প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য উপযুক্ত সেবা; ভাবতে হবে সামগ্রিকভাবেই

48

 

জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাটা যেমন জরুরী, তেমনি শুধুমাত্র টিকে থাকা জীবনটাকে মানবিক পর্যায়ে প্রবাহমান রাখার জন্য জরুরী মানবাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা। জাতিসংঘের সংজ্ঞানুযায়ী, “মানবাধিকার হল মানুষের এমন অধিকার যা মানুষ জন্মগতভাবেই লাভ করে এবং যা ছাড়া মানুষ মানুষের মতো বাঁচতে পারেনা”। মানবাধিকার কারো কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া যায় না, আবার  কাউকে দেয়াও যায় না; যা করা হয় তা হলো এই অধিকার থেকে মানুষকে কেবল বঞ্চিত করা। এমন অধিকার বঞ্চিত হয়ে আছে বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী যারা বিভিনড়বভাবে বিভিনড়ব ধরনের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী “প্রতিবন্ধী অর্থ যেকোন কারণে ঘটিত দীর্ঘমেয়াদী বা স্থায়ীভাবেকোন ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়- গত ক্ষতিগ্রস্থতাবা প্রতিকূলতা এবং উক্ত ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধার পারিস্পারিক প্রভাব, যাহার কারণে উক্ত ব্যক্তি সমতার ভিত্তিতে সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত হন।” প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী যেমন বিভিনড়ব ধরনের প্রতিবন্ধিতা রয়েছে তেমনি স্বাভাবিক জীবনযাপনে এদের সীমাবদ্ধতাগুলোও ভিনড়ব। বর্তমানে উনড়বয়ন কর্মকান্ডে প্রতিবন্ধিতার অন্তর্ভুক্তি একটি অপরিহার্য ইস্যূ। এর মধ্যে যেসকল ক্ষেত্রসমূহে তাদের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা অন্যতম সেগুলো হলো, জেলা পর্যায়ে পুনর্বাসন ও অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তাদের কল্যাণ সাধন করা; মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের অভিগম্যতা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে শিক্ষার অধিকার  অক্ষুণ্ণ রাখা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং তাতে প্রতিবন্ধিতার জন্য দায়ী স্বাস্থ্যসমস্যাগুলো শনাক্ত করা ও তার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিশ্চিত করা; কর্মসংস্থান ও আয়/রোজগার ভিত্তিক কর্মকান্ডের কার্যকর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা; পরিবহণ, পরিকাঠামো ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধাসমূহে অংশগ্রহণ, অবদান এবং উপকৃত হওয়ার লক্ষ্যে তাদের অভিগম্যতা মূলধারায় নিশ্চিত করা; এবং পানি ও স্যানিটেশনে (টয়লেট) তাদের অভিগম্যতা মূলধারায় আনার মাধ্যমে নিশ্চিত করা। আরেকটি বিষয় যেটি সচরাচরই বিবেচনার বাইরে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় তা হলো, তাদের যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার নিশ্চিত করা।

 

বাংলাদেশের সংবিধান সকল নাগরিকের স্বাস্থ্য পরিচর্যা, শিক্ষা, কর্মের অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করেছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এই অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা যতটা সবলভাবে নথিভুক্ত আছে, বাস্তবে তার ব্যবহারিক রূপায়ন ততটাই দুর্বল, এবং এর অন্যতম মূল কারণ হিসেবে দেখা যায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকৃত চাহিদাগুলোকে পর্যাপ্তভাবে বিবেচনায় না আনা অথবা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চয়তার একটি প্রধান অন্তরায় হলো বিভিনড়ব ভবন ও অবকাঠামোগুলোতে তাদের অভিগম্যতার বাধা যা প্রকৃত প্রস্তাবে সিদ্ধান্ত প্রণেতাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদা সম্পর্কে এক ধোঁয়াশা উপলব্ধিরই বহিঃপ্রকাশ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য অবকাঠামোগত অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে সর্বপ্রমেই মাথায় হুইলচেয়ার ও র‌্যাম্পের বিষয় চলে আসাটাই হয়তো এক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। কারণ, একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অবকাঠামোগত অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে হলে শুধুমাত্র র‌্যাম্প কোন প্রকৃত সমাধান নয়। অপরপক্ষে, কোন কারণে র‌্যাম্পটির উপরিতল যদি মসৃণ ও পিচ্ছিল হয়, তাহলে একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর কাছেও এটি সুবিধা না হয়ে বরং অসুবিধা ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে র‌্যাম্প আছে, কিন্তু হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর সেই র‌্যাম্পে উঠবার পথ নেই। সমস্যা এখানেই শেষ নয়। দেখা গেছে এমন অনেক ভবন আছে যেখানে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর উপযুক্ত র‌্যাম্পই নির্মিত আছে, কিন্তু ঐ ভবনের টয়লেটের দরজাগুলো হুইলচেয়ারসহ অনুপ্রবেশের মতো যথেষ্ট প্রশস্ত করে তৈরি করা হয়নি। আবার, শুধু প্রশস্ত দরজাই এখানে সমাধানের শেষ নয়; প্রয়োজন হবে টয়লেটের ভেতরে হুইলচেয়ারসহ নড়াচড়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জায়গা এবং হুইলচেয়ার থেকে টয়লেটে আসন নেওয়ার জন্য একটা হাতল বা অবলম্বন।

 

যেহেতু বিভিনড়ব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংশিষ্ট সমস্যা ও চাহিদা ভিনড়বতর, তাই অংশগ্রহণমূলক আলোচনার মাধ্যমে তাদের সমস্যা জেনে তাদেরই প্রস্তাবিত সমাধানগুলো শুনে যখন কোন প্রযুক্তিগত সমাধান প্রস্তাবিত হবে, আশা করা যায় সেক্ষেত্রেই সম্ভব হবে সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনুকূলে কোন সর্বাঙ্গীণ (comprehensive) এবং  তাৎপর্যপূর্ণ (effective ) অন্তর্ভুক্তি।

 

নাদিয়া জ্যাবিন মালিক

প্রোগ্রাম অফিসার

ওয়াটারএইড