আমার এক পায়ে পথ চলা

84

হাসিন জাহান

প্রায় বছর তিনেক আগে, হঠাৎ করেই আমার ডান পায়ের হাঁটুতে সমস্যা দেখা দিল। আমি সমতলে চলাফেরা করতে পারি কিন্তু একেবারেই সিঁড়ি ভাঙ্গতে পারি না, এমনকি একধাপ ওঠানামা করাও আমার জন্য দূরহ হয়ে পড়লো। শুরু হলো ডাক্তার-এক্সরে।

প্রথমেই ট্রমা সেন্টারে গেলাম। ডাক্তার এক্সরে দেখে একমনে ওষুধ আর ফিজিওথেরাপি লিখে চলছেন। কি হয়েছে জানতে চাইলে বললেন, “ডান হাঁটুর মাঝের ফাঁক কমে আসছে বলে ব্যথা।” আমার পরের প্রশ্ন, “বাঁ হাঁটুর এক্সরেতেও একই অবস্থা, তবে সেই হাঁটুতে ব্যথা নেই কেন?” তিনি মোটামুটি রক্তচক্ষু মেলে তাকালেন। সাথে সাথেই বুঝলাম- ভুল করে ফেলেছি। এর চেয়ে বেশী জানবার অধিকার রোগীর থাকে না। অতএব পরদিন থেকে আমার ফিজিওথেরাপি শুরু।

 

ট্রমা সেন্টারকে আমার মত রোগীদের সেবার জন্য ঢাকার মোটামুটি নামকরা হাসপাতাল বলা যায় যার ১৩ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে গ্রাঊন্ড ফ্লোরে পৌঁছালাম। লিফটে যাবার বিকল্প পথটি আন্ডারগ্রাউন্ডে এবং যা সাধারণত অ্যামবুলেন্সে করে আসা রোগীদের জন্যই ব্যবহৃত হয়। যা হোক, এবার ফিজিওথেরাপি নেয়ার পালা। খোঁজ নিয়ে জানলাম অভিজ্ঞ কোন মহিলা থেরাপিস্ট নেই।

ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে আমার প্রশ্ন, “১৩ ধাপ সিঁড়ি ভাঙ্গা রোগীদের জন্য কতটা কষ্টসাধ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কি ভেবে দেখেছেন!” ভদ্রলোক আনন্দের সাথে শানেনযুল শুরু করলেন। জানলাম, ভবনের স্বত্বাধিকারী প্রাক্তন এক স্বাস্থ্যমন্ত্রী যিনি অতিশয় কৃপণ। কম খরচে ভবনটির নক্সা করানো হয়েছে তারই এক বন্ধুপুত্র আর্কিটেকচারের ছাত্রকে দিয়ে!

ছাত্রের অনভিজ্ঞ কাজ বা মালিকের কৃপণতার ফলে কয়েকদিনেই বুঝে গেলাম থেরাপি নেয়ার লাভের চেয়ে সিঁড়ি বাওয়ার কষ্ট অনেক বেশী। এমনকি উপকারের চেয়ে ক্ষতিই হবে ঢের।

এবার পুনরোদ্দ্যমে বিখ্যাত সি আর পি (সাভার) গেলাম। তাদের পরামর্শে সি আর পি (মিরপুর) আসলাম থেরাপি নিতে। এখানে আবার বিদেশী নিয়ম কানুন, সময় ৯-৫টা, অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী ঘড়ি ধরে সার্ভিস দেয়া হয়। আমি একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, কাজেই আমার অফিসে উপস্থিত হবার নির্ধারিত সময় আছে কিন্তু ছুটির কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। ভাবলাম, হায় হায়, এই সার্ভিস নিতে হলে তো আমার রিটায়ারমেন্ট ছাড়া গতি নাই! যা হোক, বাড়তি সময় কাজ করে পুষিয়ে দেয়া সাপেক্ষে অফিস থেকে একমাসের অনুমতি পাওয়া গেলো। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে গিয়ে হায়, দেখি পরবর্তী একমাসের সকাল এবং শেষ বিকেলের সব স্লটই বুকড।

থেমে পড়লে চলবে না, নিজেই বাসায় প্র্যাকটিস করি। পাশাপাশি প্রতিদিন হাঁটি। মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে আমার ভাড়া বাসা। উচ্চ মধ্যবিত্তের গুছানো এলাকা হিসেবে জায়গাটা পরিচিত। ফুটপাত সমেত প্রশস্ত রাস্তা। সময় সাশ্রয়ের কথা ভেবে ফুটপাতকেই বেছে নিলাম। কিন্তু একি! যখনই ফুটপাতে উঠতে হয় বহুকষ্টে আমার সম্বল বাঁ পা দিয়ে উঠার কয়েক কদম যেতে না যেতেই আবার নামতে হয়। গুণে দেখলাম, এখানকার সবচেয়ে দীর্ঘ ফুটপাতটির দৈর্ঘ্য ৩২ কদম আর সবচেয়ে ছোটটার দৈর্ঘ্য মাত্র ৩ কদম এবং ছোটগুলোর সংখ্যাই বেশী। ফুটপাতের ধারগুলো অত্যন্ত খাঁড়া। জানতে ইচ্ছা হয় কোন পারদর্শী ইঞ্জিনিয়ার এই ফুটপাত ডিজাইন করেছেন আর কেইবা সুপারভাইস করেছেন!

দিন এভাবেই কেটে যাচ্ছে, আমিও মোটামুটি এই জীবনে অভ্যস্থ হয়ে উঠছি ঘরে-বাইরে। ঈদ উপলক্ষ্যে আমার স্বামী জিজ্ঞেস করলেন, “ঈদে কি নেবে?” বললাম, “একটা স্টাইলিশ ওয়াকিং স্টিক।” সঞ্জয় দত্তের ‘সাজন’ সিনেমার মত লাঠি নেব। দোকানদার যার-পর-নাই বিরক্ত। তাকে আর বোঝানোর চেষ্টা করলাম না, এই লাঠি হবে অনেকটা আমার জীবন সঙ্গীর মত। লাঠি নেয়ার পর আমি বেশ কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে থাকলাম। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো অন্য জায়গায়। যেখানে যাই মানুষ জন অস্বস্তিবোধ করে, আমাকে স্বান্তনা দেবে না কি করবে তা ঠিক বুঝে ওঠে না।

 

অফিসের কাজে নিয়মিত ঢাকার বাইরে যেতে হয়। দোতলা বা তিনতলায় মিটিং, একপায়ে ভর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে অনেকটা সময় লাগে। তাই সবাইকে বলি আগে চলে যেতে। কিন্তু ঢাকা থেকে আসা বড় অফিসার ভেবেই হোক অথবা শ্রদ্ধার কারণেই হোক, অনেকেই কিছুতেই আগে যান না। সেক্ষেত্রে আমাকে মহা অস্বস্তি নিয়ে সিঁড়ি বাইতে হয়।

কাজের সুবাদে যেতে হয় দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। কখনো নৌকায়, লঞ্চে, ভ্যানে কিংবা প্লেনে। হাঁটতে হয় মেঠো পথে। প্রথম প্রথম সাহায্যের জন্য বলতে হতো। কিছুদিন পর বুঝলাম, আমার পায়ের সমস্যাটা মোটামুটি অনেকেই জেনে গেছেন। নিঃসঙ্কোচে অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়ান। একবার বোট থেকে নামার সময় খুব অসহায়ের মত মনে হলো, কয়েকদিন আগেও এটুকু এক লাফে পার হতাম।

আমি তখনও আশা ছাড়ি নাই। এবার গেলাম ব্র্যাকের মোহাম্মদপুর সেন্টারে। অবশেষে দেখা পেলাম মহিলা থেরাপিস্টের। পেলাম সকালের স্লট। তার ওপরে ব্র্যাকের এক কর্মীর রেফারেন্সে যাওয়ায় পেলাম ডিসকাউন্ট। আমি আনন্দে আহ্লাদিত। কিন্তু বিধিবাম! দুজন থেরাপিস্টের মধ্যে একজন মাতৃকালীন ছুটিতে। যিনি আছেন তিনি নিয়মিত দেরী করে আসেন আর থেরাপির চেয়ে গল্পেই তার বেশী আগ্রহ। অল্পদিনেই তিনিও লম্বা ছুটি নিলেন আর আমিও ধৈর্য্য হারালাম।

এরপর এলো সুবর্ণ সুযোগ। অফিসের কাজে ব্যাংকক যাব। নিজ খরচে বাড়তি কদিন থেকে ডাক্তার দেখিয়ে আসব। নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ডাক্তার জানালেন আমার পায়ের নার্ভ নষ্ট হয়ে গেছে। যার কোন চিকিৎসা নেই। শুনে আমি মোটামুটি হাঁফ ছেড়ে বাঁচালাম – যাক আর চিকিৎসা করানো লাগবেনা। মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় আকাক্ষা ব্যাংককে চিকিৎসা করানো, সেটাও পূর্ণ হলো। দেশে ফেরার পরে যখন সবাইকে চিকিৎসার ফলাফল জানালাম, তখন দেখি আমার ছোট ছেলের চোখে পানি টলমল করছে। সহজ গলায় তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, এখনও তো আমার এক পা ভালো আছে, ওটাতেও সমস্যা হলে না হয় হুইলচেয়ারে চলাফেরা করবো। কিন্তু আমি কিছুতেই থেমে থাকব না।

 

মাস ছয়েক আগে, হঠাৎ আবিস্কার করলাম কখন যেন আমি দুপায়ে চলা শুরু করেছি। আজকাল সিঁড়িও ভাঙ্গতে পারছি। আশ্চর্যজনক ভাবে চিকিৎসাবিদ্যাকে ভুল প্রমাণ করে এখন আমি দুই পায়ে ভর করে চার-পাঁচ তলা পর্যন্ত উঠে যেতে পারি।

কদিন আগে লন্ডনের সাবওয়ে টিউবে উঠেছিলাম। দেখলাম একজন সিনিয়র সিটিজেন খুব কষ্টে টিউবে উঠলেন। আমি তার দিকে আমার হাতটা প্রায় বাড়িয়ে দিচ্ছিলাম, শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলাম। হাত বাড়ালে উনি হয়তো অসম্মাানিত হতেন। আমার দেশ হলে আমি নিশ্চয় হাত বাড়াতাম। আমি এদেশের মানুষের আন্তরিকতা দেখেছি, তাদের বাড়ানো হাত ধরেছি। আমি সম্মাানিতই হয়েছি। এখনও বাইরে কোথাও গেলে, বড় ছেলে যখন চট করে আমার হাত ধরে তখন তাকে মনে করাই না যে, এখন আমি হাঁটতে পারি।

তবে আমার এই একপায়ে পথ চলা নতুন করে অনেক কিছু দেখতে শিখিয়েছে, ভাবতে শিখিয়েছে এবং বুঝতে শিখিয়েছে। কতদিন দু’পায়ে ভর করে চলতে পারবো জানিনা। তবে এখন বুঝি, চলার জন্য পা থাকাটাই জরুরী নয়, চলার পথটা চেনা জরুরী। আমি সেই পথটাই চিনে গেছি, এখন আর আমার চলতে কোন অসুবিধে নেই।

 

পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে আমি একটা এপার্টমেন্ট পাবো- মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নের ঠিকানা। ডেভেলপারের কাছে প্রথম শর্ত রাখলাম, “এমন ভাবে ডিজাইন করবেন যেন গ্রাউন্ডফ্লোর থেকে হুইলচেয়ার নিয়ে লিফটে ঢোকা যায়।” ভদ্রলোক জানালেন, “তার কাছে এমন অনুরোধ এই প্রথম।” বাড়ির কাজ প্রায় শেষের পথে। এবার কিছু ইন্টেরিওরের কাজ করতে দিলাম, এক তরুণী আর্কিটেক্টকে। জরুরী নির্দেশনা হিসেবে বললাম, টয়লেটের দরজা যেন স্লাইডিং আর সিটিং এ্যারেঞ্জমেন্টটা যেন ডিজেবল্ড ফ্রেন্ডলী হয়। সে জানতে চাইলো কার জন্য, বললাম আমার জন্য। অবাক বিস্ময়ে সে বললো, “এভাবে কাউকে ভাবতে দেখিনি, বলতেও শুনিনি।” আসলে সবারই এমন ভবিষ্যৎ ভাবনা থাকা উচিত।