রূপালী জোছনা

114

তান্নি চৌধুরী

 

ড্রইংরুমে কারো ভারী কন্ঠস্বর শুনে জানালার পর্দাটা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। কাউকে দেখা গেল না। সিগারেটের বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে। ড্রইংরুমের সোফায় বসে কেউ আয়েশ করে সিগারেট ফুঁকছে। বাসায় কেউ নেই, সবাই আমার বোনের একমাত্র মেয়ের জন্মদিনের উৎসব উদযাপনে গেছে। রাত সাড়ে আটটায় অনুষ্ঠান শুরু হবে। আমার সবকিছু গুছিয়ে তৈরি হতে দেরি হবে বলে আগেই চলে গেছে সবাই। যাবার সময় নিশ্চয় দরজা লক করে যাওয়া হয় নি। এই সুযোগে দরজা ঠেলে কেউ ঢুকে পড়েছে। কি নির্লজ্জ লোকটি, কোনো অনুমতি ছাড়াই ঢুকে আসন গেড়ে বসল!

 

আমি বেরুনোর জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। শাড়ী পরে, চুল বেঁধে হালকা মেকআপ নিচ্ছি। এই সময় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিলো এই আজব অনুভূতির। হালকা ভয় লাগছে। ড্রইংরুমে কে বসে আছে সেটা দেখার সাহস পাচ্ছি না। তারপরও উপায় নেই। কপালে টিপটা লাগিয়ে ভীরু পায়ে চলে এলাম ড্রইংরুমের দরজায়। পর্দা সরিয়ে দেখলাম, পায়ের উপর পা দিয়ে বসে আছে একটি লোক। একটু পর পর সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে, আর টেবিলের উপর রাখা এসট্রেতে ছাই ফেলছে।

 

মেজাজটা বিগড়ে গেল। চিনি না জানি না অথচ পরিচিত জনের মতোই ড্রইংরুমে বসে আয়েশ করছে অভদ্র লোকটা। এবার সমস্ত সংশয় ঝেড়ে ফেলে লোকটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার পায়ের শব্দে পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসলেন আগন্তুক। মুখে থেকে এক পশলা ধোঁয়া ছেড়ে আমাকে বসতে ইশারা করলেন তিনি।

 

–   কি ব্যাপার বলুন তো? আপনি এখানে কি চান?

অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম আমি।

আমার কথায় মৃদু হাসি ফুটে উঠে লোকটির ঠোঁটে। কিছুক্ষন নীরব থেকে হঠাৎ বলে উঠলেন,

–   আজ পূর্ণিমা, বাইরে যাবে?

এ কথায় হতভম্ব আমি। এতক্ষণ পর এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আপাদমস্তক তাকালাম লোকটির দিকে। বয়স প্রায় চল্লিশ-বিয়াল্লিশের কাছাকাছি। কোঁকড়া ঘন চুল। কানের দিকটায় পাক ধরেছে। মায়াবি মুখটা ভীষণ চেনা চেনা। মুখটার দিকে তাকিয়ে আর দৃষ্টি ফেরাতে পারছি না। আমি নিশ্চিত, এ আমার অতি চেনা কেউ।

–   চিনতে পেরেছো? তোমাকে ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে আজ, তা কি তুমি জানো?

মিষ্টি হেসে ভাবনার অতল সমুদ্র থেকে আমাকে তুলে এনে বলে লোকটি,

–   আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

কম্পিত কণ্ঠে উত্তর দিই। এবার শব্দ করে হেসে উঠে লোকটি। তারপর গালে হাত দিয়ে বলে,

–   ভেবে দেখো তো! যখন তুমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়তে একটি লোককে তুমি এতো ভালোবাসতে যে, তার একটি গান শুনলে তোমার চোখে জল চলে আসত। কোন গানটা বলব? মায়াবী রাতের এই মধুর জোছনায়………..।

 

দুচোখ বুজে সেই জাদুময়ী কন্ঠে গান শুরু করে সে। কি আশ্চর্য! আজো আমার চোখে জল আসছে। খুব ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলি,

–   সুমন ভাইয়া, এতোদিন কোথায় ছিলে?

সেই ছোটবেলা থেকে যাকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম। ধার করে লিখে নেয়া কতো চিঠি পাঠিয়েছি তাকে! বন্ধুদের আড্ডায় কতোবার পণ করেছি, যদি কখনো বিয়ে করতেই হয় তবে সুমন ভাইকেই করবো। কৈশোরের কলি কালের আবেগী ভালোবাসাকে পরিণত মানুষ হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করতে পারে নি সুমন ভাই। হয়তো যথার্থ বয়সের পরিপূর্ণতার কাছে আমার ভালো লাগাটাকে স্বীকার করা বেমানান ছিল। কখনো মুখোমুখি হলেই স্নেহের ভঙ্গিতে মাথায় হাত বুলিয়ে এড়িয়ে যেতেন আমাকে। আমার ভাইয়ার শিক্ষক ছিলেন তিনি। হয়তোবা এড়িয়ে যাবার এটাও একটা কারণ। মুখ ফুটে কখনো কাউকে বোঝাতে পারি নি কতোটা ভালোবেসেছি এই মানুষটিকে। আমার স্বপ্নের রাজপুত্র সুমন ভাই। বুঝতে পারতাম না কেন এতো ভালোবাসতাম তাকে। তার ভালো গায়কীর জন্য?  নাকি অন্য কোন কারণে। শুধু বুঝতাম তার প্রতিটি আচরণই আমাকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করত। শেষে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি তাকে ভুলে থাকতে। আজ অনেকদিন পর স্মৃতির ধারালো অস্ত্রটা আবারও বিদ্ধ করছে বুকের পাজরে। কাধেঁর উপর কারো হাতের স্পর্শে চমকে উঠলাম।

 

–   পরী তুমি কাঁদছো?

মুখের কাছে ভারী নিশ্বাস ফেলে বলে সুমন ভাই।

–   কই নাতো! এতোদিন কোথায় ছিলেন?

আমার ভেজা কন্ঠস্বর রূদ্ধ হয়ে আসে। এবার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নেন তিনি। মৃদুস্বরে বলেন,

–   তোমার কাছ থেকে পালিয়ে ছিলাম। কিন্তু কি বিচিত্র দেখো! একটি পিচ্চি মেয়ের ভালোবাসা আমাকে হারিয়ে দিল? যাই হোক, বাসার সবাই কোথায়?

–   ওরা আমার ভাগ্নির বার্থডে পার্টিতে গেছে।

–   তুমি এখন যাবে তাই না?

–   হ্যাঁ।

–   তোমাদের বাসার দরজা খোলা ছিল, অনুমতি না নিয়ে ঢুকে পড়লাম সারপ্রাইজ দেবো বলে। কিছু মনে করো নি তো?

–   কি যে বলেন না আপনি! চা দেবো, সুমন ভাই?

–   না, চলো পূর্ণিমার আলোয় স্নান করি। যাবে?

–   সত্যিই যাবেন?

বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ে আমার কন্ঠে।

 

আর কিছু না বলে আমার হাত ধরে বাইরে চলে আসে সুমন ভাই। সবকিছুই স্বপ্নের মতো লাগছে আমার কাছে। বাইরে ফুটফুটে জোছনা। আমরা একে অপরের হাত ধরে হাঁটছি জোছনার রুপালী আলোতে।

–   পরী! কোমল কন্ঠে ডেকে উঠে সুমন ভাই।

–   হুমম, বলুন না।

–   ‘তুমি’ করে বলা যায় না বুঝি! তোমার মাথায় ঘোমটা তুলে দেই?

–   দাও।

অস্পষ্ট স্বরে বলি আমি। আমার মাথায় শাড়ীর আঁচলটা তুলে দিয়ে মুখটা তুলে ধরে তার মুখের সামনে। শিহরণে আমার দুচোখ বুজে আসে।

–   এ্যাই নীল পরী, জন্মদিনে যাবে না?

–   যাবো না, এমন জন্মদিনের অনুষ্ঠান হয়তো অনেক আসবে এ জীবনে। কিন্তু কৈশোরের মতো যদি আবার হারিয়ে ফেলি তোমাকে?

আর কথা বাড়ায় না সুমন ভাই। দুজনই চুপচাপ। অদূরে ঝিঁঝিঁদের শব্দ শোনা যায়। আলতো পায়ে আমায় জড়িয়ে হাঁটছে আমার প্রিয় মানুষটি। ক্রমেই বাড়ছে রাত। দু’জনে হেঁটে চলেছি নিরুদ্দেশের পানে।