স্কলিওসিস নিয়ে আর এক অপরাজিতার কাহিনী

133

 

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী

 

সে এক বিদেশী মেয়ে। ওর নাম নাই বললাম। সেই মেয়ের কাহিনী বলা এজন্য প্রয়োজন যে এ রোগটি মেয়েদের বেশি হয়; কিন্তু হলেও এই সমস্যা নিয়ে কি করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় তা জানলে আমরা আরও অনুপ্রাণিত হবো। অনেক ছেলে মেয়ে এত সমস্যা নিয়েও সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মধ্যে মঙ্গবার আকাশে জ্বলছে এদেশেও। জীবনের সংগ্রামে যারা হেরে যায় তারা ঘুরে দাঁড়াবার, বুক চিতিয়ে দাঁড়াবার অনেক সাহস পায়।

 

সেই মেয়েটি যখন অন্যদের বলল আমার স্কলিওসিস হয়েছে তখন দুটো বিষয় বিস্মিত করলো তাঁকে: প্রথমত: ক’জন লোক এ রোগ সম্বন্ধে জানে, দ্বিতীয়ত: কতজন মহিলার এ রোগ হয়েছে। ‘শিরদাঁড়া বাকা হয়ে যাওয়া’ বা ‘শিরদাঁড়া বক্রতা’ হিসাবে স্কলিওসিসকে বর্ণনা করাই সহজ হবে।

ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের এ রোগ বেশি হবার প্রবণতা বেশি। স্কলিওসিস রোগের কারণ কি তা সত্যি করে কেউ জানেন না। গবেষকরা দেখেছেন অনেকগুলো উপাদানই এর সঙ্গে জড়িত, যেমন: বংশধারা, গোত্রবেদ, বয়স। তবে, কেউ কিছু যথার্থ কারণ বলতে পারেন নি।

 

সেই মেয়েটির বয়স যখন বারো তখন ডাক্তারের কাছে অন্য রোগের জন্য চিকিৎসা করতে গিয়ে আবিষ্কৃত হলো যে শিরদাঁড়ার নিচের দিকে বাঁকা। সেই ডাক্তার তাকে হাড় বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করতে বললেন। অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ বা হাড় বিশেষজ্ঞ তাকে প্রতি মাসে আসতে বললেন। এসব করে এই বক্রতার অগ্রগতি লক্ষ করবেন। এভাবে শুরু হলো তার কিশোর, তার বয়ঃসন্ধিকাল। সেই স্মৃতি সে আজ ভুলে যেতে চায়, আর যেন না আসে জীবনে…

শরীর তার ধর্ম মেনেই বাড়তে থাকে।  কিন্তু শিরদাঁড়ার বাঁক এতো বাড়তে থাকে যে এর অগ্রগতি রোধ করার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ালো ব্যাক-ব্রেস পরা। টিনেজ মেয়েদের জন্য আধুনিক কালের স্ট্রেট জ্যাকেট পছন্দ হলো তার। (গুগলে সার্চ দিলে যেসব ব্যাক-ব্রেসের ছবি দেখতে পাবেন সেগুলা দেখলে এদেরকে মধ্যযুগের নির্যাতন কৌশল যন্ত্র বলে মনে হবে) এই বর্মগুলো ভয়াল দর্শন আর এদের পরে থাকা কঠিন ব্যাপার। মজার ব্যাপার হলো, ২০ বছর পরও স্কলিওসিসের চিকিৎসা এখনও রয়ে গেছে ব্যাক-ব্রেস নয়তো সার্জারিতে ।

 

মেয়েটি যে ব্রেসটি পরেছিলো সেটি ছিলো প্লাস্টিক নির্মিত। শক্ত প্লাস্টিক যা বুক থেকে কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনটি বিশাল ভেলক্লো স্ট্যাপ শক্ত করে বেঁধে রাখলো ব্রেসকে যাতে ভেতরের প্রেশার প্যাডগুলো এদের কাজ করে যেতে পারে, যেসব পেশী ও সফলন বাঁককে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে এদের সংকুচিত করে রাখে। ব্রেসের কিনারগুলো ঢেকে কোন পোষাক পরিধান করা হয়ে উঠলো দুঃসাধ্য। কি পরবে, কোন পোষাক পরবে এ ব্যাপারে ভাবতে ভাবতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অঝোর ধারায় কেঁদে ফেলেছে মেয়েটি কতবার।

দিনে ষোল ঘন্টা এই কঠিনবর্ম পরে থাকলো টানা দুবছর। সেই দুবছরের সময়গুলো একজন চাপা স্বভাবের অথচ সক্রিয় টিনএজারের জন্য ছিলো রাতের দুঃস্বপ্নের স্মৃতির মত। মেয়েটি ঘরের বাইরে খেলাধুলা করতে ভালোবাসতো। চিকিৎসার পুরো সময় যে সব ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে ছিল এরা সবাই পুরুষ ডাক্তার। বয়ঃসন্ধিকালে শক্ত প্লাস্টিকের চাপে সে নিদারুণ যন্ত্রণায় অবিরাম অস্থির হয়ে পড়তো। ডাক্তারের সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট করে শরীর উপযোগী ব্যাক-ব্রেসের মাপ নেয়া হল।

 

রাতে ঘুমানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পাশ ফিরে শুলে প্রেশার প্যাডগুলো চেপে বসতো শরীরে, শরীর থেতলে যেতো। চিৎ হয়ে শুলে ব্রেসের উপর দিক চেপে বসতো গলায়। উপুড় হয়ে শুলে ব্রেসের সম্মুখভাগ চামড়া চেপে ধরতো, চিমটে ধরতো। ঘামে ভিজে যেতো সারা শরীর। ধীরে ধীরে বাঁকটি ৪৮ ডিগ্রী ঘুরে এলে ডাক্তার সার্জারি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কটি দেশের হাড় এবং স্টিল রড ব্যবহার করে তার শিরদাঁড়াকে একীভূত করা হবে। সজোরে এ সার্জারি করতে অস্বীকার করলো সে। ব্রেস পরার সময়কালে তার শরীর আর বাড়লো না। তাই শিরদাঁড়ার বক্রতার পরিণতি শোচনীয় হলো না। পঙ্গুত্ব, বিকৃত শরীর না পাওয়াতে তার নিজেকে মনে হলো ঈশ্বরের আশীর্বাদ। একটি কটিদেশ অন্যটির চেয়ে উঁচু; যখন সেই মেয়েটি বেদিং স্যুট পরে তখন তার পেছন দিকে যে অদ্ভুত কিছু হয়েছে বা ছিল তা বেশ বোঝা যেতো। কিন্তু স্কলিওসিস রোগী অনেক মেয়ের এর চেয়েও করুণ দশা হয়।

 

ব্যাক-ব্রেস পরার জন্য তিনটি ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে সে। দুটো পিঠে এবং একটি পেটে। কিন্তু স্কলিওসিস তার মনে এর চেয়েও বড় ক্ষত রেখে গেছে। একজন কিশোরীর জন্য এটি যে কত নিদারুণ যন্ত্রণার বিষয় তা বলে বোঝাবে কী করে সে? ব্রেস পরে শান্ত, সুন্দর থাকা অসম্ভব। তবুও সবার প্রিয় হতে, স্মার্ট ও সুন্দরী হতে কত না ইচ্ছে জাগে মনে। জীবনের এই নাজুক, ভঙ্গুর দিনগুলোতে আত্মমর্যাদা হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হয় নয়তো উঠে যায়, অনুকূল দৃষ্টি পায় না। নিজের মনে শূন্যতা, নিরাপত্তার অভাব বোধ করে সে। তার এটি ভাবতে ভয় হয় যে, আজকালও এরকম সমস্যায় জর্জরিত মেয়েরা ২০ বছর আগের মত ভেলবো বন্ধনীই পরবে।

 

এই সব বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে গেলেও তখন তার পাশে ছিলেন তার মা বাবা। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রতিটি ধাপে তারা তাঁদের সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য করেছিলেন যা স্মরণীয় তার জন্য। ডাক্তারের সাথে প্রতিটি ভিজিটে তার সঙ্গী ছিলেন তার মা, ডাক্তারের অফিসের যাওয়ার পথে সে মাকে কেঁদে কেটে, তীব্র চীৎকার করে অভিশাপ দিতে দিতে গেলেও, মা কিছুটি বলতেন না। তার ভেতরে এত ক্রোধ, এত দুঃখ, এত কষ্ট, এত বেদনা ছিল- এই ব্রেস পরার যে কষ্ট ছিলো তা না পারতো ডাক্তারকে বলতে না অন্য কাউকে। নির্বিকার ডাক্তার এই কিশোরীর মনোবেদনায় সহানুভূতি জানাবার প্রয়োজন বোধ করতেন না। ভেতরের সব দুঃখ উপচে পড়তো জন্মদাত্রী মায়ের ওপর।

 

এই কাহিনী মেয়েটি অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়ার কারণ হলো কোন কিশোরী যদি অনুরূপ পরিস্থিতিতে পড়েন তাহলে তার মা-বাবা ও প্রিয়জন ও বন্ধু যারা সাহায্য করতে পারবেন তাদের মনের মাঝে গভীরতর উপলব্ধি জাগ্রত করা। এমন কিশোরীকে দিতে হবে কেবল উৎসাহ। তাদেরকে কাপড়ের দোকানে নিয়ে যাবেন, তাদের জন্য কিনবেন সুন্দর সুন্দর পোশাক যা তাদের ব্রেসকে আবৃত করে রাখবে। যেসব বিষয়ে তার আবেগ অনেক  বেশি সেসব বিষয়ে সমবেদনার সাথে আলোচনা করা, তাকে স্বস্তি দেয়া বড় জরুরী। নীরব থাকবেন না, ভান করবেন যে ব্যথা নেই, ব্যথার অস্তিত্ব নেই। ব্রেসকে নিয়ে কোনও কৌতুক বা ঠাট্টা করবেন না।

 

সেই মেয়েটি এখন মহিলা। সে নিয়মিত যায় চিরো প্রাকটরের কাছে (Chiropractor  – A health care professional focused on the diagnosis and treatment of neuromuscular disorders, with emphasis on manual adjustment & manipulation of the spine)| ।  প্রতি দুসপ্তায় একদিন, এডজাস্টমেন্ট ও থেরাপিউটিক ম্যাসেজের জন্য পিঠ, কোমর ও গ্রীবাদেশ সমস্যা মোকাবেলায় যা অত্যন্ত উপকারী। এতে সে মাঝে মাঝে ভালো থাকে। সপ্তাহ খানেক পর আবার থেরাপির সময় তার ঘুমন্ত ব্যথা জেগে ওঠে।

 

স্কলিওসিসের জন্য তার সীমাবদ্ধতা হয়তো কম, কিন্তু সব সময় সে তার সমস্যাটি অনুভব করে। সে এখনো আশা করে যে ২০ বছর আগের চিকিৎসাবস্থার উন্নতি হবে কোন একদিন। তার মত ১২ বছরের কিশোরীরা সহজ সুচিকিৎসা পাবে, শারীরিক যন্ত্রণা লাঘব হবে, স্বস্তি পাবে তারা। ততদিন মা-বাবাই তাদের একমাত্র ভরসা এবং বন্ধু-প্রিয়জনদের সহানুভূতি-দরদই প্রশান্তির প্রলেপ। তার কামনা এ দুর্দিনের শেষ হবেই হবে।

 

লেখকঃ পরিচালক

লেবোরেটরি সার্ভিসেস

বারডেম