সিলেট ভ্রমণ; একটি নিখাদ ভালবাসার গল্প

37

সগীর হোসাইন খান

 

২০১৪ এর ১ জুন, রাতে হঠাৎ করেই ইমরান ভাই প্রস্তাব দিলেন, “সগীর ভাই আমরা সবাই মিলে সিলেটে যাচ্ছি হযরত শাহজালালের মাজারে জুম্মার নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে। আমাদের ইচ্ছে আছে সেখানে একরাত থেকে সিলেট ঘুরে দেখার। মাইক্রো নিচ্ছি, আপনার কোন কষ্ট হবে না, চলেন।” এমন চমৎকার প্রস্তাব হাতছাড়া করার কোন মানেই হয় না। তাই আর না করলাম না। শুধু বাসায় এসে আম্মার অনুমতি নিয়ে নিলাম। পরদিন ফজরের নামাজ পড়েই রওনা দিলাম। গন্তব্য পূণ্য ভূমি সিলেট।

 

যথারীতি আনন্দ করতে করতে আমরা সিলেট পৌঁছে গেলাম। একটা হোটেল রুম একদিনের জন্য ঠিক করেই চলে গেলাম হযরত শাহজালালের মাজারে নামাজ পড়তে। মসজিদে ঢুকেই দেখি মূল মসজিদে নামাজ পড়ার সুযোগ নেই। সারা বাংলাদেশ থেকে আগত হাজার হাজার মানুষ তা দখল করে রেখেছে। আমরা বাইরে উন্মুক্ত চত্বরেই নামাজ পড়ে নিলাম। হযরত শাহ জালালের কবর দেখলাম কিন্তু শাহ পরানের কবর দেখবো না তা কি করে হয়। তাই যথারীতি শাহ পরানের কবর দেখার পর্ব শেষ করলাম।

 

ততক্ষণে পাকস্থলি জানান দিচ্ছে বেলা অনেক হয়েছে কিন্তু আমাদের কিছু খাওয়া হয়নি। কি আর করা? পাকস্থলির আহ্বান তো আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না! তাই একটা রেস্টুরেন্টে বেশ উদরপূর্তি করেই খেয়ে নিলাম। এর পর শুরু হল সিলেট দেখার পর্ব। প্রথমেই চলে গেলাম জাফলং দেখার জন্য। কি চমৎকার পাথর! শীতল পাথর ধোয়া পানি! স্পর্শ করলেই সেই শিহরণ শিরদাড়া বেয়ে বুকের ভিতরে গিয়ে আঘাত করে! জাফলং-এ সবচাইতে বেশী যেটা উপভোগ করেছি সেটা হল সূর্যাস্ত! পাহাড়ের পেছনে ধীরে ধীরে সূর্যের লুকিয়ে পড়াটার মাঝে কতটা কাব্যিক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তা না দেখলে ঠিক বুঝিয়ে বলা যাবে না। জাফলং পর্ব শেষ করতে করতে এশার আযান হয়ে গেল। তাই সেদিনের মত আমাদের প্রধান আকর্ষণ রাতারগুলে আর যাওয়া হল না। রাতে শোবার আগে নিয়ত করেই শুলাম সকালে ফজরের নামাজ পড়েই বের হয়ে যাব শিয়ালের ডাক শোনার জন্য। সে রাতে আর ঘুমই হল না। সেদিন আমাদের ফজর হয়েছিল দুপুর ১১ টায়! তাই বাধ্য হয়ে শিয়ালের ডাক শোনার পর্ব বাদ দিয়ে সকালের নাস্তা পর্ব সেরেই বের হয়ে গেলাম রাতারগুলের উদ্দেশ্য।

আমার এক পরিচিত বড় ভাই আগেই বলেছিল সিলেটের মানুষের কাছে কখনোই কোন ঠিকানা জানতে চাইবে না। কেন বলেছিল তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম যখন প্রায় দুই ঘণ্টা একই রাস্তা দিয়ে ঘোরাঘুরি করার পর গিয়ে উদ্ধার করতে পারলাম রাতারগুল যাওয়ার পথ।

 

অবশেষে! অবশেষে গাড়ি পৌঁছল রাতারগুলোর কাছে! কিন্তু আমার ভোগান্তি তখনও বাকী! যা পথ, দূর থেকে দেখেই বুঝতে পারছিলাম এই পথ মাড়িয়ে আমার পক্ষে যাওয়া বোধ হয় সম্ভব হবে না! সাথের বড় ভাইয়েরাও বলছিল, “আপনি যেতে পারবেন না। গাড়িতেই থাকুন। আমরা তাড়াতাড়ি চলে আসবো।”

কিন্তু আমার মন তা মানতে নারাজ! এত কাছে! এত কাছে এসেও রাতারগুল দেখতে পাব না!!? পানি থেকে গজিয়ে উঠা জঙ্গলের নিরবতা উপভোগ করতে পারবো না! তা হতেই পারে না। তাই আল্লাহর নাম নিয়ে ঠিকই চাষের জমির পাশ ঘেষে রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলাম। রাতারগুলের কাছেই রাস্তা ঠিক করার কাজ চলছে। সম্ভবত পর্যটকদের সুবিধার জন্য। এরপর যখন যাব আশা করি একদম ঘাট পর্যন্ত গাড়ি করে যাওয়া যাবে। কিন্তু এখনকার জন্য হাঁটাই একমাত্র পথ।

 

আমির মাঝির নৌকা ঠিক করা হল। তিনিও বার বার একই কথা বলছিলেন, “আপনি পারবেন না।” একটু হাঁটার পর আমিও অনুভব করলাম মনে হয় আর যাওয়া হবে না। কারণ কাঁদা মাটিতে দু’বার প্রায় পা পিছলে যাচ্ছিল। এরপর হঠাৎ আমির মাঝিই প্রস্তাব দিয়ে বসল, “আপনি আমারে ধরেন, আমি আপনারে ঘাড়ে করে ঐ পর্যন্ত দিয়ে আসি।” প্রস্তাব শোনার সাথে সাথেই না করে দিলাম। আমি কারো ঘাড়ে, পিঠে উঠা একদমই পছন্দ করি না। কিছুদূর যাবার পর হাল ছেড়ে দিলাম। নাহ্ আর পারছি না। চলে আসার জন্য ঘুরতেই কোথা থেকে যেন উদয় হলেন দুই ভদ্রলোক। একদম কাদায় মাখামাখি। তারা রাস্তা ঠিক করার জন্য মাটি কাটছিলেন। তাদের একজন আমির মাঝির ভাই সোনা মিয়া আর অপর জন তার বন্ধু। সোনা মিয়া বললেন, “আপনি এত কষ্ট করে, এত প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে এসেও আমাদের এলাকার সৌন্দর্য্য দেখে যেতে পারবেন না, এটা আমাদের  জন্য অপমান।” বলতে দেখি আমাকে ঘাড়ে তুলতে আর দেরি নেই। যতই মানা করি ততই শক্ত করে ধরে হাঁটা শুরু করে দিল। কি আর করার!

 

তারা ঐ ভাবে ধরেই আমাকে নিয়ে নৌকার কাছাকাছি পৌঁছে গেল। এমনিতেই মাটি কাটতে কাটতে তারা পরিশ্রান্ত। তার উপর আমাকে এই এবড়ো থেবড়ো মাটিতে তুলে নেওয়ার কারণে আমি তাদের হাঁপানোর আওয়াজ শুনতে পারছিলাম। তাই নৌকা থেকে কিছুটা দূরে থাকতেই আমাকে নামিয়ে দিতে বললাম। সেখানের মাটিও অনেক ভাল ছিল অবশ্য। আমি সহজেই হাঁটতে পারতাম। কিন্তু তাদের কথা হল আমাকে নৌকায় দিয়েই তাদের শান্তি। অবশেষে তারা আমাকে নৌকায় এনেই নামাল। কিন্তু এখানেই তাদের দায়িত্ব শেষ করল না। বলে গেল আপনারা ঘুরে আসেন, এরপর নিয়েও যাব আমরা। এটা শুনেই যারপরনাই অবাক হলাম আমরা। তারা কতটুকু খেয়াল করে কথাটা বলেছে তা তাদের মুখের ভাব দেখেই বুঝা যাচ্ছিল।

যা হোক, শুরু হল নৌকায় ঘুরে ঘুরে রাতারগুল দেখা। সত্যিই চমৎকার একটা স্থান। সুন্দরবন যেমন লোনা পানির মধ্যে জলা বন এটাও তেমনি মিষ্টি পানির মাঝে ভাসমান একটা বন অর্থাৎ সারা বছরই এখানকার গাছপালাগুলো অর্ধেক পানির নিচে ডুবে থাকে। তাই একে সোয়াম ফরেস্ট বলে। চমৎকার নিরব আর গা ছমছম করা পরিবেশ।

 

বনে ঘণ্টা খানেক ঘুরাঘুরি করে এবার ফেরার পালা। নৌকা ঘাঁটে আসতেই দেখি তারা কথা রেখেছে। মাটি কাটার কাজ রেখে ঠিকই আমাকে নিতে এসেছে। এবার তারা শুধু গাড়িতেই তুলে দেয় নি আমাকে, তাদের বাড়ি সেখান থেকে কাছেই ছিল। বাড়িতে নিয়ে চমৎকার আপ্যায়নও করিয়েছে। সিলেটে গিয়ে শুধু তাদের বাড়িতেই গিয়ে আমি চায়ের আসল স্বাদ পেয়েছি। চলে আসার সময় তাদের ফোন নাম্বার নিয়ে আসতে ভুল করি নি। এরপর থেকে প্রায়ই তাদের সাথে

 

ফোনে কথা হয়। এখনো বিশ্বাস হতে চায় না মানুষ এতটা ভাল এখনো আছে! পুরো সিলেট ভ্রমণে তাদের দেওয়া ভালবাসাটুকুই ছিল সাথে করে নিয়ে আসা আমার একমাত্র সম্বল।