মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী নারীরা অন্তর্ভূক্ত হোক

28

নাজমা আরা বেগম পপি

বাংলাদেশে নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি আজ সারা বিশ্বে বিভিন্ন দেশে প্রশংসার সাথে আলোচিত হচ্ছে। এমনকি নারীর ক্ষমতায়নে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী দেশের চাইতে এগিয়ে রয়েছে। এই অর্জনের পেছনে রয়েছে গত চার দশক ধরে সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর গঠনমূলক উদ্যোগ এবং তার সফল বাস্তবায়ন। আমাদের দেশে সকল ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীর সম সুযোগ ও সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সময় ইতিবাচক কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। যেমন তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান সহ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। উন্নয়নের মূল স্রোত ধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারী ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ভূমিকা আজও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

 

বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি বিরাট অংশ প্রতিবন্ধী নারী, যাদের জীবনের বাস্তব চিত্রটি নারী উন্নয়নের ঠিক উল্টো। একইভাবে রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিবন্ধী নারীদের অবস্থা ও অবস্থান অ-প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নের সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ। আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধী নারীরা প্রতিনিয়ত চরম উপেক্ষা, বৈষম্য ও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমনকি প্রতিবন্ধী নারী ও কন্যা শিশুরা ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মত নৃশংস সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এক্ষেত্রে কিছু কিছু ঘটনার মামলা হলেও নির্যাতন প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনগুলো প্রতিবন্ধী বান্ধব না হওয়ায় এবং আইনের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মামলাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গৃহীত সকল কর্মকান্ড থেকে প্রতিবন্ধী নারীদেরকে স¤পুর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। প্রতিবন্ধী নারীর প্রতি সংবেদনশীল না হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসা বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আন্দোলনের এজেন্ডায় প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়নের বিষয়টি ঠাঁই পায় নি।

প্রতিবন্ধী নারীরা রাষ্ট্র এবং সমাজ দ্বারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তা সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, ১৯৭৪ সালে দেশের ৪৭ টি মহকুমায় শুধুমাত্র ছেলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয় যা বর্তমানে ৬৪ টি জেলায় চালু রয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাদের দেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি পর্যায়ে কোন স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। প্রতিবন্ধী নারীদের পক্ষে অবিলম্বে ৭টি বিভাগে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েদের জন্য ৭টি সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়ে আসলেও বিষয়টি এখনও আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বেসরকারি পর্যায়ে একটি মাত্র “ব্যাপ্টিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুল” নামক সমন্বিত বিদ্যালয় আছে। তবে বিদেশি অনুদান এবং সাহায্য কমে যাওয়ায় এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা করতে বেশ মোটা অংকের ফি গুনতে হয়। যা বেশিরভাগ দরিদ্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বর্তমানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অনিশ্চিতের পথে। সরকারের কার্যবন্টন বিধি প্রতিবন্ধিতা অনুযায়ী প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন মান উন্নয়নের দায়িত্ব সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু প্রতিবন্ধী নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়নের জন্য এই মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কোন প্রকল্প গ্রহণ করেনি। কার্য বন্টনবিধির অজুহাত দেখিয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মহিলা অধিদফতর এবং জাতীয় মহিলা সংস্থার গৃহীত সকল কর্মসূচী ও সুযোগ সুবিধা থেকে প্রতিবন্ধী নারীদের বঞ্চিত করেছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নের বিষয়টি কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে তার এখন পর্যন্ত কোন সুরাহা হয়নি।

 

একজন প্রতিবন্ধী নারী হিসেবে আমি বলতে চাই, নারীর মর্যাদা বিবেচনায় প্রতিবন্ধী নারীদের দায়ভারের বিষয়টি মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অন্তর্র্ভূক্ত করা অত্যন্ত দরকার। এই সমস্যাটি সমাধানে আমাদের উচ্চ মহলের কোন উদ্যোগ দেখতে পাই নি। অবশ্য এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবন্ধী নারীদের বেশ দুর্বলতা রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য বাইরে কোন সুযোগ না থাকায় অধিকাংশ নারীরা তাদের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠেনি। আমি মনে করি, কোন সফলতা অর্জন করতে হলে আন্দোলন এবং সংগঠনের বিকল্প নেই, যা প্রতিবন্ধী নারীদের বেলায় ঘটেনি।

নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক ‘সিডো’ সনদ প্রণীত হয়। পরবর্তীতে, জাতীয় নারী নীতি ১৯৯৭, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, পারিবারিক সহিংসতা ( প্রতিরোধ ও সুরক্ষা ) আইন ২০১০ সহ আরো অনেক নারী বান্ধব আইন প্রণীত করা হয়েছে। এই আইনগুলো অ-প্রতিবন্ধী নারীর জীবনে যুগান্তকারী প্রভাব রাখলেও এতে প্রতিবন্ধী নারীদের সহায়ক ব্যবস্থা বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ না থাকায় আইনগুলো প্রতিবন্ধী নারীদের ভাগ্য পরিবর্তনে কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না।

বাংলাদেশের ২০০৭ সালের ৩০ শে নভেম্বর জাতিসংঘের প্রণীত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ অনুুসমর্থন করে। এই সনদের ধারা ৬ এ চরম বৈষম্যের শিকার প্রতিবন্ধী নারী যাতে সকল মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা সমান ও পূর্ণমাত্রায় উপভোগ করতে পারে সেজন্য রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার জাতীয় নারী নীতি-২০০১ এর ৩৯ ধারায় নারী প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি, প্রণীত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩, যা আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। যাতে প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি ক্রসকাটিং ইস্যু হিসেবে আসলেও তা কার্যত আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়নি। আইনের অধিনে বিভিন্ন কমিটিগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। আমি আশা করি কমিটিগুলোতে প্রতিবন্ধী নারীদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হবে এবং দীর্ঘদিনের বাদ পড়ে যাওয়া এজেন্ডাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মূল আলোচনায় স্থান পাবে। সম্প্রতি, নারী অধিকার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। আমি মনে করি এই মূলধারার প্ল্যাটফর্মগুলোতে আমাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য শিক্ষা, প্রজনন স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তাদের ক্ষমতায়নের পথ সুগম করা যাবে। প্রয়োজনে সরকারকে ইতিবাচক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। তবেই সমাজে প্রতিবন্ধী নারীদের সম অংশগ্রহণ ও সম সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব।

 

লেখক পরিচিতিঃ সহকারি সমন্বয়কারী, কর্মসূচী বিভাগ, জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম।

যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ ভিস্যুয়ালি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি ( ভিপস )