প্রতিবন্ধী ব্যক্তির আইনের বিধি প্রণয়নে গড়িমসি

30

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন – ২০১৩ এর বিধি প্রণয়ন কমিটি কর্তৃক গঠিত ওর্য়াকিং গ্রুপ গত আড়াই মাসে দুবার বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েও আহবায়কসহ কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ ব্যস্ততার অজুহাতে একত্রিত হতে পারেন নি। খবর নির্ভরযোগ্য সূত্রের। 

 

সূত্র মতে, এই আইনের এক মাস পরে পাশ হওয়া নিউরো ডেভলাপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ এর বিধি প্রণয়ন কোন এক জাদুমন্ত্রবলে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়াই তড়িৎ গতিতে এগিয়ে বর্তমানে প্রায় সমাপ্তির পথে। কিন্তু এই আইনের বিধি যেন আটকে গিয়েছে দীর্ঘসূত্রিতার অদৃশ্য জালে।

উল্লেখ্য, আইন পাশ হবার পাঁচ মাস পরে গত ৩ মার্চ জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিধি প্রণয়ন কমিটির সভাপতি জনাব নুরুল কবির এর সভাপতিত্বে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে খসড়া বিধি প্রণয়নের জন্য ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেড় মাস সময় বেধে দেয়া হয়। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য সুতার টানে পরিপত্র জারি করার সময় আরো একমাস বাড়িয়ে ১৫ মে পর্যন্ত করা হয়। অথচ ৭ সদস্য বিশিষ্ট এই সাব কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা নিজেদের কর্ম ব্যস্ততার অজুহাতে একটি বৈঠকেও অংশ নিতে পারেন নি। কিন্তু এরপরেও সাব কমিটি খসড়া জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন তৃতীয় দফায় আরও দেড় মাস সময় বৃদ্ধি করেছে।

 

এদিকে একের পর এক সময় বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোর মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১ এর মত এই আইনটিও বছরের পর বছর গড়াতে পারে ভেবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উন্নয়ন কর্মীর অভিযোগ, আজ যারা বিধি প্রণয়ন কমিটির নেতা গত এক যুগ ধরে তাদের অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতার অভাবে প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন বাস্তবায়ন করা যায় নি। এবং বিধি প্রণীত হয়েছে আইন পাশ হবারও প্রায় ৭ বছর পরে। প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন ও অধিকার অর্জনে সোচ্চার এই নেতারাই আজ দায়িত্ব পেয়ে কি সে পথেই হাঁটছেন?

তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, এই কর্মব্যস্ত নেতাদের কমিটির সদস্য কেনই বা করা হচ্ছে, আবার সব জেনেও প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন তাদের মাসের পর মাস সময় বৃদ্ধির অন্যায় আবদার কিভাবে মেনে নিচ্ছে, তা সত্যিই আমাদের বোধগম্য নয়।

 

অপর এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নের অর্থে যে নেতাদের জীবিকা ও জীবন পরিচালিত হচ্ছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন নিয়ে কথা বলে হাততালি কুড়াচ্ছেন এবং আইন বাস্তবায়নে দাতা সংস্থার কাছে থেকে বড় অংকের ফান্ডও আনছেন, তারাই কর্মব্যস্ততার অজুহাতে বিধি প্রণয়নের সভাগুলোতে অংশ নিতে পারছেন না। সরকার বিধি প্রণয়নের জন্য সাব কমিটি করার পর সেখানেও নিজেদের নেতৃত্ব জাহির করতে সেই কমিটির সদস্য হলেন। এটা খুবই দুঃখজনক, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরাই এখন সেই কমিটির সভাগুলোতে উপস্থিত থাকছেন না।

বাংলাদেশ ভিজ্যুয়ালি ইমপেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি (ভিপস) এর কোষাধ্যক্ষ জনাব আশিকুর রহমান অমিত আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন পাশ হবার পর তা অধিকার আইনে রূপান্তর করতে ১৩ বছর সময় লেগেছে। আমরা ভয় পাচ্ছি বিধি প্রণয়ন হতে না ২৬ বছর লেগে যায়! আর হঠাৎ কোন কারণে সরকার পরিবর্তিত হলে এই বিধির কার্যক্রম কয়েক বছরের জন্য থমকে যাবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তখন কি এই নেতারাই সকল দায় রাজনৈতিক দলগুলোর উপর চাপাবেন না? প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে দেশে এইসব তামাশা কবে বন্ধ হবে?

 

প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেও বিধি প্রণয়ন কমিটির সভাপতি জনাব নুরুল কবির এর সাথে সাক্ষাৎ এর সময় পাওয়া যায় নি। তবে এ বিষয়ে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের পরিচালক এবং বিধি প্রণয়ন সাব কমিটির সদস্য ডা. নাফিসুর রহমান বলেন, বিধি প্রণয়নের সাব কমিটি কাজ শুরু করেছে। মোটামুটিভাবে একটি খসড়া দাঁড়ালে তবেই আলোচনায় বসা সম্ভব। তারপর চুড়ান্ত খসড়া জমা দেয়া হবে সরকারের কাছে।

অপর সদস্য মোঃ জাহিদুল কবির বলেন, ২৪ মে সভায় কর্মপরিকল্পনা চুড়ান্ত করার প্রস্তাবনা এবং অতি সত্বর বিধির কাজ শেষ করে জমা দেয়ার তারিখ দেয়ার চেষ্টা করা হবে। এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত জানা যায় নি উক্ত সভায় কি সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

 

তবে বাংলাদেশ ভিজ্যুয়ালি ইমপেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি (ভিপস) এর সভাপতি ও কমিটির সদস্য সচিব অ্যাড. মোশাররফ হোসেন মজুমদার এ প্রতিবেদককে বলেন, জনাব মোঃ জাহিদুল কবির আগের আইনেও যেহেতু কাজ করেছেন, তিনি এবং জনাব নাফিসুর রহমান মিলেই হয়ত খসড়াটির ওপর কাজ করলে আমরা ফিডব্যাক দিতে পারব। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত কাজ শেষ করতে। এবং দ্রুত এটি সকলের দেখার জন্য অনলাইনে দিতে অনুরোধও জানাব আমরা।

উল্লেখ্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর ধারা ৪১ অনুযায়ী বিধি প্রণয়নের লক্ষ্যে সাত সদস্য বিশিষ্ট ওয়ার্কিং কমিটির আহবায়ক জনাব এস এম সুলতান মাহমুদ, যুগ্মমহাসচিব (প্রতিষ্ঠান), সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়,  এবং সদস্য সচিব অ্যাড. মোশাররফ হোসেন মজুমদার, সভাপতি, ভিপস। সদস্যরা হলেন জওয়াহেরুল ইসলাম মামুন, সভাপতি, সুইড বাংলাদেশ, জনাব এ এইচ এম নোমান খান, নির্বাহী পরিচালক, সিডিডি,  ডাঃ নাফিসুর রহমান, পরিচালক, জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম, জনাব নব কুমার ঘোষ, সমন্বয়কারী, বিপিকেএস, জনাব মোঃ জাহিদুল কবীর, সমন্বয়কারী, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ।