লালমনিরহাট জেলায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবস্থান ও অবস্থা

120

মোঃ এরশাদ আলী

 

বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিম সীমান্তবর্তী তিস্তা বিধৌত জেলা লালমনিরহাট। দারিদ্রতা এ জেলার মানুষের নিত্য সঙ্গী। পাশাপাশি সামাজিক অসচেতনতা, ধর্মীয় কুসংস্কার, পুষ্টিহীনতা,বহুবিবাহ, শিক্ষার নিম্নহার, খাদ্যে আয়োডিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এ জেলায় প্রতিবন্ধী মানুষের হার তুলনামূলক ভাবে বেশী। এখানকার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এতদিন অনুমান করা হতো এ জেলার প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ৫%। সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত জরিপ থেকে অনুমিত হচ্ছে যে, এই সংখ্যা ২% এর কাছাকাছি।

 

দারিদ্র ও পুষ্টিহীনতা প্রতিবন্ধিতার অন্যতম কারণ। সুতরাং এ জেলার প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন যাত্রার মান অত্যন্ত নিম্ন। সামাজিক সচেতনতার অভাব, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাব, বিরাজমান শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা ইত্যাদির ফলে তারা এসব ক্ষেত্রে প্রচন্ডভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। এবং সমাজের মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারছেন না। অধিকাংশ প্রতিবন্ধী মানুষ অভাবের তাড়নায় ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবিকা অর্জনের পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে জীবন যাপন করছেন। এই পশ্চাৎপদ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে এ জেলায় কিছু সংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

 

পরিবারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির লক্ষে সরকারি পর্যায়ে সমাজসেবা অধিদফতর ২,৯৩৩ জনকে ৩৫০ টাকা হারে প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে জেলার ৩২৯ জন শিক্ষার্থীকে প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় সম্পূর্ণ সরকারি খরচে ১০জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে আবাসিক সুবিধাসহ শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু সংখ্যক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করছে। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন পরিচালিত প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসাগত ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করছে।

 

বেসরকারি পর্যায়ে মানসিকা লালমনিরহাট জেলার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে। এছাড়া দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করছে “নজীর” (নতুন জীবন রচি) নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। নর্থ বেঙ্গল ডিজেবল্ড ডেভেলাপমেন্ট সেন্টার শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সহায়তা প্রদান করছে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও ক্ষুদ্র পরিসরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও সহায়তা প্রদান করছে। সুইড বাংলাদেশ পরিচালিত বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় এ জেলার স্বল্প বুদ্ধি সম্পন্ন জনগোষ্ঠির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আরডিআরএস বাংলাদেশ লালমনিরহাট দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আবাসিক সুযোগ সুবিধাসহ ব্রেইল পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদান করছে।

 

এত কিছুর পরেও সরকারি সহায়তার সীমাবদ্ধতা, বিরাজমান কার্যক্রমগুলো সম্পর্কে প্রচারণার অভাব, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি পরিবার ও সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদির কারণে এ জেলার বেশিরভাগ প্রতিবন্ধী মানুষ এখনও পশ্চাৎপদ এক অন্ধকার সমাজের অধিবাসীই বলা যায়। উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তারাও যে সমাজে অবদানমুখী নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে এই ধারণা বেশিরভাগ মানুষের মাঝে এখনও সৃষ্টি করা সম্ভব হয় নি। প্রতিবন্ধী মানুষের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ শেষে প্রতিটি ব্যক্তির প্রতিবন্ধিতার ধরন ও প্রকৃতি অনুযায়ী শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও সামাজিক পুনর্বাসনের সুব্যবস্থা তাদের হাতের নাগালে পৌঁছে দিতে পারলেই লালমনিরহাটে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রকৃত উন্নয়ন সাধিত হবে। তারা প্রত্যেকে সমাজে অবদানমুখী নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে। এ লক্ষ্যে দ্রুত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ও কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।

 

 

লেখকঃ রিসোর্স শিক্ষক, সমন্বিত দৃষ্টি শিক্ষা কার্যক্রম,

সাপ্টিবাড়ী, আদিতমারী, লালমনিরহাট।