বাংলা ইশারা ভাষা ইন্সটিটিউট: শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার

198

মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভাষা। ভাষাকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয় সমাজ ও সংস্কৃতি। ভাষার অধিকার ও স্বক্রিয়তা রক্ষায় জীবনদানের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাতৃভাষা বিকাশের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এর স্বীকৃতি হিসাবে ২১ ফেব্র“য়ারি উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সকল মানুষের ভাষার বিকাশ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবস সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে।

 

বাংলা ইশারা ভাষা দেশের প্রায় ৩০ লাখ শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের একমাত্র ভাষা। প্রতিবন্ধিতার কারণে এই ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় তাদের যোগাযোগের কোন সুযোগ নেই। এছাড়াও অটিস্টিক, নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে ইশারা ব্যবহারের মাধ্যমে যোগাযোগে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষদের জীবনযাপন-সংস্কৃতি এবং বাংলা ইশারা ভাষার স¤পর্ক অবিচ্ছেদ্য। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষদের জীবনযাপন-সংস্কৃতির বিকাশ মানেই বাংলা ইশারা ভাষার বিকাশ।

 

বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদ অনুসমর্থন করেছে। এই সনদ ইশারা ভাষার স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের জন্য শরিক রাষ্ট্রকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে। উন্নত দেশগুলোতে তাদের দেশের ইশারা ভাষা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত এবং বেশকিছু দেশে এই ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা প্রদান করেছে। এই দেশগুলোতে ইশারা ভাষা আইন, ইন্সটিটিউট ও দোভাষী সনদ প্রাপ্তিসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ রয়েছে। ভারত সরকার ২০১১ সালে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ভারতীয় ইশারা ভাষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনক্রমে ২৭ জানুয়ারি ২০০৯, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বাংলা ইশারা ভাষার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের পরিপত্র জারি করে। ২০০৯ সালে একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘‘বাংলা ইশারা ভাষা এদেশের অন্যতম ভাষা’’ ঘোষণা করেন। তিনি শ্রবণ প্রতিবন্ধী জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে বিটিভিসহ সকল টেলিভিশন চ্যানেলের প্রধান সংবাদে ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ইশারা ভাষা উপস্থাপনের নির্দেশ প্রদান করেন। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং দেশ টিভিতে বাংলা ইশারা ভাষায় সংবাদ উপস্থাপিত হচ্ছে। ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় নেতৃত্বে এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ০৭ ফেব্র“য়ারিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস হিসাবে নির্ধারন করা হয়। এছাড়া, ১৯৯৪ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থার যৌথ উদ্যোগে বাংলা ইশারা ভাষার অভিধান প্রকাশ করা হয়। বাংলা ইশারা ভাষার ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ের এই উদ্যোগ এবং স্বীকৃতি সমূহ মাইলফলক হয়ে থাকবে। সরকার বাংলা ইশারা ভাষা প্রসার ও বিকাশে এখন পর্যন্ত আর কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করলেও সার্বিক অবস্থার বিবেচনায় এই ভাষা বিকাশের দাবি প্রতিনিয়তই  জোরদার হয়ে উঠছে।

 

দেশে বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃত না থাকলেও ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে আদিবাসী ভাষাগুলোর ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে গত দুই দশক ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি বিকাশে সরকারি উদ্যোগে ছয় জেলায় উপজাতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি ৬ টি ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। আদিবাসী ভাষার বৈষম্য হ্রাসে সরকার আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য এই ইনস্টিটিউটগুলোর উদ্যোগে ইতিমধ্যে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করেছে। ২০১০ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। কিন্ত এই ইনস্টিটিউটেও বাংলা ইশারা ভাষা নিয়ে কোন কার্যক্রম নেই।

অন্য ভাষার মত এই ভাষারও রয়েছে ভাষাতাত্তিক বিভিন্ন উপাদান এবং বৈচিত্র। ভাষার অন্তর্গত এ ধরণের বৈচিত্রসমূহের প্রমিতমান নির্ধারণ, সুবিন্যস্তকরণের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা। অথচ ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইশারাভাষী জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সরকার এখন পর্যন্ত তাদের ভাষা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের কোন প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি। ফলে এই ভাষার ভাষাতাত্বিক গবেষণা মূখ থুবড়ে পড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে আদালতসহ বিভিন্ন মৌলিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য দোভাষীদেও দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারি সনদ প্রদান জরুরি। দেশে ইশারা দ্বিভাষিক শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য গবেষণা ও কার্যক্রম অপরিহার্য। প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। ভাষার প্রতিবন্ধকতা দূর করে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সম্ভব একীভূত সমাজ বিনির্মান। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার মর্যাদা নিশ্চিত করতে বাংলা ইশারা ভাষা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প  নাই ।