বাড়ি7th Issue, June 2014হঠাৎ প্রতিবন্ধিতা ও আমাদের পরিবার

হঠাৎ প্রতিবন্ধিতা ও আমাদের পরিবার

 

নিগার সুলতানা

 

ম্যাডাম, কেমন আছেন?

জ্বী ভাল, আপনি?

জ্বী, আমিও ভাল আছি  বলে তৎক্ষণাৎই আবার বললেন- না ম্যাডাম, ভাল নেই, মনটা খুবই খারাপ। ছোট বোনটার আচমকা এক্সিডেন্ট হয়েছে। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে বাঁ পা হাঁটুর নিচ থেকে ভেঙ্গে দু টুকরো হয়ে গেছে। এক নাগাড়ে বলে থামল ছেলেটা। তরুণ একজন ব্যবসায়ী। জীবন গড়ার কাজে ব্যস্ত, কথাবার্তায় সর্বদা বেশ চাতুর্যের ছাপ লক্ষ্য করি। কিন্তু আজ ওর মন সত্যিই আদ্র হয়ে আছে।

 

শুনে খারাপ লাগল। বললাম, সো স্যাড। ডাক্তার কি বলল?

অপারেশন করাতে হয়েছে, পায়ের দুপাশে চারটা স্ক্রু লাগাতে হয়েছে। অনেক কষ্ট হচ্ছে, অনেক কষ্ট। আমরা ভাবতেও পারিনি এমন কিছু হবে। ও আমাদের ছোট বোন ছিল।

 

আমি ভ্রু কুচকে ভাবতে থাকলাম- ছিল মানে কি? মেয়েটি মরে ত আর যায় নি!? বললাম, দেখুন, আমরা কেউই কিন্তু অনাকাঙ্খিত কিছু ভেবে রাখি না। দুঃখ করবেন না, দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে। পা ভেঙ্গে গেছে যেহেতু জোড়া লেগে যাবে। একটু সময় লাগবে।  

ম্যাডাম, কতদিন?

এই তো ২/৩ বা ৫/৬ মাস।

 

সে টেনে টেনে বলল পাঁচ-ছ মাস!! কিন্তু ও আবার আগের মত হাঁটতে পারবে তো ?

হ্যাঁ, পারবে। আমি দেখেছি ভেঙ্গে যাওয়া হাড় জোড়া লেগে ঠিক হয়ে যায়। তাকে স্বান্তনা দেবার চেষ্টা করছি।

ওকে কাল হসপিটাল থেকে বাসায় নিয়ে আসলাম। চার তলায় স্ট্রেচারে করে তুলতে যে কি কষ্ট হয়েছে, ঊফ! এখন ও সম্পূর্ণভাবে বিছানায়। ওর জন্য আমরা কিছুদিন পর দোতলায় নেমে আসব।

আচ্ছা, তাহলে তো ভালই হবে।

 

কিভাবে আর ভাল হবে? সবচে বড় কথা ওর তো এখনো বিয়েই হয়নি।

ছেলেটির এই কথায় আমি হঠাৎই ফিক করে হেসে দিলাম। জানি উচিত হয় নি, তারপরও কেন যেন হেসে ফেলেছিলাম এমন একটি স্মার্ট অসহায় ছেলের চোখেমুখে একধরনের অসহায় আতঙ্কগ্রস্ত ভাব দেখে।

 

সে ধরেই নিয়েছে তার বোন আর আগের মত স্বাভাবিক হবে না। আসলে ওর ও তো কোন দোষ নেই। আমাদের সমাজের ডায়রিতেই যে লিপিবদ্ধ বিয়ের আগ পর্যন্ত কোন মেয়ের গায়ে যেন আঁচড়ও না লাগে, যেখানে চামড়া মলিন হলেই তার যৌতুকের পরিমাণ হয় ভারী। ছেলেটি আরও স্বান্তনা পাবার আশায় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার নিজেকে কেমন পীর পীর মনে হচ্ছিল। বললাম, প্লিজ, ভেঙ্গে পড়বেন না। সে আবার আগের মত হয়ে যাবে। একটা রিহ্যাব সেন্টারের নামও সাজেস্ট করলাম।

বেচারা, হয়ত কিছুদিন পর ছোট বোনের বিয়ে দিয়ে নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ার প্ল্যানে ছিল। এখন এই উটকো ঝামেলা, বোনের কিছু হলে তো ওকেও এখন ভুগতে হবে। পরিবারের সবাই এরই মধ্যে নাকি ওর জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কিন্তু আমি ভাবছিলাম সেই মেয়েটির কথা যে কিছুদিন আগেও প্রজাপতির মত উড়ে বেড়াতো এখানে-সেখানে, বৈশাখে চওড়া লালপেড়ে শাড়ি, ফালগুনে একঝাক কাঁচা হলুদ গায়ে আর খোপায় জড়িয়ে প্রিয়জনের হাতে হাত রাখত কিংবা কলেজ- ক্যাম্পাসে বন্ধুদের আড্ডায় যে ছিল সর্বদা মুখর, ভবিষ্যৎতের স্বপ্ন বুননে যার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল দৃঢ়তা, এই আকস্মিক দূর্ঘটনায় মুখ থুবড়ে পড়া জীবনকে মেয়েটি নিজে কিভাবে নিচ্ছে? যখন ও দেখছে পরিবারের সবার চোখেমুখে ওর জন্য উদ্বেগ-উৎকন্ঠা, তাহলে ও কার কাছে স্বান্তনা চাইবে? ওর আহত মন সবার চাহনিতে কথায় আরও ক্ষতবিক্ষত হয় তখন।

 

অথচ এই সময় ওর মনোবল শক্ত করার জন্য সবার উৎসাহ দরকার, আহত মেয়েটিকে বলা উচিৎ- ধৈর্য ধর, সাহস রাখো, আমরা তো আছিই তোমার পাশে। হয়ত শারীরিক ক্ষত রয়ে যায় কিন্তু মন যেন ধ্বংস না হয়, ভক্সগুর মন দিয়ে কোন যুদ্ধ হয় না। আমি নিজে দেখেছি, যখন কিছু কিছু বুঝতে শিখেছিলাম আমার নানি-দাদী বলত, তখন যদি ও মরে যেত, এতদিনে তো ভুলেও যেতাম, কি লাভ হল বেঁচে থেকে। দেখতাম একথা শুনে মার প্রচন্ড মন খারাপ, আর আমি অবাক হয়ে ভাবতাম তাহলে আমার মৃত্যুকামনা করছে সবাই! লক্ষ্য করতাম অন্য ভাই-বোনদের মত আমাকে নিয়ে কারো মনে কোন উচ্চাশা আকাক্সক্ষা নেই শুধু মা ছাড়া। মন শুধু প্রচন্ড জেদে জ্বলে উঠত তাই হয়ত হতাশার অন্ধকারে হারিয়ে যাই নি, বড় কষ্টে নিজেকে ভালবাসতে শিখেছি। প্রতিবন্ধিতা বরণ করে অনেক কিছু মিস করে করেই আজ একটু একটু ডানা মেলতে শিখেছি, মা ছিলেন একান্ত সহচরী। মাথায় তাঁর ভালবাসা মাখা হাত বুলানো সব কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়। মাঝে মাঝেই অফিসে সেই ছেলেটি আসে। একদিনই শুধু জিজ্ঞেস করেছি, কেমন আছে আপনার বোন, ভালো?

 

সেই একই উত্তর টেনে টেনে, ভালো তো হবে ম্যাডাম, কিন্তু কি আর……… ও এড়িয়ে যেতে চায়, আমিও আর ঘাটাঘাটি করিনি। বুঝুন অবস্থা, রোগীকে ওষুধ দিয়ে উপশমের চেষ্টা করলেও তার মৃত চিন্তাই যদি আমাদের মধ্যে প্রবল হয়, তো আর কি বলার থাকে!!?

আমার সময় থেকে এই মেয়েটার সময়। যুগ পেরিয়ে গেছে, অনেকটা সময় এগিয়েও এসেছে। জীবনকে কত না বর্ণিল ও বৈচিত্রতায় সাজাচ্ছি আমরা। গতিশীলতা বাড়াতে ল্যাপটপ, স্মার্ট ফোন, আইপ্যাড কত না ডিজিটাল পদ্ধতি! আর মন? মন চলছে সেই একই সফটওয়্যারে, কোনো আপডেট নেই, সেই অশিক্ষিত-অল্পশিক্ষিত নানি-দাদী থেকে এমবিএ/বিবিএ করা বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত। কিছু ব্যতিক্রমকে উদাহরণ হিসেবে বলব না আমি। হঠাৎ স্বপ্নহারা সেইসব সন্তানদের পরিবার, স্বজন ও সমাজের প্রতি বিনীত অনুরোধ তোমরা সেই ভাঙ্গা মনগুলোর একটু যত্ন নিও যেন ওরা নিজেদের প্রতি খেয়ালী হতে পারে, নিজেকে ভালবাসতে পারে। তোমাদের স্বতস্ফুর্ত ব্যবহারই ওকে সজীব করে তুলতে পারে।

 

শেষকথাঃ জীবনে চড়াই-উতরাই থাকবেই। তাই সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মানসিকতাই আমাদের রাখা উচিৎ। জীবন আসলে তাকেই মানায় যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে জানে। 

সর্বশেষ

বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে শিক্ষা উপকরণ সংকট; নানামুখী সমস্যায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা

অপরাজেয় প্রতিবেদক পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সঠিক রঙের ব্যবহার, সহায়ক উপকরণ, ইন্ডিকেটর বা সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণে সহায়ক সফটওয়্যার ও অডিও বইয়ের অভাবসহ নানামুখী সমস্যার কারণে সাধারণ...

মাসিক আর্কাইভ

Translate | অনুবাদ