পোশাক শিল্পে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি

219

 

 শাহাবুদ্দিন আহমেদ দোলনঃ পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, বেতন বৈষম্য, চাকুরিতে পদোন্নতি না পাওয়া এবং যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ ইত্যাদি নানা সমস্যার মাঝেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ৪৪ লক্ষ অ-প্রতিবন্ধী নারী ও পুরুষ শ্রমিকের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সহস্রাধিকেরও বেশি বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষ জীবিকা নির্বাহের আপ্রাণ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। যাদের মধ্যে রয়েছে  শ্রবণ ও বাক, দৃষ্টি এবং মৃদু মাত্রার শারীরিক প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন নারী ও পুরুষেরা।

 

সরেজমিন পরিদর্শনে জানা যায়, পোশাক কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবের ফলে অ-প্রতিবন্ধী বা প্রতিবন্ধী শ্রমিক যেই হোক না কেন মালিকপক্ষ তাদের চাকুরি দিতে ইচ্ছুক। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সর্বত্র প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা না থাকার ফলে পোশাক শিল্পে প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের নিয়োগ দিতে পারছেন না কর্তৃপক্ষ। সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা থাকলেও তাদের দাতা সংস্থাগুলো বেসরকারি দাতা সংস্থার মাধ্যমে যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন বা গার্মেন্টস উপযোগী কাজ শেখানোর কথা তা প্রকৃত পক্ষে হচ্ছে না। প্রশিক্ষণের ব্যাপারে এইসব দাতা সংস্থাগুলোর কোন মনোযোগ নেই বলেও অভিযোগ তুলেছেন প্রতিবন্ধী শ্রমিকেরা।

প্রতিবন্ধী শ্রমিক নিয়োগ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সর্পোটাস অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জনাব নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আসলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে আমরা যা চিন্তা করি তা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। তবে এখানে কিছুটা সীমিত সুযোগ আছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পে বা অন্য যে কোন শিল্পে কিছু বাধা তো আছেই, কারণ দেশের প্রতিটা কারখানাতে সিড়ি দিয়ে উঠানামার সমস্যা আছে। এছাড়া শ্রবণ-বাক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের চাহিদাভিত্তিক উপযোগি ব্যবস্থা নেই সব কারখানায়। তাই আমরা এ ক্ষেত্রে যারা কিছুটা কর্মক্ষম, নিজেরা চলাফেরা করতে সক্ষম তাদের আগে সুযোগ দেই। তিনি আরও বলেন, আমরা সবসময় চাই সরকারি অথবা বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে আসুক। তারা যদি প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মোপযোগি করে কোন প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করতে পারে তবে তাদের কাজের সুযোগ বাড়বে। এখানে কমিউনিকেশন এবং কো-অর্ডিনেশনটা বেশি জরুরি।

 

পোশাক শিল্পে প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিজিএমইএ’র সহ সভাপতি জনাব আজিম জানান, বহুতল মাল্টি স্টোরেজ বিল্ডিং হওয়ার কারণে কোন জায়গা না থাকায় ডরমেটরী বা থাকার জায়গা নির্মাণ করা হয় নি। তাছাড়া এ ব্যাপারে বিজিএমইএ এর নিজস্ব কোন নীতিমালাও তৈরি হয় নি। তবে বর্তমানে তাদের বিভিন্ন ফ্যাক্টরীগুলোতে প্রায় এক হাজার প্রতিবন্ধী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি হলে চাকরিতে সক্ষম আরও প্রতিবন্ধী শ্রমিক নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ বন্ধ আছে বা একেবারেই প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে না সেটাও নয়। বর্তমানে বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রতিবন্ধী শ্রমিক কাজ করছেন বিভিন্ন গার্মেন্টসে। তাদের মধ্যে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী পারভীন আক্তার। সেন্টার ফর দ্যা রিহেবিলেটেশন অফ দ্যা প্যারালাইজড (সিআরপি) থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা পারভীন আক্তার বলেন, ক্রাচে ভর করে গার্মেন্টসে চাকরি করতে এসে ভেবেছিলাম কিছুই পারবো না। কিন্তু অন্যান্য সহকর্মীদের নিরন্তর সহযোগিতা আমাকে সাহস যুগিয়েছে এবং নিজেকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছি। অথচ আগে নিজেকে একজন অবহেলিত, সমাজের বোঝা বলে মনে করতাম কিন্তু এখন চাকরি পেয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী এবং সুখী মানুষ হিসেবে মনে করি।

 

এদিকে নিয়োগ প্রাপ্ত প্রতিবন্ধী শ্রমিকেরা কিছু ক্ষেত্রে সহকর্মীদের সাহায্য পেলেও অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যেরও স্বীকার হচ্ছেন। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী পাবনার ছেলে পীযূষ কুমার স্টোর সহকারী পদে ২০১০ সাল থেকে চাকরি করছেন গাজীপুর টেক্সটাইল মিলে। প্রায় তিন বছরের চাকুরিতে বেতন বেড়ে বর্তমানে ১০ হাজার টাকা হয়েছে কিন্তু তার সাথেরই অপর অ-প্রতিবন্ধী সহকর্মীর মাত্র এক বছরের চাকুরিতেই বেতন বেড়ে দশ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে একই পর্যায়ের একজন অ-প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বেতন ২৫০০ টাকা হারে বাড়ছে, অপরদিকে প্রতিবন্ধিতার অজুহাতে তাদের বাড়ছে মাত্র ১৫০০ টাকা হারে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি গোচরে আনলে তারা জানিয়েছেন, অ-প্রতিবন্ধী শ্রমিকেরা যে দ্রুততার সাথে কাজ করতে পারেন প্রতিবন্ধী শ্রমিকের পক্ষে তা অসম্ভব বলেই তাদের বেতন কম।

গাজীপুরের একটি কারখানায় সহকারী স্টোর কিপার হিসেবে কর্মরত স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী জুনাই চাকমার বক্তব্যও প্রায় একই। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের চাকরি ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের মধ্যে বেতন বৈষম্য অন্যতম। তাছাড়া আমাদের বেশ কিছু প্রতিবন্ধী ভাই বোন রয়েছেন যারা দক্ষতা সত্বেও প্রশিক্ষণের অভাবে কোন চাকরির সুযোগই পাচ্ছে না। অথচ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তারাও ভুমিকা রাখতে পারেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনিও কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা পাচ্ছেন তবে প্রতিবন্ধিতার কারণে যোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান মালিকপক্ষের ভ্রান্ত ধারনা তার পদোন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি ইংরেজীতে যথেষ্ট পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও, তারই এক অ-প্রতিবন্ধী সহকর্মী যিনি ইংরেজী ঠিকমতো বলতে না পারলেও, তাকে পদোন্নতির পাশাপাশি স্পেশাল ইনক্রিমেন্টও দেয়া হয়েছে। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, কর্তৃপক্ষের ভাবখানা এমন প্রতিবন্ধী মানুষ হিসেবে যা দেয়া হচ্ছে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো, এত ওপরে উঠার কোন প্রয়োজন নাই। ব্যাপারটা রীতিমত করুণার পর্যায়ে পড়ে যা আমি মেনে নিতেই পারি না। কর্মদক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, তারপরেও যোগ্যতা অনুযায়ী যা আমার প্রাপ্য শুধুমাত্র প্রতিবন্ধিতার অজুহাতে তা থেকে বঞ্চিত করলে খারাপই লাগে।

 

গত ডিসেম্বর, ২০১৩ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনের সাথে বিজিএমইএ এর একটি বৈঠক হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পক্ষে সংগঠনের নেতারা চাকরিতে পদোন্নতি ও বেতন বৈষম্য বিষয়ে পোশাক কারখানার মালিকদের উদার মানসিকতার পরিচয় দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বিজিএমইএ’র দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। উক্ত বৈঠকে বিশ হাজার প্রতিবন্ধী শ্রমিক নিয়োগ এবং পোষাক কারখানায় কোটা সংরক্ষণ সংক্রান্ত ঘোষণা প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সহসভাপতির কাছে এ প্রতিবেদক ফোনে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান এবং বলেন, সংখ্যাটা ঠিক এমন নয় তবে সক্ষম সকল প্রতিবন্ধী শ্রমিককে আমরা চাকরি ক্ষেত্রে সুযোগ করে দেব।

প্রতিবন্ধীবান্ধব ভবন নিয়ে কিছু না বললেও  প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের থাকার স্থান সম্পর্কে বিজিএমইএ’র সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জনাব নাসির উদ্দিন বলেন, আমরা যদি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একজন করে প্রতিবন্ধী শ্রমিককেও চাকরি দিতে পারি সেখানে চার হাজার প্রতিষ্ঠানে চার হাজার প্রতিবন্ধী মানুষ কাজ করতে পারে। কর্মস্থলের কাছাকাছি আবাসন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের রেলস্টেশন সংলগ্ন রেল ক্রসিং চর গোলায় দেশের বৃহৎ ডরমেটরী নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের দিকে। এখানে প্রায় ৫০০০ শ্রমিকের থাকার সুযোগ আছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরোদমে কাজ শেষ করে হস্তান্তর করা হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে। সে ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শ্রমিক কাজ করছে এমন প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেব আমরা।

 

বিজিএমইএ সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ওভেন, সোয়েটার, নীট মিলিয়ে গার্মেন্টস এর সংখ্যা প্রায় ৫৮০০টি। তবে এর মধ্যে বর্তমানে ৪০০০ গার্মেন্টস সচল আছে বাকীগুলো বন্ধ। প্রায় ৫০% পোশাক কারখানায় প্রতিবন্ধী শ্রমিক কম-বেশি নিয়োজিত আছেন। সবচেয়ে বেশী প্রতিবন্ধী শ্রমিক কাজ করছেন গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত কেয়া গার্মেন্টসে। এখানে প্রায় সহস্রাধিক প্রতিবন্ধী শ্রমিক কর্মরত আছেন। এ প্রসঙ্গে কেয়া গার্মেন্টসের ডিজিএম জনাব কাজিম উদ্দিন বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থেকেই আমাদের কারখানার মালিক তাদের নিয়োগ দিয়েছেন। তাছাড়া আমরা সকলেই চেষ্টা করি এ সকল প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের সহ-অবস্থানে থেকে তাদের সহযোগিতা করতে। যাতে তারা কর্মস্থলে উৎসাহ উদ্দীপনার কাজ করতে পারে।

গাজীপুরের চন্দ্রা চৌরাস্তায় অবস্থিত ট্যাক্স ইউরো বিডি লিঃ এ কাজ করে প্রায় ৭০ জন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী প্রতিবন্ধী শ্রমিক। একই এলাকার হোতাপাড়ায় ওয়ান কম্পোজিটে ৩ জন এবং কালিয়াকৈরে এ্যাপেক্স গ্রুপের ৩টা ইউনিটে কর্মরত আছেন প্রায় ১০-১৫ জন। এছাড়াও চন্দ্রা কোনাবাড়িতে ইন্টার স্টপ এপ্যারেলস  গার্মেন্টস কারখানায় প্রায় ৫০ জন, সাভারে হামিম গ্রুপে ৫০ জন, ইন্টারফ্যাব শার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোঃ লিঃ এ ৫ জন, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অফ ফ্যাশন টেকনোলজি (বিইউএফটি) তে ২ জন আছেন, এভাবেই বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী শ্রমিক কাজ করছেন বিভিন্ন কারখানায়।

 

পোশাক শিল্পে প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের চাকরি ক্ষেত্রে বর্তমানে যে অবস্থা থাকা দরকার সত্যিকার অর্থে এখনও পর্যন্ত তা হয়নি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এই ক্ষেত্রে যে কারখানাগুলো তৈরী হয়েছে সেগুলোর অবকাঠামো বলা যায় কোনটাই প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়নি। কঠোর পরিশ্রমের পরেও নানান বৈষম্যের কথা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোন ফল পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শ্রমিকরা কাজের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।

সরকারি ও বেসরকারিভাবে একটু সাহায্য সহযোগিতা পেলেই প্রতিবন্ধী শ্রমিকেরা হয়ে উঠবে দেশের অনন্য মানব সম্পদ, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।