নকশায় অভিনবত্বের দরুন ‘আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক’ মেরিনাকে আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার ২০১৬ এ পুরস্কৃত করেছে।

একটি টেলিভিশন প্রতিবেদন থেকে মসজিদটি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি। মসজিদের কোনো মিনার নেই, গম্বুজ নেই, মিহরাব নেই। কিন্তু মসজিদের ভেতর প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা আছে। নানান বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যের কথা জেনে মসজিদটিতে যেতে আগ্রহী হয়েছিলাম।

আমাদের বন্ধু জামাল। সে হুইলচেয়ারসহকারে চলাফেরা করে। আমাদের মসজিদ দর্শনে যাওয়ার পরিকল্পনা শুনে সেও অনেক উৎসাহ নিয়ে যেতে চাইল। তার চলাচলে হুইলচেয়ার যাতায়াতের সমস্যার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বাধাপ্রাপ্ত হতে হয়। কিন্তু আধুনিক স্থপতি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার মতো নকশাকৃত এ মসজিদে প্রবেশগম্যতায় বাধা পেতে হতে পারে, তা ভাবনাতেই আসেনি।

কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারে উল্টো। জামালকে নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে গিয়েই বিপত্তির শুরু। রাস্তা থেকে মসজিদে ওঠার জন্য সিঁড়ির পাশাপাশি হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য যেমনটি থাকতে হয়, তেমন কোনো ঢালু পথ (র‌্যাম্প) ছিল না। বাধ্য হয়েই দুজন ধরে হুইলচেয়ারসহ তাকে মসজিদ পর্যন্ত ওঠালাম। অসুবিধার মাত্রাটা চরমে পৌঁছল যখন জামাল বলল, তার টয়লেটে যেতে হবে। সেই সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে গুগল ম্যাপ অনুসরণ করে কখনো পথ হারিয়ে, কখনো লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে, নানা অলিগলি পেরিয়ে মসজিতে পৌঁছতে আমাদের প্রায় দুই ঘণ্টা লেগেছে। টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হওয়াটাই স্বাভাবিক। জামালকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে টয়লেট দেখতে গেলাম। একটা সরু পেসেজ দিয়ে অজুর জায়গা পার হয়ে টয়লেটে যেতে হয়। দুটো মাত্র টয়লেট। নিচু কমোড। যার কোনোটাই হুইলচেয়ার নিয়ে ঢোকা বা ব্যবহার করার উপযোগী করে তৈরি করা হয়নি। গম্ভীর মুখে ফিরে এলে জামাল বলল, আমাকে বাইরে রেখে তোরা ভিতরে নামাজ পড়ে আয়। আমি বাসায় গিয়ে নামাজ পড়ে নেব। তার কথা শুনে আমার প্রায় কান্না চলে এলো।

গণস্থাপনাগুলো প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য প্রবেশগম্য করে তৈরি করা হয় না। এটা আমাদের অদূরদর্শিতা ও সংকীর্ণতা ছাড়া আর কিছু নয়। উন্নতির যুগে, এটা আমাদের অনুন্নতির উদাহরণ। নিজের ঘর ছাড়া যেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। সেদিন সকালে জামালকে নিয়ে ধানমন্ডির স্টার রেস্টুরেন্টে নাশতা করতে গিয়েও একই সমস্যা হয়েছিল। রাস্তা থেকে নিচতলার ডাইনিং হলে অথবা লিফট পর্যন্ত যেতে আনুমানিক দশ ধাপের একটা সিঁড়ি বাইতে হয়েছিল। বেশ প্রশস্ত সেই সিঁড়ির এক পাশে একটা ঢালু পথ তৈরি করলে কী সমস্যা হতো? জামালকে কষ্ট করে ওঠাতে দেখে আশপাশের অনেকেই বলছিল, তার জন্য বাসায় নাশতা নিয়ে গেলেই তো হতো? এই কথা শুনে আমি অবাক হয়েছি। আমাদের মনমানসিকতা কতটা সুবিচারবিরোধী? আমার মতে, এটা অপ্রতিবন্ধী মানুষের মানসিক দৈন্যতা। এই আধুনিক সময়ে কীভাবে আমরা এ রকম ভাবতে বা বলতে পারি?

একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি তার বন্ধুবান্ধব নিয়ে একটা ভালো রেস্তোরাঁয় খেতে পারবে না?

মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ পড়তে পারবে না?

আমরা অপ্রতিবন্ধী মানুষেরা প্রতিবন্ধী মানুষদের ইচ্ছা, ভালো লাগা বা অধিকারের কথা চিন্তা করব না? এটা কীভাবে হয়?

যাহোক, আমরা জামালের হুইলচেয়ারকে কখনো সোজা, কখনো আড়াআড়ি, কখনো একটু উঁচু করে টয়লেট পর্যন্ত নিয়ে গেলাম। একটু প্রশস্ত পথ, কয়েকটি উঁচু-নিচু ধাপ ঢালু করে তৈরি করলেই এই সমস্যায় পড়তে হতো না। তারপর আসে অজুর স্থান। ছোট ও নিচু বেশ কিছু বসার জায়গায় পানির ট্যাপ দিয়ে সবার জন্য অজু করার ভালো ব্যবস্থা থাকলেও জামালের পক্ষে সেখানে পৌঁছা সম্ভব ছিল না। হুইলচেয়ারকে পানির ট্যাপ পর্যন্ত নেওয়াই যায় না। একটা বসার জায়গা ফাঁকা রেখে হুইলচেয়ারের সঙ্গে সামঞ্জস্য উচ্চতায় একটা ট্যাপে পানির ব্যবস্থা থাকলে এবং একটা অতিরিক্ত মগের ব্যবস্থা থাকলে জামালের মতো যে কেউ নিজের অজু নিজেই করে নিতে পারত। একটা খোলা জায়গায় আলাদা পানি এনে দিয়ে ওকে অজু করাতে হলো। তারপর আবারও এক ধাপ নিচে নেমে (র‌্যাম্প ছাড়া) মসজিদে প্রবেশ করতে হলো।

আমার মতে, মসজিদটির স্থাপত্য পরিকল্পনায় নতুন ধারণার দিকে যতটা মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, সেই তুলনায় প্রার্থনার জন্য সকলের সম-অংশগ্রহণের সুযোগ-সুবিধার দিকে কোনো মনোযোগেই দেওয়া হয়নি। বরং বলা যায়, অবহেলাই করা হয়েছে। মনে হয়েছে, এই স্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এর প্রবেশগম্যতা। কেননা, স্থাপত্য পরিকল্পনায় মসজিদের সামগ্রিক উৎকর্ষের বিষয়টি ছিল না। শুধু স্থাপত্যশৈলীর দিকেই মনোযোগ ছিল। আমি যতটুকু বুঝি, যেকোনো আধুনিক স্থাপনা যদি গণস্থাপনা হয়, তাহলে সেটা কতটা ভালোভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটা বিবেচনায় রাখাটা মৌলিক। বিশেষ করে হুইলচেয়ারের প্রবেশগম্যতা না রাখাটা রীতিমতো চিন্তা ও মানসিক সীমাবদ্ধতার পরিচায়ক। এই আধুনিক জীবন, সমাজ ও স্থাপত্যে যা একবারেই অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য।

হয়তো মসজিদ বলেই হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষের চিন্তা মেরিনা তাবাসসুমের বিবেচনায় আসেনি। অথবা, বাংলাদেশ বলেই এই দিকটা অবহেলা করা হয়েছে। পুরস্কারদাতা আগা খান, কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে স্থাপত্য নকশার দিকেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে, শুধু নির্মাণশৈলীকে বিচারে এনেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

আমার অভিজ্ঞতায়, এ দেশের মসজিদগুলোতে শুধু নামাজের জায়গাটাতেই ফোকাস করা হয়। মসজিদে প্রবেশ এবং বের হওয়ার পথে, টয়লেট আর অজুর জায়গাতে মনোযোগ দেওয়াই হয় না। নারী-শিশু-বৃদ্ধ, শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সুবিধার বিষয়ে চিন্তা করা তো দূরের ব্যাপার। বায়তুর রউফ মসজিদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

আমাদের আগ্রহের কেন্দ্র ছিল বলেই এত দূর থেকে মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে এসেছিলাম। কিন্তু, পরিকল্পিতভাবে নির্মিত মসজিদেও সাধারণ সব দুর্বলতা রয়ে গেছে বলে আমরা দারুণভাবে আশাহত হয়েছি। যাহোক, সর্বস্তরের মুসল্লিদের সুবিধা এবং আধুনিক স্থাপত্য ও সমাজচিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়ে অজু-ইস্তিঞ্জার জায়গা তৈরি করলে হয়তো কোনো পুরস্কারও পাওয়া যেত না। তারপরও মনকে মানাতে পারছিলাম না। নামাজ শেষে বন্ধুকে বলেছিলাম, এই মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে এসে তোকে নিয়ে যে পরিমাণ টানাহেঁচড়া করতে হলো, মেরিনা তাবাসসুমকে খুঁজে বের করে জিজ্ঞাসা করা দরকার, আপনি না হয়ে এই মসজিদটা যদি হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী আমেরিকান স্থপতি মাইকেল গ্রাভস ডিজাইন করতেন, তাহলে মসজিদটা কেমন হতে পারত?