প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরীপঃ প্রচারণার অভাব, সমন্বয়হীনতার অভিযোগ

48

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সমাজ সেবা অধিদপ্তরের আওতায় দেশব্যাপি পরিচালিত প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরীপের সফলতা এবং লক্ষ্য পূরণ দুর্বল প্রচারনা এবং সমন্বয়ের অভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি মাঠ কর্মীদের দুর্ব্যবহার এবং জরীপ সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারনা জরীপের মূল উদ্দেশ্যটি ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।

জানা যায়, ২০১১-১২ অর্থ বছরে দেশের ৮টি উপজেলাতে পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করা হয় জরীপ কার্যক্রমটি এবং পরবর্তীতে ১২টি উপজেলার ১৫৯ টি ইউনিয়নে এটি বিস্তৃত করা হয়। ২০১৩ সালের ১ জুন থেকে সারা দেশের সবকটি গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এই তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ হবার কথা ছিলো ৩১শে আগস্টের মধ্যে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত জরীপকারী মাঠ কর্মীদের পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ না হওয়াতে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এই সময়সীমা। সরকার কর্তৃক দুই মেয়াদে বরাদ্দকৃত মোট ৩২ কোটি টাকার মধ্যে গত অর্থবছরে দেওয়া হয়েছিলো ১৪ কোটি টাকা। জানা গেছে বাকি টাকা চলতি অর্থবছরে দেয়া হবে। কিন্তু প্রচার প্রচারণার ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াকে সেভাবে ব্যবহার না করায় দেশের বিভিন্ন স্থানের অধিকাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিই এই জরীপ সম্পর্কে অবগত নন-এমন মতামতই উঠে এসেছে দেশ ব্যাপী বিভিন্ন মাঠ কর্মী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সংগঠনের কাছ থেকে।

দেশের বিভিন্ন স্থানের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই মাঠ কর্মীরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তথ্য সমূহ যথাযথ ভাবে গ্রহন করছেন না এবং জরীপ কাজটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সঠিক ধারনা দিতে পারছেন না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্কুল শিক্ষক এবং উন্নয়ন কর্মী ক্ষীণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আজমল হোসেন (মামুন) এর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরীপকারী মাঠ কর্মীদের অভদ্রোজনিত ব্যবহারের চিত্র। মামুন অভিযোগ করেন, মাঠ কর্মীদের অভদ্রোচিত ব্যবহারের কারণে অনেকেই এই জরীপে নিবন্ধন সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তিনি আরো অভিযোগ করেন, বিদ্যালয় চলাকালিন সময়ে মাঠ কর্মীরা তার বাসায় এসে তাঁকে না পেয়ে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি বাড়ি থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে উক্ত মাঠ কর্মীর নির্ধারিত স্থানে গিয়ে জরীপ এ তালিকাভূক্ত হোন।

আরো জানা যায়, উক্ত এলাকাতে অনেক ক্ষেত্রেই মাঠ কর্মীরা গ্রাম পুলিশের সহায়তায় জরীপের কাজ শেষ করছেন অনেকটা দায় সারা ভাবে। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন সমূহকে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার ছিল বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

ঢাকায় কর্মজীবি শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী নিগার সুলতানা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পরিচালিত জরীপ কর্মে সংশ্লিষ্ট  কর্তৃপক্ষের আরও সহনশীল এবং সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণেরও অভাব রয়েছে। তাঁর বাসায় তথ্য গ্রহণে আসা মাঠ কর্মী কিভাবে ফর্ম পূরণ করবে সেটিও আমাকে দেখিয়ে দিতে হয়েছে যা অত্যন্ত দুঃখ এবং লজ্জাজনক!”

তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রেই মাঠ পর্যায়ের জরীপকারীরা এলাকাতে এসে আপত্তিজনক ভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খোঁজ করেন, যা জরীপ কর্মটির উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করবে। যেমনঃ কোন এলাকাতে এসে কানা, খোঁড়া, অন্ধ ইত্যাদি শব্দ গুচ্ছ ব্যবহার করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খোঁজা অত্যন্ত আপত্তিকর। এতে করে জরীপকারি এবং জরীপ কর্মটির প্রতি অশ্রদ্ধাজনক মনোভাব তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই জরীপে অংশগ্রহণের ইচ্ছাতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।”

অপর শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মেজর জহিরুল ইসলাম বলেন, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাহায্য করবার ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল তাদের শারীরিক প্রতিবন্ধিতা নির্ণয় করা, বর্তমান জরীপের অনেক ক্ষেত্রেই যা সম্ভব নয়। এছাড়া জরীপ ফর্মের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় আবাসস্থলের সাথে তাদের ভবনে বাইরে এবং ভেতরের প্রবেশগম্যতা কতটুকু এবং এলাকার অন্যান্য বিনোদন, বিপনন বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের প্রবেশগম্যতার বিষয়টি সঠিকভাবে নিরূপনের প্রশ্ন যোগ করা যেতে পারতো। পাশাপাশি শিক্ষা বা পেশাগত যোগ্যতার সাথে তারা কি কি ধরণের ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সেটিও যুক্ত করা যেতো।”

চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট এলাকার আরবান কমিউনিটি প্রোগ্রাম অফিসার কে দুইবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও তার পরিচিত বিভিন্ন এলাকার আরো কয়েকজন প্রতিবন্ধী মানুষসহ তিনি নিজেও এখনো জরীপের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন নি। তিনি প্রশ্ন রাখেন, “যেহেতু বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে আমাদের অনেকেই ঘর থেকে বেরুবার সুযোগ পান না সুতরাং এটি নিশ্চয় আমাদের দায়িত্ব নয় বারেবারে জরীপকারীকে ফোন করে তাগাদা দেয়া। দুঃখ লাগে তাগাদা দেয়ার পরেও এসব অব্যবস্থাপনা বা গাফেলতিগুলো দেখে।”

এ ব্যপারে জানতে চাইলে জরীপের দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম বিভাগের সমাজ সেবা অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক বলেন, “সম্পূর্ণ জরীপ কাজটি শেষ হওয়ার পরে ‘বাদ পড়বার’ অভিযোগ করা যাবে। অনেক এলাকাই এখনো জরীপের আওতায় আসেনি। তাই সে সমস্ত এলাকাতে  অবস্থানরত ব্যক্তিবর্গ জরীপের অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারেন” বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে জরীপ শেষ হওয়ার পূর্বে সমস্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জরীপের অন্তর্ভুক্ত করবার ব্যপারে নিশ্চয়তা দেন তিনি।

দেশে দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান প্রতিবন্ধিতা সনাক্ত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দান, সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিবার ও তাদের সংখ্যা নির্ধারণ করে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণের লক্ষ্যে সরকার এ জরিপ করছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে সারা দেশে আট লাখ ৫৯ হাজার ৭৬৪ জনকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সম্পপূর্ণরূপে জরীপের তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ হওয়ার পর জরীপকৃত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিকটস্থ মেডিক্যাল ক্যাম্পে এনে অভিজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাদের প্রতিবন্ধিতার ধরণ এবং মাত্রা শনাক্তকরণ চূড়ান্ত করা হবে। এই উপলক্ষ্যে ৫০০ জনের উপরে ডাক্তারকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। গ্রাম অঞ্চলে একটি ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত কার্য এলাকা নির্ধারণ করে এই মেডিক্যাল ক্যাম্প গঠন করা হবে এবং একিভাবে শহরেও কয়েকটি এলাকা নিয়ে একটি ক্যাম্প গঠিত হবে যেখানে প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ কাজ চলবে। জানা গেছে এই কাজে সহায়তা প্রদানের জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত সংগঠন গুলোকেও সম্পৃক্ত করা হবে। নির্বাচিতরা আইডি কার্ডসহ সরকার প্রদত্ত সব সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হবে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে সরকার বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে পদক্ষেপ নিলেও দেশে প্রকৃত প্রতিবন্ধীর সংখ্যা কত তার কোন পরিসংখ্যান সরকারের কাছে ছিল না। ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়াও সম্ভব হচ্ছিল না।