মনের স্বাস্থ্যের খোঁজ খবরে উৎস

74

মানুষের শরীরের যেমন স্বাস্থ্য আছে, তেমনি রয়েছে মনের স্বাস্থ্য। প্রথম স্বাস্থ্যটি আমাদের শারীরিকভাবে সুস্থ্য রাখে আর দ্বিতীয়টি আমাদের সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা জয় করে অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ ঘটায়। শরীরের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে আমরা যতই না ব্যস্ত ঠিক তেমনি ততটাই যেন উদাসীন মনের স্বাস্থ্যের খোঁজ খবরের ব্যাপারে !

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তিন ধরনের সমস্যা যেমন স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা, মানসিক সমস্যা ও মাদকাসক্তি একত্রে মানসিক স্বাস্থ্য হিসেবে আখ্যায়িত। জটিল মানসিক সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তিদের শারীরিক অসুস্থতা ছাড়াও তাদের সামাজিক অবস্থাও খুবই করুণ। মানসিক অসুস্থ মানেই ‘পাগল’ এবং ‘অপ্রয়োজনীয়’ এটাই যেন সমাজের নির্মোঘ ও নির্মোহ সিদ্ধান্ত। সমাজ এদের মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। এরা সমাজের লোকের নির্মমতা, কৌতুক এবং নিগ্রহের পাত্র।

প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট অনাকাঙ্খিত ঘটনার স্বীকার হয়ে কিংবা প্রিয়জনের মৃত্যুতে মানুষ শোকাবিভূত হয়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। আর্থিক ক্ষতি, নানাবিধ প্রতারণার শিকার হওয়া, পরীক্ষায় অকৃতকার্য বা আশানুরূপ ফল না হওয়া, চাকুরী অথবা কর্মস্থলে সমস্যা, বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা, দীর্ঘস্থায়ী জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি নানা ধরনের দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপের ফলশ্রুতিতে মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আমাদের মধ্যে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন-এর ঘোষণামতে ১৫ শতাংশ মানুষ কোন না কোনভাবে মানসিক সমস্যাগ্রস্থ বা মনোরোগে আক্রান্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত মানসিক স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও প্রাপ্ত তথ্য মতে, সারা বিশ্বে ৫০ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পেয়ে থাকে। সেখানে উন্নয়নশীল দেশে বসবাসকারী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তির হার যে হতাশাব্যঞ্জক হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর কারণ হিসেবে এও উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার দুর্বলতা, দক্ষ জনবলের অভাব এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকা। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়েছিল “শারীরিক স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি মানবাধিকার”। আর তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যাবশ্যক।

১৯৯৭ খৃষ্টাব্দের ১৪ মার্চ ইউনিট থিয়েটার কনসেপ্ট-এ নাট্যচর্চার উদ্দেশ্যে ইউনাইট থিয়েটার নামের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে। পরবর্তীতে ২০০১ খৃষ্টাব্দে থেকে প্রতিবন্ধিতা ইস্যুতে নাট্যপ্রদর্শনী করতে গিযে দর্শকদের কাছ থেকে আসে নানা অনুরোধ। এসব অনুরোােধর প্রেক্ষিতে ইউনাইট্ থিয়েটার থেকে ইউনাইট থিয়েটার ফর সোশাল অ্যাকশন (UTSA) নাম ধারণ করে শুরু করে নবমাত্রায় নাট্যচর্চা আরম্ভ হয় ইতোপূর্বে গঠিত নাট্য ইউনিটগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে। প্রতিবন্ধী ও তৃণমূল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় রিহিকড়ু (REHECDU, R=Rights, E=Education, H=Health, E=Entrepreneurship, C=Cultural, D=Development, U=Unit) এপ্রোচে কাজ শুরু করে।

২০০১ সালে প্রতিবন্ধী মানুষের মনোদৈহিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উৎস’র একটি ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ‘থিয়েটার থেরাপি সেন্টার অব দ্যা ডিসএ্যাবল্ড (টিটিসিডি)’ এবং ২০০৩ ‘বাংলাদেশ থেরাপিউটিক থিয়েটার ইনস্টিটিউট (বিটিটিআই)’। এই ইউনিটদ্বয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে থিয়েটার ইউনিট “টিটিসিডি” বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য থিয়েটার থেরাপি সেবা দিয়ে থাকে। এছাড়া বিটিটিআই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সিডর ও আইলা পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া মনোবৈকল্যতা, মানসিক বিপর্যস্ততা উত্তরণে উৎস আওতাভুক্ত ইউনিট “বিটিটিআই” যেমনি থিয়েটার থেরাপি কর্মসূচী পরিচালনা করেছিল। তেমনি গত বছর মানব সৃষ্ট দুর্যোগ মিরসরাই ট্রাজেডি উত্তর আবেগগত সমস্যায় পড়ে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের মধ্যে সৃষ্ট মানসিক সমস্যা দূরীকরণে মনোবিশ্লেষক নাট্যবিজ্ঞান ও নিরাময়ী নাট্য ক্রিয়ার নানান অনুষঙ্গ প্রয়োগ করে সফলভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের প্রচেষ্টা পরিচালনা করেছে। কিন্তু দুর্যোগের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের উপর যে মনোসামাজিক বিপর্যয় নেমে আসে তাকে মোকাবেলার জন্য আমাদের কোন জাতীয় নীতিমালা বা পরিকল্পনা না থাকায় দুর্যোগ প্রবন দেশ হওয়া সত্ত্বেও পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে আমরা বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছি ইস্যুটিকে বিবেচনায় নিতে।

মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত জন্ম নেওয়া হতাশা ও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে নানামূখী কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে উন্নয়ন সংগঠন ‘ইউনাইট থিয়েটার ফর সোশাল অ্যাক্শন্ (UTSA/উৎস)’। দক্ষ থিয়েটার থেরাপিষ্ট গড়ে তুলতে উৎস-এর আওতাভুক্ত থিয়েটার ইউনিট বাংলাদেশ থেরাপিউটিক থিয়েটার ইনস্টিটিউট (বিটিটিআই)-এর উদ্যোগে বিগত ২০০৩ সাল থেকে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড ও পর্তুগাল থেকে আমন্ত্রিত বিশ্বখ্যাত থিয়েটার থেরাপিষ্টদের পরিচালনায় আয়োজন করছে জাতীয় প্রতিবিধানমূলক নাট্যকর্মশালা (এনটিটিডব্লিও)।

সেই সাথে বর্তমানে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ডিয়াকোনিয়া বাংলাদেশ-এর সহযোগিতায় থিয়েটার থেরাপির বিভিন্ন অনুষঙ্গ ব্যবহার করে উৎস বাস্তবায়ন করছে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মনোসামাজিক পরিচর্যা বিষয়ক একটি প্রকল্প। প্রাত্যহিক জীবনের নানা মানসিক বিপর্যস্ততা বা মনোবৈকল্য দূরীকরণের কৌশল হিসেবে থিয়েটার থেরাপির বিভিন্ন অনুষঙ্গের যেমন, প্লেব্যাক থিয়েটার, সাইকোড্রামা, সোসিওড্রামা, সোসিওমেট্রি, আর্ট থেরাপি, স্পিচ থিরাপি, লিভিং নিউজপেপার-এর সফল ব্যবহার হচ্ছে এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে।

মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে উৎস (UTSA) আওতাভুক্ত থিয়েটার ইউনিট টিটিসিডি এবং বিটিটিআই সংক্রান্ত কর্মসূচী প্রসঙ্গে উৎস’র নির্বাহি পরিচালক চট্টগ্রামের বিশিষ্ট নাট্যজন জনাব মোস্তফা কামাল যাত্রা বলেন, “বর্তমানে অপচিকিৎসা, ঝাড়-ফুক, তাবিজ-কবজ নির্ভর চিকিৎসা সেবার মুখোমুখি হয়ে মানসিক সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তিকে ভোগ করতে হয় চরম ভোগান্তি, তথা বরণ করতে হয় স্থায়ী মনোসামাজিক প্রতিবন্ধীতা। এ সমস্যা উত্তোরণে প্রয়োজন একটি যুগউপযোগী ও অধিকারভিত্তিক জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা। যে নীতিমালায় প্রতিটি মানুষের মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। আমাদের দেশে এখনও বৃটিশ সরকার কর্তৃক ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তিত লুনাসি এ্যাক্ট এখনো আইনি ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী অনেক দেশই এই আইন বিলুপ্ত করে স্ব-ন্ব দেশের উপযোগী করে মানসিক সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তিদের উপযোগী করে আইন প্রণয়ন করেছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।”

মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে উৎস পরিচালিক কর্মসূচী সমন্বয়কারী জনাব মুহাম্মদ শাহ আলম বলেন, “একটি মানুষ তখনই কোন কাজে স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করতে পারবে যখন তিনি মানসিকভাবে সুস্থ থাকবেন। থিয়েটার থেরাপির বিভিন্ন অনুষঙ্গ যেমন সাইকোড্রামা, সোসিওড্রামা, সোসিওমেট্রি, প্লেবেক থিয়েটার, আর্ট থেরাপি, ডান্স থেরাপি, লিভিং নিউজপেপার প্রতৃতির সফল ব্যবহার বাংলাদেশে উৎস চালু করেছে। যদিও আমাদের জানা মতে ইতোমধ্যেই বিশ্বের ৫০টির অধিক দেশে অনুশীলিত হচ্ছে মনোরোগ ও মানসিক চাপমুক্ত সৃজনশীল মানস গঠনে। আমাদের প্রত্যাশা প্রতিটি মানুষ মানসিকভাবে স্বতস্ফূর্ত থেকে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবে।”

মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ঔষধী চিকিৎসার পাশাপাশি থিয়েটার-এর নান্দনিক ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাময় বা প্রতিবিধানমূলক নাট্যক্রিয়া অনুশীলনের যে ধারা উৎস (UTSA) বাংলাদেশে সূচনা করেছে; তা এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কর্মরত পেশাজীবীগণ এই নাট্য বিজ্ঞানের চর্চায় সম্পৃক্ত হলে; বাংলাদেশে থেরাপিউটিক থিয়েটার-এর প্রয়োগ প্রক্রিয়া আরো কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হবে।

এই সংক্রান্ত কর্মসূচীর বিস্তারিত তথ্যের জন্য পরিদর্শন করুন:
http://www.facebook.com/pages/Psychodrama-in-Bangladesh/160302790753569http://www.utsa.up.tohttp://www.facebook.com/#!/chittagong.karnafuli?fref=tshttp://utsabarta.yolasite.com

-আরিফুর রহমান,
উৎস; চট্টগ্রাম।
দূরভাষ: ০১৯১২৮৩৯২৪৮
পরভাষঃ arif.utsa@yahoo.com