দেশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলো সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়

50

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ইউএনডিপি ও বাংলাদেশ পুলিশের যৌথ উদ্যোগে নির্মাণাধীন ১টি সহ সারাদেশে মোট ৮টি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার রয়েছে যার একটিও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবেশগম্য নয়। তন্মধ্যে ঢাকা তেজগাঁও ভিকটিম সেন্টারে মূল প্রবেশপথেই রয়েছে কয়েক ধাপ সিঁড়ি।

 

অপরদিকে রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ নতুন নির্মিত অন্যান্য ভিকটিম সেন্টারগুলোর মূল প্রবেশপথে র‌্যাম্প থাকলেও স্থাপনার ভেতরে প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেটসহ অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থা তথা সম্পূর্ণ সার্বজনীন প্রবেশগম্যতা মানা হয় নি। চিকিৎসা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং এবং আবাসন ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সকল সেবা দোতলায় হলেও লিফট নেই। দেশের একটি সেন্টারেও নেই ইশারা ভাষায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মী। এ বিষয়ে সেন্টার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণও সদুত্তর দিতে পারেন নি। এদিকে আইন, বিচার ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলা ইশারা ভাষা বা বিকল্প যোগাযোগ পদ্ধতির মত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় শ্রবণ-বাক, বুদ্ধি, মনো-সামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষেরা নানা সমস্যায় পড়েন এবং অবকাঠামোগত বাধা শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলে জটিলতা সৃষ্টি করে বলে মত প্রকাশ করেছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলো। তাদের মতে, আইন বিষয়ক সেবা প্রদানকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চাইতে তুলনামূলকভাবে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সেবার মান ভালো হওয়াতে প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামোগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

 

ঢাকা ও চট্টগ্রাম ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ আনুযায়ী স্থাপনাগুলোতে সার্বজনীন নকশা মেনে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের কথা থাকলেও ঢাকার তেজগাঁও থানা সংলগ্ন ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার (ভিএসসি) এ প্রবেশগম্যতার অভাব সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সরকার এভাবেই এর উদ্বোধন করলে সেখানে আমাদের কি করণীয়? তবে হতে পারে, সেন্টার উদ্বোধনেরও অনেক আগে ভবনটি নির্মিত হয়েছে ফলে প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়টি মাথায় রাখা হয় নি তখন।

উল্লেখ্য, নির্যাতনের স্বীকার বিভিন্ন নারী ও শিশুদের পেশাগত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ২০০৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের প্রথম ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের যাত্রা শুরু হয়। নির্যাতিত নারী ও শিশুদের চিকিৎসা ও আইনি বিধি-বিধান সম্পর্কে সঠিক দিক নির্দেশনা, পরামর্শ ও সকল ধরনের সহায়তা ছাড়াও সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের সাময়িক আশ্রয় দেয়া হয় এখানে। পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রাম এর সহায়তায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তত্ত্বাবধায়নে শুধুমাত্র নারী পুলিশ সদস্যদের দ্বারা পুরো তেজগাঁও সেন্টারটি পরিচালিত হয়।

 

ভিকটিমকে সময়োপযোগি এবং পেশাগত সেবা প্রদানের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা দূর করে তাদের প্রতি সংগঠিত অপরাধ রোধে কাজ করে যাচ্ছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার। প্রতিবন্ধী ভিকটিমেরাও এই সেবা থেকে বঞ্চিত নয় বলে জানালেন, তেজগাঁও ভিএসসি’র সহকারী পুলিশ কমিশনার লুবনা মোস্তফা। এদিকে প্রবেশগম্যতা না থাকার ফলে শারীরিক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ভিকটিমকে সহায়তা দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এই সেন্টারগুলোর সাথে বেশ কিছু এনজিও যুক্ত আছে যারা প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কাজ করছেন। তাদের খবর দিলে ভিকটিমের বক্তব্য নিতে সাহায্য করাসহ প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সহায়তা দেন তারা। তবে শ্রবণ-বাক প্রতিবন্ধী  নারী ও শিশুদের ভাষা না বোঝার ফলে সমস্যা শনাক্ত করতে অপারগতা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে সহায়তার অপ্রতুলতা তাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করছে। এ কারণেই ভবিষ্যতে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ভিএসসি’কে সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধীবান্ধব করার ব্যাপারে ভাবছেন এবং তাদের পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষকেও জানাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

 

তিনি আরও বলেন, যে কোন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কোন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে তাদের কাছে পৌছুতে না পারলেও ই-মেইল, ফোন, মোবাইল, এসএমএস ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সহযোগিতা চাইতে পারেন। ভিকটিমের অবস্থিত এলাকার থানা অথবা ভিএসসি’র সাথে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনে গাড়ি দিয়ে নিয়ে যাওয়া সহ সকল ধরনের সহায়তা দেয়া হবে নির্যাতিত প্রতিবন্ধী ভিকটিমকে। প্রতিবন্ধী ভিকটিমকে অন্যান্য ভিকটিমদের ন্যায় সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে তবে তেজগাঁও ভিএসসিতে প্রতিবন্ধী ভিকটিমদের আলাদা কোন পরিসংখ্যান রাখা হয় নি।

 

এদিকে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (সদর) মাহমুদা বেগমের তত্বাবধানে নারী ও পুরুষ সম্মিলিত ১১ জন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে ডবল মুরিং থানা সংলগ্ন ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের যাত্রা শুরু হয় গত ২৬ জানুয়ারি’১৪। চট্টগ্রাম ভিএসসি’র মূল প্রবেশপথে সম্পূর্ণ ইমারত বিধিমালার মাপ অনুযায়ী নির্মিত চমৎকার একটি র‌্যা¤প থাকলেও ভবনটি সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। নয়টি বিছানার মাঝে ছয়টি বিছানাই প্রতিবন্ধী এবং অ-প্রতিবন্ধী নারী ভিকটিমের ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হলেও তা দোতলায় অবস্থিত। এমনকি চিকিৎসা সেবা, কাউন্সেলিং এবং চিত্ত-বিনোদনের সকল ব্যবস্থাও ওপরতলায়। যদি কোন হুইলচেয়ার বা ক্রাচ ব্যবহারকারী ভিকটিম আসেন তবে তাদেরকে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে সহযোগিতা করা হবে বলে আশ্বাস দিলেন ডবল মুরিং সেন্টারের দায়িত্বরত সাব ইন্সপেক্টর ইয়াসমিন আরা। তার কাছে আরও জানা যায়, চট্টগ্রাম ভিএসসি যাত্রা শুরু করার পরে এ পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়া এক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশু ও পারিবারিক সমস্যার সম্মুখীন একজন মৃদু মাত্রার শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের বেশি কাউকে আশ্রয় দেয়ার নিয়ম নেই। চট্টগ্রাম সমাজসেবা কার্যালয় ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌছে দেয়া এবং জরুরি চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করাই ভিএসসি’র মূল লক্ষ্য।

 

এদিকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে নিরাপত্তা, আইন ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে যেমন প্রতিবন্ধী মানুষের স্পষ্ট ধারণা থাকে না অন্যদিক সামাজিকভাবেও সচেতনতার অভাব রয়েছে প্রতিবন্ধী বান্ধব পরিবেশ সম্পর্কে। তাই প্রতিবন্ধিতার ভিত্তিতে সঙ্গতিপূর্ণ বন্দোবস্ত, একীভূত উন্নয়ন এবং সার্বজনীনগম্যতা ইত্যাদি বিষয়ে নিরাপত্তা কর্মী ও সংশ্লিষ্ট সকলের স্পষ্ট ধারণা নিশ্চিতে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি নির্যাতিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিশেষত প্রতিবন্ধী নারীরা যেন পারিবারিক ও সামাজিক নানামুখী চাপ মেনে এবং মানিয়ে নিয়ে জীবন ধারণ করাকেই নিয়তি বলে মনে না করেন তার জন্য নিজেদের অধিকারের বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারনা রাখার ব্যাপারে জোর তাগিদ দিয়েছেন নারী উন্নয়ন কর্মীরা।