বাড়ি5th Issue, December 2013অটিজম; কী এবং করণীয়

অটিজম; কী এবং করণীয়

কোনো এক ছুটির দিনের অলস দুপুরে বাবা তার ঘরে খবরের কাগজ পড়ে সময় কাটাচ্ছিলেন। যমজ দুবোন রোদেলা ও মিথিলা খেলায় ব্যস্ত। মা কেনাকাটার উদ্দেশ্যে বাইরে যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছেন, এমন সময় রোদেলার আবদার সে-ও যাবে। মা তাকে সঙ্গে নেবেন না বলে একাই চুপি চুপি বেরিয়ে পড়লেন। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে, একটু পরেই তার জীবনে অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।

 

মা বাড়ির বাইরে, বাবা নিজের ঘরে, বোন নিজের কাজে ব্যস্ত। এই সুযোগে রোদেলা বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়লো। বেশ অনেকক্ষণ পরে বাবা আবিষ্কার করলেন, অটিজমে আক্রান্ত তার আদরের কিশোরী মেয়ে রোদেলা বাড়িতে নেই। আতংকিত হয়ে তিনি মেয়েকে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন, চারিদিকে লোক পাঠালেন। বহুক্ষণ পরে রোদেলাদের পরিচিত একজন মহিলা তাকে খুঁজে পেলেন বড় রাস্তায় দৌড়ানো অবস্থায়। আশেপাশের লোকজনের সহযোগিতায় তাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন তিনি। মা বাড়িতে ফিরে জানতে পেলেন, তাদের ছোট্ট একটি ভুল বা অসাবধানতার কারণে পরিবারের চোখের মনি মেয়েটি এই ভিড়ের জগতে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিলো।

 

আবার নাঈমকে দেখলে এখন আর বোঝা-ই যায়না যে, ছোটবেলায় সে কতটা অস্থিরমতি ও আচরণগত সমস্যাক্রান্ত ছিলো। বর্তমানে সে একটি বিশেষ বিদ্যালয়ে (স্কুল ফর গিফটেড চিল্ড্রেন) জাতীয় পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে। অটিজমে আক্রান্ত বলে অবশ্য তার পাঠ্যক্রম কিছুটা নমনীয়, শিক্ষকগণও তাকে সহায়তা করেন। তবে, তার আঁকা ছবি দেখলে বা তার গান শুনলে বোঝার কোনো উপায় নেই যে, সে তার বয়সী অন্য কোনো শিশুর চেয়ে পিছিয়ে আছে।

তার অবস্থা এখন অনেকটা ভালো বলে মা বাবা তাকে গাড়িচালকের সাথেই স্কুলে পাঠান। একদিন সিগন্যালে গাড়ি একটু থামতেই নাঈম হঠাৎ গাড়ি থেকে বের হয়ে দৌড় দিল। হতচকিত গাড়িচালক মুহুর্তের মধ্যে গাড়ি রেখে তার পেছনে দৌড় দিল। এক জায়গায় পৌছে দেখা গেল, সে একটি বিজ্ঞাপনের পোস্টার দেয়াল থেকে ছিড়ে নিচ্ছে। বোঝা গেল, পোস্টারটি পাওয়ার জন্যেই সে দৌড় দিয়েছিল। সেদিন নাঈম অক্ষত অবস্থায় বাসায় ফিরে এলেও বাবা মার মনে ভীতি ঢুকে যায়। কখন কী হয় সে চিন্তা তাদের আচ্ছন্ন করে রাখে।

 

রয়েছে এমনি আরেকজন, জয়। বয়স ছয়। গান গায়, ছবি আঁকে, কবিতা আবৃত্তি করে। স্পষ্ট উচ্চারণে বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলে। অথচ, সে-ই কিনা দুবার বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিল তার কাঙ্খিত জিনিসটি পাওয়ার জন্যে। সে বোঝেনা তার বিপদ কোথায়, জানেনা কাজ শেষ করে সে কীভাবে আবার বাড়ি ফিরবে, সে বুঝতেই পারেনা যে কাউকে না বলে বাড়ির বাইরে গেলে তারা দুশ্চিন্তা করে।

 

এমন ঘটনা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিবারগুলোতে অহরহ ঘটে চলেছে। আমরা চিন্তিত, হতাশ, বিষন্ন। ভবিষ্যতের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন। শিশুদের এসব সমস্যা আমাদেরকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। যদিও এসব শিশুদের আমরা রাতারাতি বদলে ফেলতে পারবনা, একথা যেমন সত্য-তেমনি সত্য হচ্ছে তাদেরকে বুঝতে চেষ্টা করলে আমরা অনেক দুর্ঘটনা বা বিপদ থেকে রক্ষা পাবো। আমরা জানি, অটিজম হচ্ছে মানবমস্তিষ্কের বিন্যাসগত বা বিকাশগত সমস্যা, যার লক্ষণ শিশুর জন্মের তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়। অটিজমে আক্রান্ত প্রায় সকল শিশুদের ৩টি সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে।

১.   মৌখিক ও অমৌখিক যোগাযোগে সমস্যা

২.   বয়স অনুযায়ী সামাজিক আচরণে সমস্যা

৩.   খেলাধুলায় বিশেষ করে কল্পনানির্ভর খেলাধুলায় সমস্যা

 

চিকিৎসকদের মতে, শিশুর মধ্যে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দিলে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবেঃ

১.   শিশু যদি এক বছরের মধ্যে মুখে অনেক আওয়াজ না করে অথবা আঙ্গুল বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে কোনোদিকে নির্দেশ না করে,

২.   ১৬ মাসের মধ্যে যদি অন্তত ১ শব্দের বাক্য না বলে বা দু’বছরের মধ্যে যদি দুই শব্দের সংমিশ্রণে বাক্য না বলে,

৩.   শিশুর কথা ও সামাজিক আচরণ যদি হঠাৎ হারিয়ে যায়।

 

এতক্ষণ অটিজমে আক্রান্ত যেসব শিশুদের বর্ননা দেয়া হলো তাদের প্রত্যেকের কিছু ব্যক্তিগত দক্ষতা থাকা স্বত্ত্বেও রয়েছে কিছু সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা। তাই পরিবারের সকলকে লক্ষ্য রাখতে হবে এই বিশেষ শিশুটির দিকে। দেখতে হবে যে, শিশুটির বাড়ির পরিবেশ কতটা অটিজম বান্ধব। আর এ প্রসঙ্গেই চলে আসে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতার বিষয়টি।

 

সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের সর্বপ্রথমে বুঝে নিতে হবে আমি নিজে বা আমার পরিবার কতটা সচেতন, বাবা মা এবং অভিভাবকদের কর্তব্য-ই বা কী। যে পরিবারের শিশুটি কিছু না বুঝে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়, সেখানে বাড়ির বাকি বাসিন্দাদের আরো অনেক বেশি সজাগ থাকতে হবে। আমরা যদি ধরে নেই যে তাকে ‘‘বাড়ির বাইরে যাবে না” বললেই সে বুঝে ফেলবে-তাহলে আমরা ভুল করব। সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হয়ে থাকা আমাদের উচিত হবে না।

 

সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, শিশুদের পরিবর্তনের জন্য আমাদের নিজেদেরকেও পরিবর্তিত হতে হবে। তাদের সহজভাবে জীবনযাপনের ব্যবস্থা আমাদের-ই করতে হবে। তাদের জন্য অটিজম বান্ধব বাড়ি, পরিবেশ ও সমাজ আমাদেরকেই গড়ে তুলতে হবে।

 

 

লেখক- মারুফা হোসেন, পরিচালক, স্কুল ফর গিফটেড চিল্ড্রেন (অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের একটি বিদ্যালয়), তরী ফাউন্ডেশনের একটি শাখা প্রতিষ্ঠান।

সর্বশেষ

বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে শিক্ষা উপকরণ সংকট; নানামুখী সমস্যায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা

অপরাজেয় প্রতিবেদক পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সঠিক রঙের ব্যবহার, সহায়ক উপকরণ, ইন্ডিকেটর বা সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণে সহায়ক সফটওয়্যার ও অডিও বইয়ের অভাবসহ নানামুখী সমস্যার কারণে সাধারণ...

মাসিক আর্কাইভ

Translate | অনুবাদ