দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দাবায় চ্যাম্পিয়ন হলেন স্বামী-স্ত্রী

57

 

মুয়ায বিন জাকারিয়াঃ বাংলাদেশ ব্রেইল চেস সোসাইটির উদ্যোগে ১২তম গ্রামীণফোন জাতীয় বিশেষ দাবায় আজগর আলী এবং মেয়েদের গ্রুপে জামিলা আক্তার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। দু’জনেই তারা স্বামী-স্ত্রী।

 

গত ২৮ ডিসেম্বর’১৩ অনুষ্ঠিত নবম রাউন্ডে মীর হোসেনকে হারিয়ে ৮ পয়েন্টে জিতেছেন আজগর আলী। দ্বিতীয় সামসুল ইসলামও ৮ পয়েন্ট পেয়ে টাইব্রেকিংয়ে রানার্সআপ হন। সাড়ে সাত পয়েন্ট নিয়ে কামাল তৃতীয়, সাত পয়েন্টে রফিক ও শাহীন তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। সাড়ে ৬ পয়েন্ট করে নিয়ে শরীফ, মীর হোসেন, মনির রানা ও শামীম জাহান ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম স্থান পেয়েছেন এবং ৬ পয়েন্ট পেয়ে কাজী নাজমুল হুদা দশম স্থানে।

মহিলাদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন জামিলা আক্তার পেয়েছেন ৫ পয়েন্ট। রানারআপ আছিয়া আক্তার এবং তৃতীয় হয়েছেন রিবিকা মুন্সি সিমা।

 

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অডিটরিয়ামে বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের মহাসচিব শাহেদ রেজা বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্রেইল চেস সোসাইটির সভাপতি নাজমুল হোসাইন ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক শ্রী মাধব চন্দ্র সরকার।

“ব্রেইল চেস সোসাইটি” এর তত্ত্বাবধায়নে এখন পর্যন্ত জাতীয়ভাবে ১২ বার দাবা প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়েছে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আজগর আলী কৃতিত্বের সাথে হ্যাট্রিক চ্যা¤িপয়নশিপসহ এ পর্যন্ত মোট ছয়বার চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে চ্যা¤িপয়ন হয়েছেন শামছুল ইসলাম, মনির হোসেন, কামাল হোসেন প্রমুখ।

 

ব্রেইল চেস সোসাইটির নানাকথাঃব্রেইল চেস সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নাজমুল হোসাইন ফারুক নিজেও একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। ছোটবেলা থেকেই দাবার প্রতি বিশেষ আগ্রহ, দৃষ্টিশক্তিহীনতার ফলে দাবা বোর্ডে খেলতে না পারার প্রবল জেদ সব মিলিয়ে তাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

১৯৮৮ সালে চাকরির পরীক্ষায় প্রথম হয়ে স্যালভেশন আর্মিতে যোগ দেন নাজমুল হোসাইন ফারুক। খুব কম বয়সেই চাকরি জীবন শুরু করে প্রায় ১২ বছর এই সংস্থার সাথে ছিলেন। তারপর “ইন্টার লাইফ বাংলাদেশ”(বর্তমানে বাংলাদেশে নেই) এর সহযোগিতায় তিনি তার শৈশবের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সাল থেকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে দাবা খেলা শুরু করেন।

এর আগে ১৯৭৮ সাল থেকেই এইচটি সেন্টারে টেকটাইল বোর্ডে দাবা খেলা শেখা শুরু করেন। ২০০১ সালে এডহক কমিটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে “ব্রেইল চেস সোসাইটি”র জন্ম নিলেও পরবর্তী বছর ২০০২ তে সারা দেশে নির্বাহী কমিটির তত্বাবধানে ছড়িয়ে পড়ে এই সংস্থার কার্যক্রম। ২০০৬ সালে নিবন্ধিত হওয়া এই সংস্থাটি মূলত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষদের দাবা খেলার প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ খেলোয়াড় তৈরি করে।

 

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষদের দাবার বোর্ড আর অ-প্রতিবন্ধী মানুষের দাবার বোর্ডের মধ্যে কিছুটা তফাৎ আছে। “টেকটাইল বোর্ড” নামের এই বোর্ডের কালো অংশগুলো একটু নিচু আর সাদা অংশগুলো একটু উঁচু হয়। কখনও আবার কালো অংশগুলো উঁচু আর সাদা অংশগুলো নিচু হয় এবং খেলার গুটিগুলোর নিচে চুম্বক থাকে যাতে করে খেলার সময় এগুলো পড়ে না যায়। গুটির মাথাগুলোও বিশেষভাবে তৈরি যার ফলে স্পর্শেই বোঝা যায় কোনটা কোন গুটি। “টেকটাইল বোর্ড” তৈরি হয় ভারতে। কাঠ মিস্ত্রিরা তৈরি করলেও ভারতে হাবিবুর রহমান এর নামে বিক্রি হয় এই বোর্ড। যিনি নিজেও একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ। ভারতে তিনিই মূলত এই বোর্ডের প্রচলন শুরু করেন। যা পরবর্তীতে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন নাজমুল হোসাইন ফারুক। বাইরের দেশে ওক কাঠ দিয়ে তৈরি হলেও বাংলাদেশে পারটেক্স ছাড়াও নিম, কাঠাল, সেগুন ইত্যাদি বিভিন্ন কাঠ দিয়ে তৈরি হয় টেকটাইল বোর্ড। দেড় থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্য এর। বর্তমানে মিরপুরে হাবিব নামের একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ এই বোর্ডের সরবরাহকারী।

এই অনন্য উদ্যোগকে সমাজের মূল ধারায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষদের সাথে অ-প্রতিবন্ধী মানুষদের এবং বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে দাবা প্রতিযোগিতার আয়োজন হবে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে নাজমুল হোসাইন ফারুক আর্থিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলেন -“ভবিষ্যতে এমন আয়োজন করা অসম্ভবই বলা যায় যদি না ¯পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা না করেন। সাধারণত স্পন্সর পাওয়া বেশ কষ্টকর।”

 

“ওয়ার্ল্ড চেস ফেডারেশন” এর উদ্যোগে আন্তর্জাতিকভাবে এই দাবা প্রতিযোগিতার আয়োজিত হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে কেউ অংশ নিতে পারেন নি। যদিও ২০১৩ সালের  স্পেনে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় যাওয়ার আমন্ত্রণ এসেছিল কিন্তু অর্থনৈতিক সমস্যার কারণেই যাওয়া হয়নি বাংলাদেশের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দাবাড়ূ দের।

বেসরকারী সাহায্য-সহযোগিতা কিছুটা পেলেও সরকারী সাহায্য পেয়েছেন একেবারে নগণ্য। তারপরও “ব্রেইল চেস সোসাইটি” এর প্রতিষ্ঠাতা নাজমুল হোসাইন ফারুক স্বপ্ন দেখেন তার গড়া এই সংস্থার কেউ গ্রান্ড মাষ্টার হবেন। প্রবলভাবে বিশ্বাস করেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দাবাড়ূরা একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মানচিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হবেন। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়।

 

ছবির ক্যাপশন- ছবি কৃতজ্ঞতাঃ দৈনিক প্রথম আলো