হুইলচেয়ারে বসে মিরপুর ষ্টেডিয়ামে খেলা উপভোগ!

34

নিগার সুলতানা- ৮ই ডিসেম্বর এক নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম। স্টেডিয়ামে বসে ক্রিকেট ম্যাচ লাইভ উপভোগ করা। জীবনে প্রথমবারের মত। এই আনন্দ-আয়োজনের আয়োজক ছিলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বি-স্ক্যান। দারুন উচ্ছ্বসিত আমি। হয়তো একটু শিশুসুলভ হয়ে যাচ্ছে। তোমরা হয়ত ভাবছ এ আর এমন কী! তোমরা কতই তো এমন কর। তোমরা ভেবে থাকো এ আনন্দ আমাদের জন্য অপ্রয়োজনীয় বা অসম্ভব। কিন্তু এ অপ্রয়োজনীয় তথা অসম্ভব কাজটাই আমরা গুটিকয়েক মিলে সেরে এলাম। বিশাল এক পরিসরে এত প্রাণের স্পন্দন এই প্রথম উপভোগ করলাম আমি, আমরা। স্টেডিয়াম জুড়ে হাজারো দর্শকের উল্লাসধ্বনি যখন বাতাসের পালকিতে করে আমাদের দিকে ভেসে আসছিল, জীবনের যে একটা ছন্দ আছে, তখনই সেটা প্রথমবারের মতো যেন উপলব্ধি করতে পারলাম। বিস্মিত হচ্ছিলাম বারবার। আর বিসিবির প্রেসিডেন্ট জনাব নাজমুল হাসান যখন শত ব্যস্ততার মাঝেও আমাদেরকে উৎসাহিত করতে ছুটে এলেন, সত্যিই আমরা সম্মানিত বোধ করেছি।

এখন যে কোন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ইচ্ছে হলেই মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ষ্টেডিয়ামে বসে সরাসরি খেলা উপভোগ করতে পারবেন অন্য আর দশটা মানুষের মতো করে। সমস্ত সহায়ক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এখানে। নর্থ ক্লাব হাউজ জোনের ১ নং গেইটে টিকিট কেটে হুইলচেয়ার সম্বলিত লোগো দেখে ঢুকে গেলে সহজেই খুঁজে পাওয়া যাবে হুইলচেয়ার নিয়ে বসার নির্ধারিত স্থান। সেখানে হুইলচেয়ারবান্ধব টয়লেট সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। ধন্যবাদ বিসিবি, আমাদের সহযোগিতা করার জন্য। সৌভাগ্য আমাদের, সেদিন বাংলাদেশ অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছিল। এ যেন আমার জন্য এক দুর্লভ সুযোগ। এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ বি-স্ক্যনের প্রতি। বি-স্ক্যান কাজ করে যাচ্ছে সুগঠিত আর সুষম অধিকারের সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতার জোয়ার সৃষ্টির লক্ষ্যে। যে সমাজ হবে আমাদের, তোমাদের, সবার জন্য। যারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করেই ক্ষান্ত হতে পারত। কিন্ত তারা সমাজের ভেতর থেকে সচেতনতা জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে সংগ্রাম করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত সবার জন্য। হ্যাঁ , আমি বলবো সবার জন্য। আমিও খেলা দেখতে গিয়েছিলাম সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই। কেননা, আমিও চাই আমার মত পরিস্থিতিতে তুমি যেন কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত না হও। না, আমি কারো অমঙ্গল কামনা করছি না। কারণ আমি দেখেছি বুয়েটে পড়া ইফতেখারের ট্রেনে দু’পা হারানোর পর, তার স্বপ্নভরা চোখ ধূসর হয়ে যেতে। ক্লোজআপ ওয়ান এ ইয়েস কার্ড পাওয়া ইতির ছাদ থেকে পরে আর গানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারার চাপা কষ্ট। ৫ জনের অভিভাবক দিনমজুর রফিকের কর্মক্ষম হাত-পা’গুলো ক্রমশ নিস্তেজ হযে যায়, শুধু অসাবধানে একটি চালের বস্তা কাধের উপর পড়ার কারণে। ইতি, রফিক স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির শিকার। একটি খ্যাতনামা মোবাইল কোম্পানির এইচ আর ম্যানেজার যখন বললেন, “জানো নিগার, গাড়িতে অস্বস্তি ফিল করছিলাম, ন’তলার এপার্টমেন্টে উঠতে উঠতে লিফটেই শ্বাসরোধ হয়ে যায় আমার। ঘরের দরজার কাছেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।” কোনো এক অজানা ভাইরাস হঠাৎ তার পুরো শরীর থেকে কন্ঠনালী পর্যন্ত অবশ করে ফেলে কোনো কারণ ছাড়াই। নিজের প্রথম সন্তানের দিকে তিনি অসহায় তাকিয়ে ছিলেন। দু’হাত দিয়ে কোলে নিতে পারেন নি। তো, আমি কী করে বলি, তোমাদের জীবন শতভাগ নিশ্চয়তায় মোড়া? আর আমি তো আলাদা কেউ না, তোমাদের মাঝেরই একজন।

প্রতিবছর নানা ঘাত-অপঘাত, দুর্ঘটনায় বহুলোক শারীরিক-মানসিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হচ্ছে। আমি চাই না একটি সাদা ছড়ি বা একটি হুইলচেয়ার কারো জীবন যাপন স্তব্দ করে দিক। আজ আমরা প্রতিবন্ধকতার আগাছা কেটে কেটে মসৃণ পথ তৈরী করতে চাই। যদি কারো জীবনে প্রতিবন্ধিতা এসেই যায়, তাহলে যেন তার পৃথিবী থমকে না যায়। আমরা চাই স্কুল-কলেজ, বাস, শপিংমল, পার্ক, রেস্টুরেন্ট হুইলচেয়ারবান্ধব করা হবে সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণে। তাই বি-স্ক্যানের আহবানে জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ সাড়া দিয়েছে। আশা করি সাড়াদানকারীদের মিছিল ধীরে ধীরে আরো বড় হবে। কেন না, হুইলচেয়ার কোনো প্রতিবন্ধকতার প্রতীক নয়। আমি বলব যে এটা আমার জীবনে দু’টো পাখা যুক্ত করেছে। প্রতিবন্ধকতা যদি থেকেই থাকে সেটি আমাদের অবকাঠামো গত সিস্টেমের, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। আর এটি অতিক্রম করতে প্রয়োজন সকলের সচেতনতা ও স্বতঃস্ফুর্ত সহযোগিতা। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে সকলেরই প্রয়োজনে।
হুইলচেয়ারে বসে মিরপুর ষ্টেডিয়ামে খেলা উপভোগ!
নিগার সুলতানা

৮ই ডিসেম্বর এক নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম। স্টেডিয়ামে বসে ক্রিকেট ম্যাচ লাইভ উপভোগ করা। জীবনে প্রথমবারের মত। এই আনন্দ-আয়োজনের আয়োজক ছিলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বি-স্ক্যান। দারুন উচ্ছ্বসিত আমি। হয়তো একটু শিশুসুলভ হয়ে যাচ্ছে। তোমরা হয়ত ভাবছ এ আর এমন কী! তোমরা কতই তো এমন কর। তোমরা ভেবে থাকো এ আনন্দ আমাদের জন্য অপ্রয়োজনীয় বা অসম্ভব। কিন্তু এ অপ্রয়োজনীয় তথা অসম্ভব কাজটাই আমরা গুটিকয়েক মিলে সেরে এলাম। বিশাল এক পরিসরে এত প্রাণের স্পন্দন এই প্রথম উপভোগ করলাম আমি, আমরা। স্টেডিয়াম জুড়ে হাজারো দর্শকের উল্লাসধ্বনি যখন বাতাসের পালকিতে করে আমাদের দিকে ভেসে আসছিল, জীবনের যে একটা ছন্দ আছে, তখনই সেটা প্রথমবারের মতো যেন উপলব্ধি করতে পারলাম। বিস্মিত হচ্ছিলাম বারবার। আর বিসিবির প্রেসিডেন্ট জনাব নাজমুল হাসান যখন শত ব্যস্ততার মাঝেও আমাদেরকে উৎসাহিত করতে ছুটে এলেন, সত্যিই আমরা সম্মানিত বোধ করেছি।

এখন যে কোন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ইচ্ছে হলেই মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ষ্টেডিয়ামে বসে সরাসরি খেলা উপভোগ করতে পারবেন অন্য আর দশটা মানুষের মতো করে। সমস্ত সহায়ক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এখানে। নর্থ ক্লাব হাউজ জোনের ১ নং গেইটে টিকিট কেটে হুইলচেয়ার সম্বলিত লোগো দেখে ঢুকে গেলে সহজেই খুঁজে পাওয়া যাবে হুইলচেয়ার নিয়ে বসার নির্ধারিত স্থান। সেখানে হুইলচেয়ারবান্ধব টয়লেট সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। ধন্যবাদ বিসিবি, আমাদের সহযোগিতা করার জন্য। সৌভাগ্য আমাদের, সেদিন বাংলাদেশ অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছিল। এ যেন আমার জন্য এক দুর্লভ সুযোগ। এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ বি-স্ক্যনের প্রতি। বি-স্ক্যান কাজ করে যাচ্ছে সুগঠিত আর সুষম অধিকারের সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতার জোয়ার সৃষ্টির লক্ষ্যে। যে সমাজ হবে আমাদের, তোমাদের, সবার জন্য। যারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করেই ক্ষান্ত হতে পারত। কিন্ত তারা সমাজের ভেতর থেকে সচেতনতা জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে সংগ্রাম করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত সবার জন্য। হ্যাঁ , আমি বলবো সবার জন্য। আমিও খেলা দেখতে গিয়েছিলাম সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই। কেননা, আমিও চাই আমার মত পরিস্থিতিতে তুমি যেন কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত না হও। না, আমি কারো অমঙ্গল কামনা করছি না। কারণ আমি দেখেছি বুয়েটে পড়া ইফতেখারের ট্রেনে দু’পা হারানোর পর, তার স্বপ্নভরা চোখ ধূসর হয়ে যেতে। ক্লোজআপ ওয়ান এ ইয়েস কার্ড পাওয়া ইতির ছাদ থেকে পরে আর গানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারার চাপা কষ্ট। ৫ জনের অভিভাবক দিনমজুর রফিকের কর্মক্ষম হাত-পা’গুলো ক্রমশ নিস্তেজ হযে যায়, শুধু অসাবধানে একটি চালের বস্তা কাধের উপর পড়ার কারণে। ইতি, রফিক স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির শিকার। একটি খ্যাতনামা মোবাইল কোম্পানির এইচ আর ম্যানেজার যখন বললেন, “জানো নিগার, গাড়িতে অস্বস্তি ফিল করছিলাম, ন’তলার এপার্টমেন্টে উঠতে উঠতে লিফটেই শ্বাসরোধ হয়ে যায় আমার। ঘরের দরজার কাছেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।” কোনো এক অজানা ভাইরাস হঠাৎ তার পুরো শরীর থেকে কন্ঠনালী পর্যন্ত অবশ করে ফেলে কোনো কারণ ছাড়াই। নিজের প্রথম সন্তানের দিকে তিনি অসহায় তাকিয়ে ছিলেন। দু’হাত দিয়ে কোলে নিতে পারেন নি। তো, আমি কী করে বলি, তোমাদের জীবন শতভাগ নিশ্চয়তায় মোড়া? আর আমি তো আলাদা কেউ না, তোমাদের মাঝেরই একজন।

প্রতিবছর নানা ঘাত-অপঘাত, দুর্ঘটনায় বহুলোক শারীরিক-মানসিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হচ্ছে। আমি চাই না একটি সাদা ছড়ি বা একটি হুইলচেয়ার কারো জীবন যাপন স্তব্দ করে দিক। আজ আমরা প্রতিবন্ধকতার আগাছা কেটে কেটে মসৃণ পথ তৈরী করতে চাই। যদি কারো জীবনে প্রতিবন্ধিতা এসেই যায়, তাহলে যেন তার পৃথিবী থমকে না যায়। আমরা চাই স্কুল-কলেজ, বাস, শপিংমল, পার্ক, রেস্টুরেন্ট হুইলচেয়ারবান্ধব করা হবে সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণে। তাই বি-স্ক্যানের আহবানে জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ সাড়া দিয়েছে। আশা করি সাড়াদানকারীদের মিছিল ধীরে ধীরে আরো বড় হবে। কেন না, হুইলচেয়ার কোনো প্রতিবন্ধকতার প্রতীক নয়। আমি বলব যে এটা আমার জীবনে দু’টো পাখা যুক্ত করেছে। প্রতিবন্ধকতা যদি থেকেই থাকে সেটি আমাদের অবকাঠামো গত সিস্টেমের, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির। আর এটি অতিক্রম করতে প্রয়োজন সকলের সচেতনতা ও স্বতঃস্ফুর্ত সহযোগিতা। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে সকলেরই প্রয়োজনে।