প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় ওয়াটারএইড বদ্ধপরিকর

50

 

ওয়াটারএইড বর্তমানে পৃথিবীর পানি, পয়ঃনিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্যভ্যাস নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে নেতৃত্বস্থানীয়। আমরা পৃথিবীর ২৬টি দেশে কাজ করি এবং এই কাজ করার সময় নিশ্চিত করবার চেষ্টা করি যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ কোনভাবেই যেন তাদের অধিকার বঞ্চিত না হন। এই প্রচেষ্টায় শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিই নন, দরিদ্র এবং সামাজিক বঞ্চনার শিকার যেকোন মানুষের অধিকার রক্ষার দিকেও ওয়াটারএইড সদা সতর্ক থাকে। এই প্রচেষ্টাকে সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়িত করবার লক্ষ্যে আমরা অন্তর্ভূক্তি এবং ন্যায্যতার নির্দেশনামূলক একটি গঠনতন্ত্র তৈরি করেছি এবং ভেবেছি এর মূল বার্তা শুধুমাত্র ওয়াটারএইড এবং এর সহযোগী প্রতিষ্টানসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের উন্নয়ন নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের সবারকাছে পৌঁছে দিতে। এই উদ্দেশ্যে অধিক সংখ্যক মানুষ এবং প্রতিষ্ঠানকে এই বার্তা পৌঁছে দিতে আমরা জুটি বেঁধেছি‘অপরাজেয়’র সাথে । আমাদের এই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে বেশ ক’বছর আগে এবং তা সামনের দিনগুলিতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা করি।

 

এবারের সংখ্যায় যে বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তার অন্যতম হচ্ছে মানবাধিকারের মূলনীতি সংক্রান্ত বিষয়সমূহ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণ যে কোন দাতব্যে বিষয় নয় সেটি পরিষ্কার বুঝতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষার জন্য যে প্রয়োজনে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার তা আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই। এটি উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আলোচনার মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে যুক্তি-তর্কের প্রয়োগ, তথ্য-প্রমাণাদির উপস্থাপন এবং সর্বোপরি অধিকার বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উপস্থিতিতে নীতিনির্ধারকগণকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চাপের মুখেও ফেলতে হয়। অধিকার রক্ষা কোন সহজ বিষয় হয়তাই এর সফল বাস্তবায়নে বহুমুখী কর্মপন্থার সহায়তা নিতে হয়। নিয়মিত এই আয়োজনে এবার আমরা বলেছি যে ওয়াটারএইড তার সহযোগী সংস্থাগুলোকে নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্যভ্যাস সুনিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে উপযুক্ত নকশা প্রণয়ন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা, দীর্ঘস্থায়ী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে যাচ্ছে। এবারের সংখ্যায় শহুরে এলাকায় পানি, পয়ঃনিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্যভ্যাস নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীতাকে কেন গুরুত্ব দেয়া উচিৎসে বিষয়ক একটি লেখাও রয়েছে আপনাদের জন্য। আপনাদের মতামত আমাদের জানান। ধন্যবাদ।

 

শামীম আহমেদ

প্রোগ্রাম ম্যানেজার

ওয়াটারএইড

 

 

অধিকার ভিত্তিক কর্মসূচীতে ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তি প্রতিষ্ঠায় ওয়াটারএইডের পদক্ষেপঃ

 

ওয়াটারএইড সকলের জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধির অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। বিশেষ করে যারা একাবারেই হতদরিদ্র এবং প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছেন, তাদের প্রতি কোন রকম বৈষম্য সৃষ্টি না করেই এসব সেবায় তাদের অন্তর্ভুক্তিকে নিশ্চিত করাই ওয়াটারএইডের প্রধান লক্ষ্য।

 

এখানে বৈষম্যহীনতার অর্থ হল, কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠির প্রতি যে কোন ধরনের বৈষম্যকে এড়িয়ে যাওয়া। বিশেষ কোন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সুনির্দিষ্ট চাহিদাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে না পারার কারণে সরকারের কোন কর্মসূচী বা নীতিমালা বাস্তবায়নকালে যেন কোন ধরনের বৈষম্যের সৃষ্টি না হয় তা নিশ্চিত করতে স্ব-প্রণোদিত উদ্যোগ গ্রহণ করাও এ পদক্ষেপের একটি বিশেষ দিক। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, মালয়, তাঞ্জানিয়া এবং বাংলাদেশে ওয়াটারএইড তার কর্মসূচীর মাধ্যমে শহুরে জনপদের নাগরিক পরিষেবা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি আরো বেশি করে দারিদ্র-বান্ধব সেবা প্রদানের দিকেও মনোযোগ দিয়ে আসছে।

 

ওয়াটারএইডের উপলব্ধি হলো এ অধিকারগুলোর ধারাবাহিক অনুধাবনের জন্য অবদান রাখতে হলে আমাদের যা অবশ্যই করতে হবে তা হলো:

 

প্রথমত: এই একবিংশ শতকে এসেও মানুষ কেন পানি এবং স্যানিটেশনের মত মৌলিক চাহিদাগুলো থেকে বঞ্চিত রয়েছে সে কারণগুলো বোঝা (বিশেষ করে এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটসমুহ) সকলের জন্য পানি এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা অবশ্যই অর্জনযোগ্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ অথবা সিদ্ধান্তহীনতার প্রত্যক্ষ ফলশ্র“তিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ পানি এবং স্যানিটেশন সেবার ব্যাপক অভাবের মধ্য দিয়েই জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে, অথবা মৃত্যুবরন করছে। এটা কেবল অপ্রয়োজনীয়ই নয়, পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।

 

দ্বিতীয়ত: দায়িত্ববাহক দের সামর্থ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করা যেন তারা তাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ স¤পূর্ণভাবে পালন করেন, তাদের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায় এবং সকল অধিকারভোগীর ব্যাপারে তারা যেন সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, পূর্ব এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় সরকারকে তার পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করার জন্য ওয়াটারএইড

ওয়াটার পয়েন্ট ম্যাপিং ব্যবহার করেছে, যা অধিকতর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার সহায়ক। এ ধরনের কাজ ফলপ্রসূ পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধিতে সত্যিকারার্থেই অনেক সহায়তা করছে।

 

তৃতীয়ত: নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সেবায় যাদের প্রবেশাধিকার নেই তাদের সাথে ঘনিষ্টভাবে কাজ করা, যেন এসব অধিকার দাবি করার ক্ষেত্রে তারা আরো বেশি ক্ষমতায়িত হয়ে উঠতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, ওয়াটার পয়েন্ট ম্যাপিং থেকে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা নিয়ে কমিউনিটির প্রতিনিধিগণ এবং বিশেষ করে সুশীল সমাজ তাদের বিভিনড়বনাগরিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সেবাপ্রদানকারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারেন, যেন তারা স¤পদ বরাদ্দ করার ক্ষেত্রে সঠিক ন্যায্যতার নীতি অনুসরণ করতে বাধ্য হন।

 

চতুর্থত: অংশগ্রহণ, বৈষম্যহীনতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা; মানসম্মত, পর্যাপ্ত এবং গুণগত মান নিশ্চিতকরণ; সমবন্টন, অবকাঠামোগত প্রবেশগম্যতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা ইত্যাদি অবস্থাগুলোর ক্ষেত্রে মানবাধিকারের মূলনীতিগুলোর সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।

 

পঞ্চমত: মানবাধিকার সনদে উল্লেখিত পানি এবং স্যানিটেশন অধিকার সংবলিত যে ধারাগুলো রয়েছে, সেগুলো প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এ্যাডভোকেসির জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এসবের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জাতিসংঘ সনদসমুহ, বিভিনড়ব আঞ্চলিক এবং জাতীয় চুক্তি, প্রতিবন্ধী

ব্যক্তির অধিকার, শিশু অধিকার, নারী অধিকার, আদিবাসীদের অধিকার, বয়স্কদের অধিকার এবং জাতিগত বৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত সনদ বা চুক্তিসমূহ। এটা অন্যান্য সেক্টরগুলোর সাথে এক ধরনের জোট বা সংযোগ তৈরির ভিত্তি হিসেবেও কাজ করতে পারে। মিডিয়ার সঙ্গে এধরনের জোটবদ্ধতা বা সংযোগ স্থাপন নীতিনির্ধারকদের ওপর জনগণের চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়, যার মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের অধিকারের দাবি সিদ্ধান্ত প্রণেতাদের কানে পৌঁছায়।

 

ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তিকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার অর্থ মানবাধিকার যে সার্বজনীন তা স্বীকার করে নেয়া এবং সাথে সাথে সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা কিনা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, তাদের অধিকার সংরক্ষণ, উনড়বীতকরণ এবং বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা। এর অর্থ হলো প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য আর সকল নীতিমালা, কর্মপন্থা এবং কাজের সাথে এর মূলনীতি এবং বিষয়গুলোকেও যেন সম্পৃক্ত করা হয়। এটি এমনটি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে, আমরা সব ধরনের মানুষের চাহিদা, অধিকার, অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতাকে স্বীকার করি এবং নিরাপদ পানি এবং স্যানিটেশনের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে যে বাধাগুলো রয়েছে তা দূর করার কার্যকর প্রচেষ্টা গ্রহণ করি।

কর্মসূচীতে যে কোন ধরনের বিচ্ছিনড়বতা সৃষ্টিকারী বিষয়গুলোকে বন্ধ করতে প্রমতঃ আমাদের নিজেদের এবং সহযোগী বা পার্টনারদের সক্ষমতা তৈরি করার জন্য এটা দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া । এটি নিশ্চিত হতে হবে যে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি যেন একীভূত ধারার চর্চাকে উৎসাহিত করে। অর্থাৎ আমরা আমাদের সাথে সম্পৃক্ত সকলকে, যেমন আমাদের স্টাফ, সহকর্মী এবং সহযোগিদের মাঝে এ ব্যাপারে যথেষ্ট পরিমাণে সচেতনতা, সংবেদনশীলতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। আর এটি নিশ্চিত হলেই আমরা এবং আমাদের সহযোগিসহ অন্য আর যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠির সাথে কাজ করছেন তাদের সকলকে সাথে নিয়ে অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবো।

 

এজন্য আমাদের বেশ কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে এবং সার্বক্ষণিক নিজেদেরকেই প্রশেড়বর মাঝে রাখতে হবে, যাতে আমরা আমাদের সেই স্বপেড়বর পৃথিবী, যেখানে সকলের জন্য নিরাপদ পানি এবং স্যানিটেশন সুবিধা সুরক্ষিত থাকবে তার সঠিক স্বরূপটি অনুধাবন করতে পারবো। এজন্যে আমাদের প্রয়োজন উৎসাহ সৃষ্টি এবং প্রয়োজনে ঝুঁকি গ্রহণ করার মানসিকতা এবং যেসব কাজে সামনে বাধার সৃষ্টি হতে পারে সেগুলোর ব্যাপারে আরো বেশি যতড়ববান হওয়া।

 

পদক্ষেপগুলোর প্রয়োগঃ এটা নিশ্চিত করতে হবে যে সংস্থার সকল ক্ষেত্রেই যেমন এর কাঠামো, কর্মপন্থা, পদক্ষেপ এবং কর্মসূচীগুলোর পরিকল্পনা যেন ন্যায্যতা এবং অধিকারভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে, সেভাবেই গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি আমাদের নির্দিষ্ট ঝুঁকিকেন্দ্রিক দক্ষতা, সাংস্কৃতিক বিষয় বিশ্লেষণ ক্ষমতা, কর্মপন্থা নিরূপণ এবং যেকোন ক্ষেত্রে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যেন তা

বিভিনড়ব বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সাথে ফলপ্রসূভাবে কাজ করতে সাহায্য করে।

 

ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তির জন্য ওয়াটারএইডের পদক্ষেপগুলো হলোঃ ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি যেন নীতিনির্ধারণে এবং কর্মপন্থার মূলধারায় থাকে তা নিশ্চিত করা। এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হলো –

  • দেশের সেক্টর ভিত্তিক বিশ্লেষণ এবংকৌশলগত কর্মপরিকল্পনা
  •  কর্মসূচি পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন
  • পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন এবং গবেষণা
  • প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধি
  •  নেতৃত্ব এবং জন ব্যবস্থাপনা,
  • তহবিল গঠন এবং যোগাযোগ

 

 

অনুবাদ: রোকেয়া সামিয়া

সম্পাদনায়: মাহফুজ-উর রহমান