প্রতিবন্ধী সহায়ক যানবাহন ব্যবস্থা নিয়ে, একান্ত সাক্ষাৎকার:বিআরটিসির চেয়ারম্যান

51

স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও এখনো বাংলাদেশে তৈরি হয়নি “প্রতিবন্ধী সহায়ক যানবাহন” ব্যবস্থা। বিশেষ করে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য নেই “র‌্যাম্পযুক্ত বাস”। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেও ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থা চালু হওয়া শুরু হয়েছে। আমাদের দেশে কবে শুরু হবে! এইসব বিভিন্ন সমস্যা এবং তা কিভাবে দূর করা যায় তা জানতে আমরা মুখোমুখী হয়েছিলাম বিআরটিসি’র চেয়ারম্যানের। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অপরাজেয় – এর সম্পাদক

 

হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের কথা মাথায় রেখে বাসগুলোতে যেন হুইলচেয়ার প্রবেশগম্য করা যায় সে ব্যাপারে আমরা দৃষ্টি আলোকপাত করবো। আশা করি, র‌্যাম্পযুক্ত বাস পরিবহন সেক্টরে একটা নতুনমাত্রা যোগ করবে।

 

জসিম উদ্দিন আহমেদ

চেয়ারম্যান, বিআরটিসি

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতায়াত ব্যবস্থায় বিশেষ করে যানবাহনে যে সমস্যাগুলোর সম্মুক্ষিন হয়, তা নিবারনে আপনাদের পরিকল্পনা কি?

–  প্রথমত আমি বলবো, বিআরটিসি একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। যাত্রী সাধারণের সর্বোচ্চ সেবা প্রদান এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আমাদের সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মধ্যে  প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অন্যতম। তাদের জন্যে আমাদের সকলেরই কিছু না কিছু করনীয় আছে। আমি মনে করি যে, বিআরটিসির যে সব বাসগুলো আছে সেগুলো বিশেষভাবে ডিজাইন করা থাকতো তাহলে সবচেয়ে ভালো হতো। বিআরটিসি যখন বাস ক্রয় করে বা ক্রয় করে এসেছে সেসব  বাসগুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়নি। কিন্তু এখন আমরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছি।

 

হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা অনেক দিন ধরে র‌্যাম্প যুক্ত বাসের কথা বলে আসছে এই ব্যাপারে আপনাদের কী কোন পরিকল্পনা আছে?

–  কিছু দিন আগে বি-স্ক্যান আয়োজিত ডিজাইন প্রতিযোগিতায় আমি উপস্থিত  ছিলাম। প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের ডিজাইনগুলো আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এবং ডিজাইন গুলো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। কারণ তারা তাদের ডিজাইনগুলোতে দেখিয়েছে কিভাবে বর্তমান বাসগুলোকে কিছুটা পরিবর্তন এনে খুব সহজে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহযোগি করা যায়। প্রতিযোগিরা তাদের ডিজাইনে বিভিন্ন পদ্ধতি, যেমন- ডিজিটাল, হাইড্রোলিক  এবং ম্যানুয়াল ডিজাইন উল্লেখ করেছেন। এইসব ডিজাইনের সবচেয়ে ভাল দিক হল এগুলো খুবই স্বল্প ব্যয়ী। বি-স্ক্যান আমাদেরকে এইসব ডিজাইন হস্তান্তর করেছে। আশা করি, আমাদের কারিগরি টিম বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে এইসব ডিজাইনগুলো প্রয়োগ বা সংযোজন করবে।

 

বর্তমানে ঢাকা শহরে ১৯৪টি রোডে প্রায় ৮০০ বাস চলাচল করে। তার মধ্য থেকে আমরা সিঙ্গেল ডেকারগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোকে কতটুকু পরিবর্তন করলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিশেষ করে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা প্রবেশ ও চলাচল করতে পারবে তার চেষ্টা করব।

আপনার মতে র‌্যাম্পযুক্ত বাস চলার জন্য কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে? এইসব প্রতিবন্ধকতা কিভাবে দূর করা যায়?

–  সমস্যা তো অনেক। র‌্যাম্পযুক্ত বাসের জন্য সহায়ক কিছু ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেমন- বাসস্টপ, ফুটপাত। এইগুলোর পরিবর্তন করতে হলে সিটি কর্পোরেশন, সড়ক ও জনপদ বিভাগের সাহায্য ও সহযোগিতা লাগবে। সিঙ্গেল ডেকার বাসের সাথে ফুটপাতের যে দূরত্ব বা উঁচুনিচু  তা নিরসনের জন্য আমাদের একটা অবকাঠামো তেরী করতে হবে, যা একটু সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। সব চেয়ে বড় বিষয় হলো, র‌্যাম্পযুক্ত বাস চলাচলের ক্ষেত্রে যে সব সুবিধাগুলো থাকার কথা তা আমাদের দেশে নেই।

আমরা শুধু ঢাকা শহর নিয়ে চিন্তা করছিনা। ঢাকা শহরে আশেপাশে যে সব শহরগুলো আছে বিশেষ করে- গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ , মানিকগঞ্জ নিয়ে আমাদের একটা “স্ট্র্যাটেজি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান” আছে, যা সরকার ইতিমধ্যে অনুমোদন করেছেন।  আর এটা কো-অরডিনেট করছে সড়ক বিভাগের অধীনে বিআরটিএ।

 

সব বাসে না হলেও অন্তত প্রত্যেক রোডে একটি র‌্যাম্পযুক্ত বাস কী নামানো যায় না? সেই সাথে লোকালের পাশাপাশি দূরপাল্লার অন্তত রুট প্রতি একটি বাসে কি র‌্যাম্প বসানো কোন পরিকল্পনা নেবার কথা ভাবছেন?

– মোটর যান আইনকে আরো পরিবর্তন করে গ্রহনযোগ্য করে তোলা হচ্ছে এবং হালনাগাদ করার জন্য মন্ত্রী পর্যায়ে কাজ করা হচ্ছে। এর জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে বিভিন্ন সুপারিশ ও পরামর্শ দিতে এগিয়ে আসতে হবে।

সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী, ১৮,৫০০০০ যানবাহনের মধ্যে বিআরটিসি দ্বারা মাত্র ১২০০ গাড়ী পরিচালিত। যেহেতু এটি একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান, তাই আমরা চেষ্টা করি এর সুবিধা যেন বেশি সংখ্যক লোক গ্রহণ করতে পারে।

আমরা যেহেতু সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে সড়ক ও পরিবহনের ক্ষেত্রে পাবলিক সেক্টরকে আমরাই প্রতিনিধিত্ব করি, তাই আমরা মনে করি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা মাথায় রেখে আগামী অর্থ বছরে কিছু বাস কেনা হবে যেখানে আমরা বিশেষ কিছু পরিবর্তন করে প্রতিবন্ধীবান্ধব করবো। হয়তো সব বাসে করা সম্ভব হবে না। এইছাড়া দূর পাল্লার বাসেও পরীক্ষামূলক ভাবে করার পরিকল্পনা আছে।

বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল। আশা করি, র‌্যাম্পযুক্ত বাস পরিবহন সেক্টরে একটা নতুনমাত্রা যোগ করবে।

বিশেষ করে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের কথা মাথায় রেখে বাসগুলোতে যেন হুইলচেয়ার প্রবেশগম্য করা যায় সে ব্যাপারে আমরা দৃষ্টি আলোকপাত করবো।

 

বিআরটিসি’র পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন বাসগুলোতেও র‌্যাম্পযুক্ত করার জন্য আপনারা কী কোন পদক্ষেপ নিবেন?

এটা আসলে বিআরটিসির “রুলস অব বিজনেস”-এ পড়ে না। এটা বিআরটিএ দ্বারা পরিচালিত। বিআরটিএ চাইলে কিছু শর্ত আরোপ করতে পারে।

 

“প্রতিবন্ধী সহায়ক যানবাহন” এই ব্যাপারে আপনাদের কী কোন প্রচার- প্রচারণার পরিকল্পনা আছে?

– এটি একটি ভাল প্রস্তাব। তবে আমরা মূলত নিরাপদ সড়ক, শিশু,বৃদ্ধ্‌,নারী-পুরুষরা যাতে নিরাপদে ভ্রমন করতে পারে তার জন্য প্রচারণা করে থাকি। তবে ভবিষ্যতে কোন প্রচার-প্রচারণা করা হলে, তাতে অবশ্যই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা অন্তর্ভূক্ত করা হবে।

আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আপনাকেও ধন্যবাদ।