প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য হুইলচেয়ার এক্সেসেবল বা প্রবেশগম্য টয়লেট

178

বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এক্সেসেবল বা সহজে প্রবেশগম্য টয়লেট এর ব্যবস্থা খুবই কম দেখা যায়। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্ট, স্টেডিয়াম, সিনেমাহল, অফিস-আদালত এমনকি বড় বড় শপিং মলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এক্সেসেবল টয়লেট এর পর্যাপ্ত কোন ব্যবস্থা নেই। ভীষণ প্রয়োজনীয় সহায়ক এ সুবিধা থেকে তাদের সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত বা উপেক্ষিত করে রাখা হয়েছে। একজন প্রবাসী হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী হিসেবে যখন আমি আমার কর্মস্থল এবং শপিংমল থেকে শুরু করে বিনোদন কেন্দ্র সর্বত্র নির্বিঘে অনেকটা সময় অবস্থান করতে পারি তখনই আমার প্রিয় মাতৃভ’মি বাংলাদেশে অবস্থানরত হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ভাই-বোনের কথা মনে পড়ে। তাদের কোথাও বেড়াতে যেতে বা বিশেষ কোন জরুরী কাজে ঘরের বাইরে বেশিক্ষণ অবস্থান করতে হলে কি ভীষণ কষ্ট ভোগ করেন কিছুটা অনুভব করতে পারি। কারণ আমি নিজেও ছুটিতে দেশে বেড়াতে এসে এসব যন্ত্রণার সম্মুখীন হই। আমার মত একজন প্রবাসী হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি ভিনদেশে সব ধরনের সহায়ক ব্যবস্থা পেয়ে এসে নিজ দেশে ল্যান্ড করা মাত্রই অন্যান্য বিমানযাত্রীদের সামনে সব ধরনের ‘হিউমিলিয়েশেন’বা লজ্জার সম্মুখীন হতে হয় এর চেয়ে দুঃখের বোধহয় আর কিছু নেই! কেনই বা আমাদের সাথে এ বৈষম্যে? এর কি আর শেষ নেই !? অথচ আমাদের জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ এর ৭ম অধ্যায়ের ৬৪ নং অনুচ্ছেদের প্রতিবন্ধীসহ সর্বজনীনগম্যতা সম্পর্কিত বিশেষ বিধানে পরিষ্কার উল্লেখ আছেঃ

ক) প্রতি তলায় কমপক্ষে একটি অথবা মোট টয়লেটের ৫% (যাহা অধিক) সংখ্যক টয়লেট প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রবেশগম্য করিয়া তৈরী করিতে হইবে।

খ) টয়লেটের ভিতর ন্যূনতম ১.৫ মিটার  ১.৫ মিটার বাধামুক্ত জায়গা থাকিতে হইবে এবং wc-এর একদিকে সংলগ্ন দেওয়াল হইতে ন্যূনতম ৯০০ মি.মি. জায়গা খালি থাকিতে হইবে।

গ) wc-এর আসন হইতে ৪০০ মি.মি. উচ্চতায় পেছনের দেয়াল হইতে সর্বাধিক ৩০০ মি.মি. দূরত্বে এবং সামনের দিকে ন্যূনতম ৪৫০ মি.মি. বর্ধিত করিয়া হ্যান্ডরেইল থাকিতে হইবে।

ঘ) পানির কল মেঝে হইতে ৮৫০ মি.মি. উপরে হইতে হইবে এবং বেসিনের তলা ও পাইপ এমনভাবে থাকিতে হইবে যেন হুইলচেয়ার পৌঁছাইতে পারে।

ঙ) গোসলের জায়গা ১.০ মিটার প্রস্থসহ ১.১৫ বর্গ মিঃ হইবে এবং মেঝেতে কোন প্রকার বেষ্টনী থাকিতে পারিবে না।

এছাড়াও সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার নিয়ম অনুযায়ী একটি দরজা ৮০০ মিমি. বা ৩১.৩৯ ইঞ্চি চওড়া হতে হয়।  নুন্যতম ৬ ফিট বাই ৫ ফিট হলেই একটি হুইলচেয়ার খুব সহজেই টয়লেটে প্রবেশ করে নিজেই দরজা বাঁধতে পারে। তেমন কঠিন কিছু না তবু আইন থাকার পরেও তার সঠিক বাস্তবায়ন কেন হচ্ছে না !?

খুব অবাক হই যখন দেখি, বাংলাদেশ রেলওয়ে ষ্টেশন, ইন্টারসিটি বাস ষ্টেশন, এমনকি ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য সহজে প্রবেশগম্য কোন টয়লেট নেই। একজন নিয়মিত বিমানযাত্রী হিসেবে প্রতিবার আমি যখন ম্যানচেস্টার-ঢাকা-চট্টগ্রাম আসা যাওয়া করি, পর্যাপ্ত টয়লেট সুবিধা না থাকার কারণে আমাকে সব ধরনের হিউমিলিয়েশেন বা অপমানের সম্মুখিন হতে হয়। আমার মতে, সেখানকার টয়লেটগুলো শুধুমাত্র বৈষম্যই প্রদর্শন করে না, বরং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যে কোন দুর্ঘটনা বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাতেও ফেলতে পারে।

 

আমাদের দেশের পাবলিক স্থাপনাসহ সকল ভবনে এমন একটি সহায়ক ব্যাবস্থাসম্পন্ন টয়লেট তৈরি খুব কঠিন কিছু নয়

 

প্রবেশগম্য টয়লেট এমন হওয়া উচিত যাতে করে সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন মেটাতে পারে। একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি যেন সহজে ও নিরাপদে নিজেকে হুইলচেয়ার থেকে কমোডে স্থানান্তর করতে পারে এজন্যই দুই সাইডে দুটি ড্রপ-ডাউনবার বা হ্যান্ড রেইল সাপোর্টের কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি টয়লেটে একটি করে ইমার্জেন্সি পুল কর্ড থাকা উচিৎ যেন প্রয়োজনে ঐ ব্যক্তি সাহায্যের জন্য অন্য কাউকে ডাকতে পারেন। তবে সবচেয়ে জরুরী হলো, সর্বজনীন প্রবেশগম্য টয়লেট কেমন হওয়া উচিৎ এবং এতে বেসিক কি কি থাকা প্রয়োজন এ ব্যাপারে পেশাদারী পরামর্শ নেয়ার জন্যে সংশ্লিষ্ট মহলের সাথে যোগাযোগ করা উচিৎ ভবন কর্তৃপক্ষের।

 

আমি আশা করব বি-স্ক্যান এর সকল  প্রতিবন্ধী ও অ-প্রতিবন্ধী সদস্যগণ আমার লেখার সাথে সহমত পোষণ করবেন এবং বাংলাদেশে সর্বজনীন প্রবেশগম্য টয়লেটের দূরাবস্থা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করবেন। আমরা চাই সবধরনের সরকারি-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে যেন একটি করে হলেও প্রবেশগম্য টয়লেটের ব্যবস্থা থাকে। আমি মনে করি বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের এটা একটা ন্যায্য দাবি ও বড় একটা স্বপ্ন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিবেচনা করার জন্য রিহ্যাবসহ সকল ডেভেলাপার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

তারেক কালাম,

প্রবাসী বাঙ্গালী, ম্যানচেস্টার।