প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিসিএস এ কোটার নামে শুভঙ্করের ফাঁকি,যোগ্যতা সত্ত্বেও সরকারি চাকরিতেও অবহেলা

143

“অক্ষম ব্যক্তিকে সরকার নিয়োগ দেয়ায় এবার রাষ্ট্র অচল হয়ে পড়বে!!”

“প্রতিবন্ধী হোক কিংবা অ-প্রতিবন্ধী সে তো নারী-ই! তবে কেন নারী কোটায় আমাকে সুযোগ দেয়া হবে না?”

 

 

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বিসিএস ক্যাডার সার্ভিস এবং অন্যান্য ১ম ও ২য় শ্রেণীর সরকারি চাকুরি ক্ষেত্রে এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটার নামে চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি। অপরদিকে অভিযোগ উঠেছে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরেও মৌখিক পরীক্ষায় অনেককেই বাদ দেয়া হচ্ছে শুধুমাত্র প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী অযোগ্য সন্দেহে।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শ্রুতিলেখক নিয়োগসহ, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিকার হতে হচ্ছে নানান হয়রানির। এছাড়া নিয়োগ পরবর্তী সরকারি চাকরিরত অবস্থাতেও হয়রানি, ভোগান্তি এবং অবহেলা এই শব্দগুলো পিছু ছাড়ছে না প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পদোন্নতি বাধা দেয়া বা চাকরি ছাঁটাইয়ের হুমকিও দেন সহকর্মীগণ।

 

জানা যায়, ৩৩তম বিসিএস থেকে এক শতাংশ কোটা কার্যকরের কথা বলা হলেও কোন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এতে সরাসরি নিয়োগ পাচ্ছেন না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১২.০১.১২ তারিখে জারি করা এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিসিএস ক্যাডারসহ সরকারি দফতর, স্বায়ত্তশাসিত/আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কর্পোরেশনের ১ম ও ২য় শ্রেণীর চাকরির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটাসমূহের মধ্যে যে কোটায় পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাবে না অর্থাৎ নির্ধারিত সিট পূরণ না হলে সেই শূন্য সিটের ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দ্বারা পূরণ করা হবে। এ নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মনে রয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ। উন্নয়ন কর্মী স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মুহাম্মদ ইফতেখার মাহমুদের মতে, ১৯৯০ সালের পর থেকে কোটা বিষয়ে অগ্রগতি তো হয়ই নি বরঞ্চ তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সরকার দায়সারাভাবে কাজ করছে। কোটায় নিয়োগের ক্ষেত্রে সঠিক পরিসংখ্যান যেমন নেই সরকারের কাছে, নিয়োগ না পেয়ে বাকি কোটা আদৌ পূরণ হচ্ছে কিনা বা কেন হয় নি তা নিয়েও জবাবদিহিতার কোন উদ্যোগ নেই। তিনি মনে করেন, শূন্য সিটের কোটার ফাঁকি সংশোধন এবং অন্যান্য বিষয়গুলো তদারকির স্বার্থে যথাযথ মনিটরিং হওয়া দরকার। তাছাড়া জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি হলে সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানে উদ্যোগ নেবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নিয়োগ পরবর্তী চাকরি ক্ষেত্রেও সরকারি নীতিমালা প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কতটা প্রতিবন্ধীবান্ধব তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন তিনি। তিনি বলেন, সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি কোন কোন অ-প্রতিবন্ধী সহকর্মীদের আচরণ সহযোগিতামূলক নয়। অফিসগুলোও সম্পূর্ণ প্রবেশগম্য নয়।

 

এদিকে, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) শ্রুতিলেখক নিয়োগ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে না পারায় বিসিএস পরীক্ষায় হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের। পিএসসিকে বহুবার অনুরোধ করেও সময় বৃদ্ধি বিষয়েও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায় নি।

উল্লেখ্য, নানারকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিসিএস পরীক্ষায় বসার স্বপ্ন বারবারই বাধার সম্মুখীন হয়েছে। পরবর্তীতে ২০১০ সালে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ হিসেবে অন্যান্য প্রতিবন্ধী মানুষদের পক্ষে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব স্বপন চৌকিদার। এর ফলে ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারিতে বিসিএস সহ সকল প্রকার প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ১ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ হয় এবং পরবর্তীতে ২০ মার্চ ২০১২ তে উচ্চ আদালতের আদেশক্রমে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কোটা সংক্রান্ত নির্দেশের ফলে সে বছর ৩৩তম বিসিএস থেকে শ্রুতিলেখক নিয়োগ সুবিধার সাথে প্রতিবন্ধী মানুষেরা বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।

 

যদিও শ্রুতিলেখকের সহায়তায় পরীক্ষা দিতে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন তা সত্ত্বেও পিএসসি এর  নিকট বহুবার আবেদন করেও ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সমস্যাটি বিশালাকার ধারণ করে। এমনকি বিকল্প শ্রুতিলেখকের অনুমতি না পেয়ে অননুমোদিত শ্রুতিলেখক ব্যবহার করায় ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষা চলাকালীন স্বপন চৌকিদারকে বহিষ্কার করার ঘটনাও ঘটেছে। যদিও পরবর্তীতে গণমাধ্যমকর্মীদের চাপ এবং মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপে বাকি পরীক্ষাগুলোতে তিনি অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন।

কিছু সংশ্লিষ্ট মহলে মেধা থাকা সত্বেও প্রতিবন্ধী মানুষের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ এখনও বিদ্যমান। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা সত্বেও প্রতিবন্ধিতার মাত্রা দেখে তাদের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করা হচ্ছে এবং মৌখিক পরীক্ষায় নানা অজুহাতে বাদ দেয়া হচ্ছে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষকে, এমন অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ১ম শ্রেণীর গেজেটেড অফিসার এর সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকারি অফিস/আদালত এখনও সম্পূর্ণরূপে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রবেশগম্য নয় এবং প্রতিবন্ধী কর্মকর্তাদের প্রতি আচরণেও প্রচণ্ড অবহেলা/অপমানজনক আচরণ দৃশ্যমান। তিনি বলেন, নিয়োগের প্রথম দিনেই তার প্রতি এক সহকর্মীর মন্তব্য ছিল, “অক্ষম ব্যক্তিকে সরকার নিয়োগ দেয়ায় এবার রাষ্ট্র অচল হয়ে পড়বে।” অপর সহকর্মী দুরারোগ্য ক্যান্সারের সাথে তুলনা করে বিদ্রুপ করেন, “হবু কনে/বরের ক্যান্সার রয়েছে জানা গেলে বিয়ে করে নিজের সর্বনাশ না করাই বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ! যদিও সরকার এমন অক্ষম এবং অথর্ব ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে তেমনই সর্বনাশ ডেকে এনেছে।”

এত অপমানের পরে তার চাকরি বাতিলের চেষ্টাও চালানো হয় প্রথম দিনেই। অর্থাৎ কাজের মূল্যায়নের সুযোগ দেয়ার ধৈর্যও তাদের নেই। আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা হচ্ছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মানেই তিনি অযোগ্য।

 

তথ্য অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নিয়োগ বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যদি কোন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে যোগ্য মনে করে নিয়োগ দেন, অনেক ক্ষেত্রে তাকেও হতে হয় প্রশ্নের সম্মুখীন। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগ দেয়ার সুনির্দিষ্ট কোন জায়গা নেই। অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর তত্ত্বাবধানে জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করা হলেও আইন প্রণয়ন না হওয়াতে সেখানে অভিযোগ করেও লাভ নেই। মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দাখিল করা যেতে পারে, তবে যদি প্রতিবন্ধী কমিশন নামে আলাদা একটি দফতর গঠন করা যায় সেটি আরও ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উক্ত সরকারি কর্মকর্তা।

কয়েকজন প্রতিবন্ধী সরকারি কর্মকর্তার অভিযোগ, সরকারি বেশিরভাগ ভবনই ইমারত বিধি আইন মেনে তৈরি করা হয়নি। ফলে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রবেশগম্যতা সমস্যা ছাড়াও নির্বিঘ্নে অবস্থানের জন্য নেই প্রবেশগম্য টয়লেট যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রেইল ব্যবহারের প্রচলন শুরু না হওয়াতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ দিক নির্দেশনা বুঝতে পারেন না। দিক নির্দেশনা বোর্ড বা বিভিন্ন কক্ষের সাইনযুক্ত লেখা ও নাম্বারগুলো অন্তত টেকটাইল করা হলে তারা ষ্পর্শের মাধ্যমে বুঝতে পারেন সঠিক পথে আছেন তারা। তবে ব্রেইলের প্রচলন শুরু করা এবং লিফটে ফ্লোর এনাউন্সমেন্ট বা ব্রেইল বাটন থাকা আবশ্যক। এদিকে শারীরিক প্রতিবন্ধী (বিশেষত হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী) বিসিএস পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো প্রবেশগম্য নয়।

 

“প্রতিবন্ধী হোক কিংবা অ-প্রতিবন্ধী সে তো নারী-ই! তবে কেন নারী কোটায় আমাকে সুযোগ দেয়া হবে না?”

অনেকটা ক্ষুদ্ধ হয়ে এমন মন্তব্য করেছেন ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষার্থী মেহেরপুরের আকলিমা খাতুন। নারী প্রতিবন্ধীদের নারী কোটায় নিয়োগের জোর দাবী জানিয়ে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী আকলিমা আরও বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদা অনুযায়ী সহায়ক ব্যবস্থা না থাকায় হয়রানির শিকারও হতে হয় আমাদের।

৩৩তম বিসিএস থেকেই পরিলক্ষিত যে, বেশ কয়জন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষকে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠা নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। পরীক্ষার সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা থাকলেও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহজে প্রবেশগম্যতার কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয় না। শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের সুবিধার্থে পরীক্ষাকেন্দ্র নিচতলায় রাখা দরকার বলে মনে করেন ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষার্থী হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী সগীর হোসাইন খান। তিনি জানান, কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে আশ্চর্যজনক রকমের নীরব থাকতে দেখা গিয়েছিল ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষাকেন্দ্রেও।

প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের নানান সমস্যা এবং পরবর্তী ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় তাদের জন্য কি ধরনের সহায়ক ব্যবস্থা রাখা হতে পারে এসব বিষয়ে জানতে সরকারি কর্ম কমিশন অফিসে গিয়েও মেলেনি সদুত্তর। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জনাব নেসার উদ্দিনের মোবাইলে যোগাযোগ করে এ প্রতিবেদক প্রতিবন্ধী কোটা সংক্রান্ত বিষয়ে মতামত চাইলে তিনিও ব্যস্ত আছেন বলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।