অগোছালো ভাবে শেষ হলো প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপঃ মেডিকেল ক্যাম্প শুরু

50

রায়হান নওশাতঃ গত ৩১ ডিসেম্বর’১৩, অনেকটা অগোছালোভাবেই শেষ হল সমাজসেবা অধিদফতরের আওতায় দেশব্যাপী প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ তালিকার কাজ। তবে এতে করে জরিপের মূল উদ্দেশ্যটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত সংগঠনগুলোর অভিযোগ, দেশের অনেক জেলার সব প্রতিবন্ধী মানুষেরা জরিপের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন নি। মৃদু ও মাঝারি মাত্রার প্রতিবন্ধী মানুষ নিজে গিয়ে তালিকাভুক্ত হবার চেষ্টা করলেও গুরুতর মাত্রার প্রতিবন্ধী মানুষ জরিপ থেকে বাদ পড়ছেন ঘর থেকে বের হতে না পারার কারণে। বিশেষ করে চরাঞ্চলে জরিপের অবস্থা আরও করুণ। এ জরিপ সম্পর্কে ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় আশানুরূপ প্রচারণা না হওয়াতেও অনেকে জরিপ সম্পর্কে অবগত নন বলে অভিযোগ উঠেছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধী মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, অনেক এলাকায় জরিপের মাঠ কর্মীরা উপস্থিত হন নি। সচেতন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ শনাক্তকরণ জরিপের কথা জেনে নিজ উদ্যোগে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে ছুটোছুটি করেছেন এখান থেকে সেখানে। এতে করে অসচেতন অসংখ্য প্রতিবন্ধী মানুষ জরিপের আওতায় আসেন নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন জেলার সমাজসেবা অধিদফতরের সূত্রমতে, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছেন মোট ৩৬,৩৬২ জন প্রতিবন্ধী মানুষ যার ২৩,৭৫২ জন মহিলা। এছাড়া বগুড়া পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ডে ২৭৯১ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন এবং হবিগঞ্জ শহরে ৫শ’ প্রতিবন্ধী শনাক্ত করা হয়েছে। অন্যান্য বেশিরভাগ এলাকার জরিপ তালিকা সকল কাজ স¤পন্ন হওয়ার আগে প্রকাশ করতে অপারগতা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

কিশোরগঞ্জ ডিজেবল্ড রাইটস অরগানাইজেশন এর সাধারণ সম্পাদক এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মোঃ খোরশেদ আলম বলেন, কিশোরগঞ্জে জরিপের তালিকা হলেও এখনও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ছবি তোলা হয় নি।

এ দিকে মাঠ কর্মীদের জরিপের পর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মেডিকেল ক্যাম্পে এনে অভিজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবন্ধিতার ধরণ শনাক্ত করার কথা থাকলেও, বেশ কিছু মেডিকেল ক্যাম্পে অনভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা পরীক্ষা করানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্কুল শিক্ষক এবং স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আজমল হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণের জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা পরীক্ষা করা অবশ্যই দরকার কিন্তু এখানে সামান্য একজন মেডিকেল কর্মচারী দ্বারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে।

 

জরিপের আওতায় যারা আসেন নি তাদের বিষয়ে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের সমাজসেবা অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হলে বলেন, যারা জরিপের আওতায় আসেন নি তারা মেডিকেল ক্যাম্পে গিয়ে সাথে সাথে জরিপে অন্তর্ভুক্ত হয়ে মেডিকেল চেক আপ করাতে পারবেন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত নাবিল অভিযোগ করেন, উপরমহলে চেনাজানা নেই বলেই নানান হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তাকে। তিনি ফোনে জানান, মেডিকেল ক্যাম্প শুরু হবার পর সেকথা জানতে পেরে গত ২ ফেব্র“য়ারি’১৪, আগ্রাবাদ ২৭ নাম্বার ওয়ার্ডের মেডিকেল ক্যাম্পে গেলে আমাকে জানানো হয় দেব পাহাড়স্থ সমাজসেবা অফিসে যেতে। তাদের কথা অনুযায়ী সেখানে গেলে আমাকে বলা হয় জরিপ কার্যক্রম শেষ, প্রশাসন থেকে নির্দেশ না পেলে তালিকা অন্তর্ভুক্তির কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয় তাদের পক্ষে। তিনি আরও বলেন, অথচ আমারই চোখের সামনে ২৪ নং ওয়ার্ডের অপর দুজন প্রতিবন্ধী মানুষের মেডিকেল ক্যাম্পে সম্পন্ন হয় সেদিন ২৭ নাম্বার ওয়ার্ডে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সেই দুজনের ব্যাপারে ঢাকা থেকে সুপারিশ করা হয়েছিল!

অপর এক পোলিও আক্রান্ত হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী নারী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, আমার মেডিকেল ক্যাম্পের দিন দুপুরে ফোন করে বলা হয় তৎক্ষণাৎ যেতে। মেডিকেল ক্যাম্পের এই ফোনটি অন্তত একদিন আগে দেয়া উচিৎ যাতে শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের হঠাৎ ফোন পেয়ে সমস্যায় পড়তে না হয়।

উল্লেখ্য, ‘প্রতিবন্ধী জরিপে অংশ নিন, দিন বদলের সুযোগ দিন’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান নির্ণয়ের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদফতর প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে গত ১ জুন, ২০১৩ থেকে। সারা দেশের সবকটি গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিবন্ধী মানুষের তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ হয়েছে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৩। এরপর শুরু হওয়া মেডিকেল ক্যাম্পে অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা প্রতিবন্ধিতা শনাক্ত করার কাজ চলছে।

 

কোন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকলে www.dss.gov.bd ওয়েবসাইটে রাখা জরিপ ফর্মটি ডাউনলোড করে পূরণপূর্বক ওয়েবসাইটে প্রদত্ত ই-মেইল ঠিকানায় প্রেরণের মাধ্যমে জরিপে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন যে কেউ।