ব্লাইন্ড ক্রিকেটে বাংলাদেশ

55

ব্লাইন্ড ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয় ১৯২২ সালে অষ্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে, এর পর ধীরে ধীরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এই ব্লাইন্ড ক্রিকেট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে, এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০০০ সালে ব্লাইন্ড ক্রিকেটের আগমন ঘটে। জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রিয়া সমিতি এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম এর যৌথ উদ্যাগে এবং ওয়েষ্ট বেঙল ব্লাইন্ড ক্রিকেট এসোসিয়েশন (ইন্ডিয়া) এর সহযোগীতায় ঢাকায় ৬ই নভেম্বর ২০০০ইং তারিখে সপ্তাহ ব্যাপি ব্লাইন্ড ক্রিকেট প্রথম প্রশিক্ষন ক্যাম্প শুরু হয়। প্রশিক্ষন সমাপ্তির পর ১২ই নভেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় ষ্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল দেশের টেষ্ট ইতিহাসে প্রথম টেষ্টটি খেলে। এই স্মরণীয় দিনে মধ্যহ্ন বিরতির সময় ভারত ও বাংলাদের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ক্রিকেটাররা একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে। ঐ দিনই বাংলাদের ব্লাইন্ড ক্রিকেটের গোড়া পত্তন হয়। এরই ধারাবাহীকতায় ধীরে ধীরে বাংলাদেশে ব্লাইন্ড ক্রিকেট এগিয়ে যেতে থাকে এবং এরই এক পর্যায়ে ১৭ই মে ২০০৮ ইং সালে বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হয়। এই খেলাকে তৃণমূল পর্যায় হতে জাতীয় ও আর্ন্তজাতীক পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিবিসিসির কার্য্যক্রম শুরু হয়। এরই এক পর্যায়ে ১৪, ১৫, ১৬ নভেম্বর ২০০৮ সালে ভারতের নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সীল এর ও ব্লাইন্ড ক্রিকেট অফ এশিয়া এর বার্ষিক সাধারণ সভায় বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিল এর সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মেজর মোঃ ইয়াদ আলী ফকির (অবঃ) এবং বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিম এর ক্যাপ্টেন মোঃ হাফিজুর রহমান বুলেট অংশ গ্রহন করে। এ সভায় বাংলাদেশ এর ১০ম দেশ হিসাবে পুর্ণাঙ্গ সদস্য পদ লাভ করে।অন্য সদস্য রাষ্ট্র গুলো হচ্ছে অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ওয়েষ্ট ইন্ড্রিজ, সাউথ আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা এবং নেপাল এবং একই সাথে বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট অব এশিয়া এর সদস্য পদ লাভ করে। এর অন্যান্য রাষ্ট্র গুলো হচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং নেপাল।

২০০৮ সাল থেকে বিবিসিসি’র সহযোগিতায় তরুন উদীয়মান ক্রিকেটার তৈরি করার জন্য বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিম এর ক্যাপ্টেন হিসাবে মোঃ হাফিজুর রহমান বুলেট কোচ সানোয়ার আহমেদকে সাথে নিয়ে ক্রিকেট ট্রেনিং ক্যাম্প পরিচালনা করে আসছে। এই কাজের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে ব্লাইন্ড ক্রিকেটকে উন্নত করা এবং জনপ্রিয় করা।

উল্লেখ্য, বিবিসিসি’র সহযোগিতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৮টি ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্লাবগুলো হলো, ঢাকা ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব, এনএএসপিডি ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব, চিটাগং ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব, রাজশাহী ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব, কক্সবাজার ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব, সুনামগঞ্জ ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব, এবিসি ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব, যশোহর ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব এবং আরো কয়েকটি ব্লাইন্ড ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অপেক্ষায়। ট্রেনিং ক্যাম্পে এ যাবৎ ২৫০ জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছে এবং তারা এখন ক্রিকেট খেলতে পারে।

 

সাইটসেভার্স-এর স্ট্রেনদেনিং গভর্মেন্ট ইন্টিগ্রেটেড এডুকেশন প্রোগ্রাম (জিআইইপি) প্রকল্পের আয়োজনে সাইটসেভার্স-এর আর্থিক ও বিবিসিসি’র কারিগরি সহযোগিতায় ২০১১ সাল হতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দশ দিন ব্যাপী ট্রেনিং ক্যাম্প পরিচালিত হচ্ছে। এই ট্রেনিং ক্যাম্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে ব্লাইন্ড ক্রিকেটকে উন্নত করা এবং স্কুল ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিম প্রতিষ্ঠা করা। এভাবেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তরুণরা স্কুল ব্লাইন্ড ক্রিকেট প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে।

 

ব্লাইন্ড ক্রিকেট খেলার নিয়ম-কানুন

ব্লাইন্ড ক্রিকেটের উৎপত্তি অস্ট্রেলিয়াতে এবং বর্তমানে ডজনখানিক দেশে এই খেলা নিয়মিত চর্চা হচ্ছে।

কিছু মূল পার্থক্য ছাড়া প্রচলিত ক্রিকেটের মতোই সকল নিয়ম-কানুন। প্রথমমত দুই দলেই সমান সংখ্যক ১১ জন খেলোয়াড় থাকবে যারা সবাই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, আংশিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এবং কিছুটা দেখতে পায় যারা। যখন একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী খেলোয়াড় ব্যাট বা বল করবে অথবা বল ছুড়বে তখন তাকে সম্পূর্ণরূপে নিজেকেই করতে হবে। কিন্তু যখন সে দৌড়াবে অথবা বল খুঁজবে তখন সে সাহায্য নিতে পারবে তাদের টিমমেটদের যারা কিনা আংশিক দেখতে পায়।

 

ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিল দ্বারা অনুমোদিত বল আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে ব্যবহৃত হবে। এটা সচরাচর ক্রিকেট খেলার বলের মতো দেখতে সাদা বল কিন্তু এটি তুলনামূলক হালকা এবং এটা বাজতে থাকে। বোলার নিচ দিয়ে বল করে মাটিতে গড়িয়ে ব্যাটসম্যানের দিকে বলটি ছুড়ে দেয় যে কিনা বলটি যাওয়ার শব্দ শুনে ব্যাট দিয়ে জোরে বলটিকে আঘাত করে। তারপর বিস্ময়করভাবে খেলা দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে।

 

টিম এবং খেলোয়াড়

একটি খেলায় দুইটি দল থাকবে এবং প্রতিটি দলে ১১ জন করে খেলোয়াড় থাকবে। প্রতি টিমে যেখানে কমপক্ষে:

৪ জন সম্পূর্ণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী খেলোয়াড় থাকবে (বি-১)

৩ জন আংশিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী খেলোয়াড় থাকবে (বি-২) এবং সর্বোচ্চ

৪ জন অংশত আংশিক দৃষ্টি সম্পন্ন খেলোয়াড় থাকবে (বি-৩)

 

বিবিসিসি’র এই কার্যক্রম সম্পাদন করার জন্য সরকারসহ কর্পোরেট সেক্টরকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ক্রিকেটারদের সম্ভাবনা ও দক্ষতাকে উন্নয়ন করতে সহযোগিতা করবে।