৪০তম বিসিএস বর্জন শ্রুতিলেখক নিয়োগসহ ৬ দফা দাবিতে জোরালো আন্দোলন

23

ডেক/ইনসেট: সংসদ ভবনের সামনের রাস্তা অবরোধ করে আমরণ অনশনে চাকরিপ্রত্যাশী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। ৪০তম বিসিএস বর্জন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি এবং সমাজসেবা অধিদফতর ও জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ঘেরাও।

অপরাজেয় প্রতিবেদক

চাহিদা অনুযায়ী শ্রুতিলেখক নিয়োগসহ ছয় দফা দাবিতে তিন মাস ধরে স্নাতকোত্তর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পরিষদের আন্দোলন চলছে। সর্বশেষ সরকারের সাড়া না পেয়ে সংসদ ভবনের ১২ নং প্রবেশদ্বারের সামনের রাস্তা অবরোধ করে আমরণ অনশনে বসেছে চাকরিপ্রত্যাশী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। এর আগে গত ৫ মে তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিলে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যালয়ের পরিচালক প্রশাসন-৩ অতুল সরকার তাদের ডেকে ১৪ কর্মদিবসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পিএসসি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হলেও ফলপ্রসূ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এদিকে রিসোর্স শিক্ষক নিয়োগের সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী পরিষদ গত ২৮ মে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেয় এবং ছয় দফা দাবি মেনে না নিলে ২২ জুনের পর কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। এ ছাড়া বিসিএস পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক নিয়োগের ব্যাপারে পিএসসির দায়সারা মনোভাবের কারণে গত ৩ মে ৪০তম বিসিএস পরীক্ষা বর্জন এবং একই দিনে পিএসসি কার্যালয়ের সামনে প্রতীকী অনশন করেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা।

উল্লেখ্য, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) রিসোর্স শিক্ষক পদ-সংক্রান্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিলসহ সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি চাকরি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শ্রুতিলেখক নীতিমালার ধারা ২৫ এর বি উপধারা অনুযায়ী শ্রুতিলেখক নিয়োগের দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ¯স্নাতকোত্তর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা চাকরিপ্রত্যাশী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী গ্র্যাজুয়েট পরিষদ গঠন করে ছয় দফা দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী গ্র্যাজুয়েট পরিষদের আহবায়ক আলী হোসেন জানান, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ১০ম গ্রেডভুক্ত ৩৮ নং রিসোর্স শিক্ষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয় গত ১৭ এপ্রিল, ২০১৯। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পাঠদান দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষক দিলেই তা ফলপ্রসূ হয়, এ কারণে ১৭ এপ্রিল প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি বাতিল করে উক্ত পদে শুধু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষক নিয়োগের দাবি তোলে পরিষদ। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ এপ্রিল শাহবাগে পিএসসির রিসোর্স শিক্ষক নিয়োগ বাতিল এবং বিশেষ ব্যবস্থায় নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে সৃষ্ট বাধা দূরীকরণের জন্য অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এরপর প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি জমা দিতে গেলে পুলিশি হামলার সম্মুখীন হন তারা। এরপর থেকেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন জোরদারভাবে শুরু হয়। পিএসসির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন ও শাহবাগে ঘটে যাওয়া পুলিশি হামলার নিন্দা জানিয়ে গত ৩০ এপ্রিল রাজু ভাস্কর্যে মানববন্ধন করেন তারা। এর দুদিন পর সমাজসেবা অধিদফতরের প্রধান ফটকের সামনে দিনব্যাপী অবস্থান নেন এবং পরবর্তীকালে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনও অবরুদ্ধ করেন।

ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে জানালে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক সভায় পিএসসির রিসোর্স শিক্ষক-সংক্রান্ত নিয়োগ বাতিল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রুতিলেখক নীতিমালার ধারা ২৫ এর বি অনুযায়ী শ্রুতিলেখক নিয়োগ প্রচলনের সুপারিশ করেন। এ ধারাবাহিকতায় গত ১৬ মে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী গ্র্যাজুয়েট পরিষদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে পিএসসির নীতিমালা অনুযায়ী শ্রুতিলেখক বিষয়ক সিদ্ধান্ত হবে এই মর্মে পিএসসির চেয়ারম্যান সিদ্ধান্ত দিতে চাইলে সমাধান ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়। উল্লেখ্য, শ্রুতিলেখক পরীক্ষার্থীর চেয়ে নিচের শ্রেণির হতে হবে এবং একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারবে না এমন নিয়ম থাকলেও পিএসসি শ্রুতিলেখক নিয়োগের সময় ভুল ব্যাখ্যায় নিয়োগ দিচ্ছে এমন অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

এ প্রসঙ্গে ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাহীন আলম বলেন, মনগড়াভাবে পিএসসি শ্রুতিলেখক নিয়োগ দিচ্ছে। এতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মিলন হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, পরীক্ষায় কেন্দ্রের দারোয়ান বা অফিস সহকারীকে শ্রুতিলেখক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যিনি আমাদের প্রশ্নপত্রই পড়ে শোনাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। অনেক সময় এমন শিক্ষার্থীকেও তারা নিয়োগ দেন যে ইংরেজি ও বাংলা কোনো প্রশ্নই সঠিক উচ্চারণে পড়তে অপারগ। অন্যদিকে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষাতেও একই সমস্যায় পড়তে হয় শ্রুতিলেখক নিয়ে। সরকার যেন একধরনের প্রবঞ্চনাই করছে আমাদের সঙ্গে।

গ্র্যাজুয়েট পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক মাহবুব মোরশেদ ও জাহাঙ্গীর আলম জানালেন, জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা আকরম খাঁ মিলনায়তনে গত ২০ মে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদকে প্রধান অতিথি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান এবং ডাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের উপস্থিতিতে গ্র্যাজুয়েট পরিষদের উপদেষ্টা হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পক্ষে কমপক্ষে দশ হাজার টাকা মাসিক বেকার ভাতা, প্রতিবছর ন্যূনতম এক শ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে চাকরির নিশ্চয়তা প্রদানসহ ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন। এ সময় প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

তবে চলতি জুন মাসের মধ্যবর্তী এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ফলপ্রসূ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ।