অধিকারভিত্তিক কর্মসূচীতে ন্যায্যতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ওয়াটারএইডের পদক্ষেপ

68

 

ওয়াটারএইডের বিশ্বাস সহায়ক শক্তি হিসেবে তার কাজগুলো সমাজের বঞ্চিত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। একইসাথে তাদের জবাবদিহিতা এবং সাড়া দেয়াকে প্রভাবিত করবে। এ লক্ষ্যে ওয়াটারএইড সুনির্দিষ্ট কিছু কাজকে চিহ্নিত করে। যেমনঃ বর্তমানে যারা নির্দিষ্ট পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সাথে কাজ করছে অথবা যারা এ বিষয়ে সম্ভাবনাময় অংশীদার তাদের সাথে দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং বর্তমান কার্যকর্মে তাদের সুযোগ তৈরি করে দেয়া। মূলধারায় ন্যায্যতার ভিত্তিতে অধিকার আদায় এবং অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে কোন বিশেষ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করা, যেখানে নির্দিষ্ট ধরণের প্রান্তিক বা বঞ্চণার শিকার কোন জনগোষ্ঠীর জন্য

পোভারটি পকেট ম্যাপিং করা যাবে।

 

অধিকারভিত্তিক এপ্রোচগুলো সম্পর্কে আত্নপোলব্ধি তৈরিঃ

শহর ও গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানি এবং স্যানিটেশন অধিকার স¤পর্কে ধারণা কি এবং অধিকার শব্দটিকে আমাদের কাজের ক্ষেত্রে আমরা কিভাব ব্যাখ্যা করছি, সে বিষয়ে নিজেদের পরিষ্কার উপলব্ধি থাকা দরকার। শহর ও গ্রামাঞ্চলের যথাযথ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে একটি কার্যকর দারিদ্রবান্ধব কর্মকৌশল বা নীতিমালা প্রনয়ণে এ উপলব্ধি আমাদের ভূমিকা বা কর্মকৌশল নির্ধারনে অনেক বেশি সহায়ক হবে।

 

অধিকারভিত্তিক শব্দচয়ন বা ভাষার সুস্পষ্ট ও যথাযথ ব্যবহারঃ

কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৌশলগত কারণেই অধিকার কিংবা অধিকারভিত্তিক শব্দ বা ভাষার যথাযথ ব্যবহার করা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, স্বৈরাচার শাসিত, যুদ্ধ বিধধস্ত এবং সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতিতে রয়েছে এমন দেশসমুহে যেখানে অধিকারের বিষয়টি রাষ্ট্র দ্বারা কখনোই সুরক্ষিত নয়, সেখানে পানি এবং স্যানিটেশন অধিকারের কথা উন্মুক্তভাবে বলতে গেলে অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে। এ ধরণের অবস্থায় সরাসরি অধিকারের কথা না বলে, সামাজিক ন্যায্যতা এবং সকলের অন্তর্ভুক্তির কথা জোরালোভাবে বলা যেতে পারে, যা প্রকারন্তে একই ফলাফল

বয়ে আনবে। ভাল কিছু ফলাফল অর্জনের জন্য ওয়াটারএইড তার ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্কে ভাষার কৌশলগত প্রয়োগের এমন কিছু দিক গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছে।

 

অংশীদার খুঁজে নেয়াঃ অন্যদের প্রভাবিত করা, অন্যদের থেকে শেখা এবং একসাথে প্রভাবিত হওয়া ওয়াটারএইড সমন্বিতভাবে তার সকল অংশীদারদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে, যেন তারা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে আরো বেশী ইনক্লুসিভ ও দায়িত্বশীল হতে পারে। পাশাপাশি বর্তমান অংশীদারদের মধ্যে যারা ইতোমধ্যেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাথে কাজ করে দক্ষতা অর্জন করেছে, তাদের কাছ থেকে শিখতে এবং নতুন আর কোন সংস্থার সাথে অংশীদার হয়ে কাজ করা যায়, সে ধরণের প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছে। অন্যান্য সংস্থা যাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পানি এবং স্যানিটেশন অধিকারের কথা জোরালোভাবে জানানোর ক্ষমতা আছে, ওয়াটারএইড তাদের সাথে আরও নিবিড়ভাবে স¤পৃক্ত হয়ে কাজ করতে চায়। এধরণের সংস্থা তা স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক কিংবা আন্তর্জাতিক যে কোন পর্যায়েরই হতে পারে। বর্তমানে ওয়াটারএইড এর সহায়তায় প্রায় সব অঞ্চলেই গণমাধ্যমকে সাথে নিয়ে যে কাজগুলো করা হচ্ছে তা অনেকটাই এক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রাখছে।

 

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্যে কাজ করা মানেই অতিরিক্ত ব্যয় নয়, বরং তা অনেকটাই ব্যয় সাশ্রয়ী অথবা অন্যান্য ব্যয়ের সম্পৃরক

ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্কটি বাস্তবায়নকালেও যেন এর সাথে অতিরিক্ত ব্যয়ের ভার না চাপে। শুরুতেই সুষ্ঠু পরিকল্পনা করা হলে সকলের অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্যয়ের কোন প্রয়োজনই নেই, বরং সকলের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পারলে তা থেকে আরও অনেক বেশি মানুষ সুবিধা পেতে পারে। অতিরিক্ত ব্যয়ের অনেকগুলোই ছোট পরিসরের, আবার অনেক বড় ধরনের খরচও রয়েছে। এসব ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত হলোঃ ওয়াটারএইড এর সকল অফিসসমূহ সকলের জন্য অভিগম্য করা, যাদের বিশেষ ধরনের চাহিদা রয়েছে, তাদের অতিরিক্ত সহায়তাদানের জন্য মিটিং এবং প্রশিক্ষণকালীন বাজেট বরাদ্দ, ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তি কার্যμমে জড়িত সকলকর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রান্তিক ও দূর্গম

 

অঞ্চলের জন্য অপারেশন ব্যয় বৃদ্ধি করা এবং বিভিন্ন সভা ও গবেষণামূলক কাজের জন্য পর্যাপ্ত সময় ও বাজেট বরাদ্দ রাখা। তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সহজগম্য এলাকার চাইতে দূর্গম এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে গেলে মাথাপিছু ব্যয়ের পরিমাণ বাড়বেই। যেটা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক। এক্ষেত্রে সেসব মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য আমাদেরকে অবশ্যই কোন সৃজনশীল উপায়ের আশ্রয় নিতে হবে। তবে, আমাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হওয়া উচিত সরকার এবং দাতাগোষ্ঠীর কাজে এবং কৌশলপত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পানি এবং স্যানিটেশন অধিকারের বিষয়টি যাতে সম্পৃক্ত হয়, সে ব্যাপারে তাদের প্রভাবিত করা।

 

ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তির পথ থেকে ওয়াটারএইডের লক্ষ্য যেন দূরে সরে না যায় তা নিশ্চিত করাঃ

২০১৫ সালের মধ্যে ২৫ মিলিয়ন মানুষের জন্য (যাদের মধ্যে দরিদ্র এবং অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা অধিক) -এর সেবা নিশ্চিত করতে ওয়াটারএইড যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য স্থির করেছে তা যেন অর্জিত হয়, এ লক্ষ্যে অপেক্ষাকৃত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উৎসাহিত করা হয়ে থাকে। তাই বলে দুর্গম স্থানে বসবাসরত দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যারা স্বল্পবসতিপূর্ণ এলাকাতে বসবাস করছে, তারা যেন এ সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্যও তদারকি অব্যহত রাখা দরকার। একই নীতি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন দেশ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

 

সম্পদ এবং অবকাঠামোঃ

ওয়াটারএইড এর প্রতিটি অংশে যেন ন্যায্যতা এবং সকলের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় তার জন্য সবচেয়ে ভাল উপায়টি খুজে বের করা দরকার। এজন্য প্রয়োজন সময় এবং সঠিক নেতৃত্ব। বিভিড়ব দেশে ওয়াটারএইড বিভিনড়ব ধরনের পন্থা অবলম্বন করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে শুধুমাত্র ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণের জন্য একটি উপ-কর্মসূচি রয়েছে। অথচ, অন্যান্য দেশে ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা একজন চ্যা¤িপয়ন বা ফোকাল পার্সনের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এই ক্ষেত্রটিরও আরো উনড়বয়ন প্রয়োজন আছে।

 

পরিবীক্ষণ ও মুল্যায়নঃ

কর্মসূচি বাস্তবায়নের সময়টাতেই এমন ধরনের উপযোগী পরিবীক্ষণ ও মুল্যায়ন সিস্টেম থাকা দরকার, যাতে করে লিঙ্গ, বয়স, দারিদ্র এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রতিবন্ধকতা স¤পর্কিত তথ্যসমূহ, জাতীয় এবং বিভিনড়ব স্তরে প্রান্তিকতার মান, দারিদ্র ও এলাকাভিত্তিক অন্যান্য গুণগত উপাত্তগুলো আলাদা আলাদা করে দেখা যায়। যদি যথাযথ এর অধীন কোন ক্ষেত্রে এসব তথ্য পাওয়া না যায়, বা এর অন্তর্ভুক্ত নাও হয়, তবুও অন্যান্য ক্ষেত্রে পাওয়া তথ্যগুলোকে এরজন্য ব্যবহারোপযোগী করে নেয়া যেতে পারে। অতীত কার্যক্রম পর্যালোচনা করে ওয়াটারএইডের নিজস্ব কার্যক্রম কিভাবে প্রান্তিক এবং তৃণমূল পর্যায়ের মানুষকে উপকৃত কিংবা বঞ্চিত করছে সে সম্পর্কিত বোধগম্যতা তৈরির জন্যেও এ অভিজ্ঞতা সাহায্য করবে। এসব এমন আকট্য প্রমাণ তুলে ধরবে যা অন্যদেরকেও ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তি ভিত্তিক পন্থার উন্নয়নে প্রভাবিত করবে।

 

ন্যায্যতা, অন্তর্ভুক্তি এবং অধিকার বাস্তবায়নের জন্য যোগাযোগ

ওয়াটারএইডের সমস্ত যোগাযোগ কার্যক্রম এবং বিপণনের লক্ষ্য (যার মধ্যে রয়েছে পরিভাষা, চলচ্চিত্র, ছবি এবং প্রকাশনা) এমন হওয়া উচিত যাতে তা জনগণের প্রাপ্য অধিকারের বিষয়টি সংরক্ষণ করে এবং গতানুগতিক ভাবধারাকে চাপিয়ে না দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, যারা এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত তারা হয়তো চাইবেন না, তাদের ছবি কিংবা তথ্যাদি জনসম্মুখে প্রকাশিত হোক। এখানে প্রকাশিত ছবির ক্যাপশনে কার্যক্রমের আওতাধীন এবং বৈষম্যের শিকার মানুষদের কথা বলা হবে। যতদূর সম্ভব যোগাযোগের মাধ্যমে যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথাও উঠে আসে সে বিষয়টি সুনিশ্চিত হতে হবে।

 

 

অনুবাদঃ রোকেয়া সামিয়া

অনুলিখন: মাহফুজ-উর রহমান

বর্ণ বিন্যাসে: ক্লেমেন্ট সেরাও