শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ মঞ্জুর আহমেদ

99

বাংলাদেশের শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অগ্রপথিক জনাব মঞ্জুর আহমেদ। বাংলা ইশারা ভাষার চর্চা ও বিকাশ, এই মানুষদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সংগঠিত করার মাধ্যমে অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনমান নিশ্চিত করতে মঞ্জুর আহমেদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

 

মাওলানা মকবুল আহমেদ ও আছিয়া খাতুনের একমাত্র পুত্র সন্তান মঞ্জুর আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩২ সালের ২ অক্টোবর পিরোজপুর জেলার পর্দাশি গ্রামে। পরিবারে আনন্দ উল্লাসের অন্যতম উৎস হাসি-খুশি, উচ্ছল এই শিশুটি মাত্র পাঁচ মাস বয়সে আচমকা এক আত্নীয়ের হাত থেকে পড়ে গিয়ে প্রচণ্ড আঘাত পান কানে। সাথে সাথেই তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানান, মঞ্জুর আহমেদের কানের পর্দা ফেটে গেছে। আর কখনোই তিনি কানে শুনতে পারবেন না। তাই কানে না শোনার ফলে কথা শেখাও সম্ভব হবে না তার পক্ষে। ফলে পরবর্তীতে শ্রবণ ও বাক এই দুই প্রতিবন্ধিতা নিয়ে মঞ্জুর আহমেদের বেড়ে ওঠা।

মাওলানা মকবুল আহমেদ ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। পরবর্তীতে তিনি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। উচ্চ শিক্ষিত এবং ভিন্ন চিন্তাধারার এই ব্যক্তি তার শ্রবণ প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে দমে যাননি। বরং তাকে আÍনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলেন। ৬ বছর বয়সে তাঁর বাবা কলকাতা মূক ও বধির বিদ্যালয়ে এনে ভর্তি করিয়ে দিলেন মঞ্জুর আহমেদকে। সেখানে তিনি পঞ্চম শ্রেণী (কারো মতে অষ্টম শ্রেণী) পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর তিনি বিদ্যালয়ের কারিগরি বিভাগের আওতায় প্রেসে কাজ করতে শুরু করেন।

 

১৯৫৩ সালে মঞ্জুর আহমেদ কলকাতা থেকে এসে রাজশাহী মূক ও বধির বিদ্যালয়ের শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মেধা ও যোগ্যতার বলে স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি এই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকার ১৯৬২ সালে চার বিভাগে চারটি শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (পিএইচটিসি) আওতায় শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয় এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেন। এজন্য ১৯৬৮ সালের ৮ অক্টোবর ঢাকার রোটারী স্কুল ফর দি ব্লাইন্ড জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু ঢাকায় শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয় না থাকায় সরকার সেন্ট্রাল রোডে ১৯৬২ সালে অস্থায়ী ভিত্তিতে এটি চালু করেন। মঞ্জুর আহমেদকে দিয়ে সরকারি এই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। শিক্ষক হিসেবেই পরবর্তীতে এই বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। মঞ্জুর আহমেদের ঢাকায় আগমন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষকে সংগঠিত করার কার্যক্রমে নতুন মাত্রাযুক্ত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

 

১৯৬৩ সালে লায়ন মহিউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে লায়ন এম. আর. খান, জনাব মঞ্জুর আহমেদ, জনাব হারুনুর রশিদ খান এবং জনাব বিজয় কুমার সাহা এই পাঁচ ব্যক্তি বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা (বিএনএফডি) প্রতিষ্ঠা করেন।  সংস্থার যাত্রা শুরু হয় লায়ন এম. আর. খানের রামকৃষ্ণ রোডস্থ বাসভবনে। পরবর্তীতে সংস্থাটি তোপখানা রোড হয়ে বর্তমান স্থাপনা বধির ভবনে স্থানান্তরিত হয়। জনাব মঞ্জুর আহমেদ বিএনএফডি এর প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত অবৈতনিক সাধারণ স¤পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন জনাব মঞ্জুর আহমেদ। আশির দশক পর্যন্ত তিনি ছিলেন সরকারি শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষক। কলকাতা মূক ও বধির বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য ইশারা ভাষায় শিক্ষাপদ্ধতি রপ্ত করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগান পরবর্তীতে নিজের ছাত্রদের ক্ষেত্রে। ঢাকা বধির সংঘ, বাংলাদেশ বধির মহিলা কল্যাণ সংস্থা, ঢাকা বধির উচ্চ বিদ্যালয়, বাংলাদেশ বধির ক্রীড়া সংস্থা, ঢাকা বধির ক্রীড়া সংঘ এই সকল সংস্থা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বধির ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি এবং ঢাকা বধির ক্রীড়া সংঘের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

 

বিএনএফডি এবং বাংলাদেশের শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকারের বিষয়ে কথা বলতে মঞ্জুর আহমেদ জাপান, মালয়েশিয়া, ভারত, অস্ট্রিয়া, বুলগেরিয়া, জার্মানি, নেপাল, পাকিস্তানসহ আরো বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সেমিনার ও কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব ডেফ এর পক্ষ হতে ইন্টারন্যাশানাল সলিডারিটি মেরিট এ্যাওয়ার্ড (২য় শ্রেণী) গ্রহণ করেন।

যথেষ্ট দায়িত্বজ্ঞান স¤পন্ন এই ব্যক্তির বিয়ে হয় তার চাচাত বোনের সাথে। মঞ্জুর আহমেদের পরিবারে তার স্ত্রীর দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তান। প্রথম স্ত্রীর সাথে তালাক হয়ে যাওয়ার পর ১৯৮০ সালের ৭ জানুয়ারি শ্রবণ প্রতিবন্ধী নারী শিরিন বেগম-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানের পিতা হন।

 

২০০৪ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে মাইল্ড স্ট্রোক করার পর ২০০৬-২০০৭ সালের দিকে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও বর্তমানে তিনি আবারও শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন বার্ধক্যজনিত কারণে। জীবনের শেষ সময়ে এসে বধির মানুষদের বাঘ বলে খ্যাত এই অসামান্য ব্যক্তিকে কেউ মনে রাখেন নি এবং তাঁকে একটু দেখতেও যান না এটাই একমাত্র কষ্ট তার পরিবারের।

 

অনুলিখনঃ রায়হানা রহমান