ওয়াংপ্রুর মাচাং ঘরে এ কোন আশার আলো

50

মারাত্মক টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৬ বছর বয়সেই স্বাভাবিক চলাচলের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার পলিকা পাড়ার ওয়াংপ্রু মার্মা। এতে তার দু’টি পা-ই বাঁকা এবং বাম হাতটি দূর্বল হয়ে যায়। আর বাম হাতে শক্তি না পাওয়ার কারণে ডান হাত আর হাটুর উপর ভর দিয়েই চলাফেরা করতে হয় তাকে। এরপর মাত্র ৩০ বছর বয়সেই স্বামী হারিয়ে এখন বৃদ্ধ পিতা শৈঅং মার্মার সীমিত আয় নির্ভরতা নিয়েই কাটছে তার দিনকাল।

ওয়াংনুপ্রু মার্মার এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা ধীরে ধীরে তার জীবনকে মূলতঃ মাচাং ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলে। তবে অত্যন্ত মানসিক শক্তি আর কষ্ট সহিষ্ণু এই নারী স্বাভাবিকভাবে হাঁটা-চলা করতে না পারলেও নিজেকে গুটিয়ে রাখেন নি মোটেও । বরং অন্য আর দশজন নারীর মত রান্নাবান্নাসহ গৃহস্থালীর আর সব কাজগুলো ঠিকই সামলে নিচ্ছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ।

দূগর্ম আর বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি এলাকা বান্দরবানের এ অঞ্চলেও নিরাপদ পানি আর স্যানিটেশন ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। প্রতিদিন রান্নাবান্না আর গোসলসহ সংসারের যাবতীয় ধোঁয়া-মোছার কাজ সারতে যে পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয় তা সংগ্রহ করতে হলে অন্তত তিন হাজার ফুট দূর থেকে তা আনতে হবে। আর যেদিন কাজের জন্য বাবা দূরে যেতেন, সেদিন অসহায় হয়ে বাবার অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর কোন উপায় থাকত না।

ওয়াংনুপ্রুর পরিবারে কোন স্বাস্থসম্মত পায়খানা ছিলনা । ফলে এই শারীরিক অবস্থায় তার পক্ষে স্বাভাবিক ও মর্যাদার সাথে পায়খানা গোছলসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রয়োজনগুলো পূরণকরা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। উপরস্তু ৩০ বছর বয়সি এক নারী হয়ে এসব কাজের জন্য কারো উপর নির্ভর করা বা তার সহযোগিতা চাওয়াটাও তেমন একটা শোভন নয়। তাই যত কষ্টই হোক, হামাগুড়ি দিয়ে মাচাং বেয়ে উঠানামা করে মাচাং থেকে প্রায় ৫০ গজ দুরে একটি বড় আম গাছের টির আড়ালই ছিল ওয়াংনুপ্রুর জন্য প্রকৃতির ডাকের সাড়া দেয়ার একমাত্র নিরাপদতম স্থান।

এমন এক পরিস্থিতিতে ওয়াটারএইড এর আর্থিক ও কারিগরী সহায়তার বেসরকারি সংস্থা গ্রীণহিল ওয়াংনুপ্রুর এলাকায় Ensuring Quality Lives of the Unserved and Socially Indefeasible people Through Yielding WaSH (EQUITY) প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমেই উঠে আসে ওয়াংনুপ্রুর মত ভিন্নধারায় সক্ষম মানুষদের নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন আর দৈনন্দিন স¦াস্থ্যভ্যাসের সংকট নিয়ে নিরস্তন জীবনযুদ্ধের এক করুন কাহিনী। একজন সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী নারীকে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সেবা প্রদানের বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করা হয় । পলিকা পাড়ার বন্ধ হয়ে পড়া জিএফএসটি পুন:সংস্কার করা হলে পানির চলমান সংকট কেটে যায়। তবে ওয়াংনুপ্রুর কথাটি মাথায় রেখে ৫০ গজ দুরের ট্যাপ ষ্ট্যা›ড হতে পাইপলাইনের একটি সংযোগ দেয়া হয় ওয়াংনুপ্রুর মাচাং ঘরে। এখন ট্যাপ ছাড়লেই তিনি পেয়ে যাচ্ছেন প্রয়োজনীয় পরিমাণ নিরাপদ পানি।

এ প্রকল্পের সহায়তায় ওয়াংনুপ্রুর মাচাং ঘরেই স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে প্রতিবন্ধীব্যক্তি বান্ধব একটি স্বাস্থসম্মত পায়খানা। এর মাধ্যমে মাচাং থেকেই পাইপের সাহায্যে পায়খানার মল ও অন্যান্য বর্জ নিরাপদ স্থানে নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে। এখন তাই ওয়াংনুপ্রুকে প্রাকৃতির ডাকে সাড়া দিতে আর কষ্ট করে হামাগুড়ি দিয়ে নিচে নামার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি খোলা যায়গায় টয়লেট করার মত লজ্জাও বইতে হয় না। অপেক্ষায়ও বসে থাকতে হয়না বৃদ্ধ বাবার জন্য, কখন তিনি জুম থেকে ফিরে এসে তার জন্য পানির ব্যবস্থা করবেন! পানির অভাবে একসময় কিছুই ঠিকমত পরিষ্কার রাখা যেত না, আর এখন সবকিছুই ঠিকঠাক ধুয়ে মুছে গুছিয়ে রাখতে পারছেন। এখন নিয়মিত স্বাস্থ্যাভ্যাস চর্”া অথবা ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পানিরও কোন অভাব নেই। চোখে মুখে অকৃত্রিম তৃপ্তির হাসি নিয়ে ওয়াংনুপ্রু তাই আমাদের বুঝিয়ে দিলেন, তিনি এখন অনেক ভাল আছেন।

ওয়াংনুপ্রুকে সহায়তার পর ওয়াটারএইড রুমা উপজেলায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধায় সকল প্রতিবন্ধীব্যক্তির প্রবেশগম্যতার উপর একটি নীরিক্ষা পরিচালনা করে। এতে দেখা গেছে, এ উপজেলায় মোট ৩৮৪ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন যাদের মধ্যে মোট ৩০৪ জনের প্রবেশগম্যতা বিদ্যমান সেবার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব। বাকি ৮০ জন ব্যক্তির জন্য যে ধরনের প্রযুক্তি ও সেবা দরকার, ওয়াটারএইড আগামী তিন মাসের মধ্যেই সেগুলো বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

তথ্য সংগ্রহ: মংচিং মারমা ও কৃত রঞ্জন তালুকদার, বান্দরবান
লিখনে: মাহফুজ-উর রহমান ওয়াটারএইড