দক্ষিণ পসরার সম্মুজি ‘সমিরন’

39

 

নূর নাহিয়ানঃ বাংলাদেশের আটষট্টি হাজার সাধারণ গ্রামের মতোই মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান থানার শেখর নগর ইউনিয়নের একটি গ্রাম দক্ষিণ পসরা। ঢাকার খুব কাছেই অবস্থিত এই গ্রামের ছোট্ট সমিরনকে বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় মাত্র বারো বছর বয়সে। স্বামীর সংসারে সুখেই কাটছিল দিন। হঠাৎ একদিন রান্নাঘরের বাঁশকঞ্চির আঘাতে একটি চোখে ক্ষত সৃষ্টি হয়। অনেক দিন কষ্ট পেয়েছেন এই চোখ নিয়ে। পরবর্তীতে সুচিকিৎসার অভাবে অকালেই ধীরে ধীরে দু’চোখেরই দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতার অজুহাতে দুর্ভাগা সমিরনের স্বামীর ঘর করা হল না আর।

 

মা-বাবা হারানো সমিরন আশ্রয় নেন খালার বাড়িতে। সেখানেও বেশিদিন থাকতে পারেন নি। আশ্রয়হীন সমিরনকে তার ভাই বাড়ি পাশেই সামান্য জায়গা দেন। তবে পেটের দায়ে ভিক্ষা বৃত্তিকে বেছে না নিয়ে শুরু করেন কঠোর পরিশ্রম। আশেপাশের বাড়ি ঘরের যাবতীয় কাজসহ, নানান কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি গত আটান্ন বছর ধরে। গ্রামের যেকোন অনুষ্ঠানেই ডাক পড়ে তার। প্রতিবেশীরাও খুশি সবাই তার উপরে। অনেকেই প্রশংসা করে জানান, সম্মুজি চোখে না দেখেও এত চমৎকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সাথে কাজ করেন অবাক হতে হয়। মাছ কাটা, ধোঁয়া, কাপড় কাঁচা, মসলা বাটা সাংসারিক সকল কাজই নিখুঁত ভাবে সম্পন্ন করতে পারেন।

 

বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যাসহ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েও কাজ করে যাচ্ছেন সমিরন। সরকারী তহবিল থেকে ত্রৈমাসিক বিধবা ভাতার নয়শ টাকায় এক সপ্তাহেরও ওষুধও জোটে না। সরকারী অফিসারদের প্রতি তার একরাশ আক্ষেপ। তার ভাষ্যে, “বিধবা কইরা দিছে। এহনে আমার রেশন কার্ড করবার নিছিল, ছবি তুলছিলাম। অহনে বলে অইব না। অফিসাররা আইয়া কয় প্রতিবন্ধী বানানি লাগব। রেশন কার্ড অইব না, বয়স বেশি। প্রতিবন্ধী করন লাগব। হেতে মেম্বাররা অনেক চেষ্টা করছে কিছুতেই পারল না” বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সমিরন।

 

চিৎকার করে কাঁদা আর অনিশ্চিত জীবন ছাড়া সম্বল নেই কিছুই। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতার কাছে হার মানতে নারাজ। প্রতিবন্ধিতাকে জয় করেছেন মনোবল দিয়ে। আজ তিনি পসরার সবার সম্মুজি।

বাংলাদেশে সমিরনের মতো হাজার শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও পরিশ্রম করে জীবনকে সুন্দর করার স্বপ্ন দেখেন। আর তাদের স্বপ্নগুলোকে পূরণ করতে দরকার সরকারী ও বেসরকারী সহযোগিতা। সবার ক্ষুদ্র পদক্ষেপ।

তথ্যসূত্রঃ ডয়েচে ভেলে