ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি

32

– মোস্তফা কামাল যাত্রা
মনো-দৈহিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিবিধানমূলক নাট্যক্রিয়া অনুশীলন নাট্য সংস্থা উৎস (UTSA) ১৯৯৭ সাল থেকে চট্টগ্রামের প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে কাজ করে আসছে। চট্টগ্রাম বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ইনষ্টিটিউট, হাই-কেয়ার হিয়ারিং সেন্টার এন্ড স্কুল এবং স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থা ইপসা’র উপকারভোগীদের নিয়ে স্বল্প সময়ে থেরাপিউটিক থিয়েটার-এর বিভিন্ন অনুষঙ্গের প্রয়োগ করতে গিয়ে যে পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে, তাকে সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে দাতা সংস্থা একশন এইড বাংলাদেশের আর্থিক সহযোগিতায় ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে “থিয়েটার থেরাপি সেন্টার অব দ্য ডিজএ্যাবল্ড (টিটিসিডি)”।

টিটিসিডি কেন্দ্রিয়ভাবে মনো-বিশ্লেষক নাট্য অধিবেশন পরিচালনার পাশাপাশি উৎস (ইউটিএসএ) এর তত্ত্বাবধানে ‘জাতীয় প্রতিবিধানমূলক নাট্য কর্মশালা’ আয়োজনের মাধ্যমে মনোসামাজিক নাট্যক্রিয়া পরিচালনায় দক্ষ থিয়েটার থেরাপিষ্ট গড়ে তুলতে ছিল সর্বদাই সচেষ্ট। এসব কর্মশালায় প্রশিক্ষণ দিয়েছেন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার বিখ্যাত মনো-বিশ্লেষক নাট্য বিজ্ঞানীরা।

চট্টগ্রামেরই আরেকটি স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সংশপ্তক’ -এর নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক ও বিনোদন কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং প্রতিভার উন্মেষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আমাদের আরও উৎসাহিত করে তুলে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) সংশপ্তকের উদ্যোগকে আরও সমৃদ্ধ করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে।

মনো-বিশ্লেষক নাট্যের পাশাপাশি প্রতিবন্ধিতা ইস্যুতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক নাটকের প্রদর্শনী আয়োজনে উৎস’র অভিজ্ঞা, সংশপ্তক, ইপসা, বিটা ও ওয়াচ’সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত আয়োজন, যেসব প্রতিভার আবিষ্কার করেছে তা আমাদের সমাজের জন্য এক দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ।

অপরদিকে ক্রীড়া ক্ষেত্রে ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রীড়া সমিতি’র সমর্থনে    ‘চিটাগাং সোসাইটি ফর দ্যা ডিসএ্যাবল্ড (সিএসডি)’ ২০০৫ সাল থেকেই চট্টগ্রামে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্রীড়ার বিকাশে আয়োজন করে আসছে ‘বিভাগীয় প্রতিবন্ধী ক্রীড়া প্রতিযোগিতা’। এ প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করতে চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রীড়া সমিতি- চট্টগ্রাম শাখা’। বর্তমানে চট্টগ্রাম ভিত্তিক উক্ত সংগঠন-দ্বয়ের পাশাপাশি চট্টগ্রামে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের ক্রিকেটের অনুশীলন ও বিকাশে কাজ করছে ‘চিটাগাং ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব (সিবিসিসি)’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান।

প্রতিবছর বিভাগীয় প্রতিবন্ধী ক্রীড়া সংস্থা, এ্যালায়েন্স অব আরবান ডিপিও’স ইন চিটাগাং (এইউডিসি), ডিজএ্যাবিলিটি রাইটস গ্রুপ (ডিআরজি) এবং উৎসের আয়োজনে ওয়ার্ড ভিত্তিক প্রতিবন্ধী ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনকে ঘিরে চট্টগ্রামে যে উদ্দীপনা ও উৎসাহ সৃষ্টি করে তা অভাবনীয়। তবে একে মূল স্রোতধারায় আরও বেশি করে অন্তর্ভুক্ত করতে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া পরিষদ, চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সমিতি, জেলা শিল্পকলা একাডেমী, শিশু একাডেমী এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত ‘থিয়েটার ইনষ্টিটিউট চট্টগ্রাম (টিআইসি)-কেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিগত এক দশকে বেসরকারি পর্যায় থেকে যে ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় পরিচালিত হয়েছে; তার ফলাফল স্বরূপ আমাদের প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ ও শিল্পীরা জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়েও রেখে চলেছে প্রতিভার স্বাক্ষর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই দিকে বিন্দুমাত্র দৃষ্টি নেই চট্টগ্রাম জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম জেলা প্রতিবন্ধী কল্যাণ কমিটির।

জাতীয় প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১ অনুযায়ী, উক্ত জেলা প্রতিবন্ধী কল্যাণ কমিটি প্রতি ২ মাসে ন্যূনতম ১টি সভা করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একীভূত সমাজ প্রতিষ্ঠায় নানান উদ্যোগ নেওয়ার কথা। কিন্তু উক্ত সভাটি নিয়মিত হয় না। যার ফলে জেলা প্রতিবন্ধী কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মসূচী বাস্তবায়নও হয় না। অন্যদিকে এই কমিটিতে নেই বিভাগীয় ক্রীড়া সমিতি পরিষদের কোন প্রতিনিধিত্ব। আমরা চলমান এই নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে চাই। চাই জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবন্ধী বান্ধব ইতিবাচক ও কার্যকর পদক্ষেপ। ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় কেন্দ্রিয়ভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যে উদাসীনতা প্রদর্শন করছে; তা সত্যিই বিমাতাসুলভ। এই মানসিকতার পরিবর্তন এনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পরিকল্পনা ও ইতিবাচক উদ্যোগ নেবেন এটাই এখন সময়ের দাবি।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, উৎস, চট্টগ্রাম।