প্রতিবন্ধিতা শণাক্তকরণ জরিপে অবজ্ঞা-অবহেলার সাতকাহন

40

 

ডা. কবির হোসেন শিকদার (খুলনা প্রতিনিধি): 

 

সমাজসেবা অধিদফতরের আওতায় পরিচালিত সারা দেশব্যাপী প্রতিবন্ধিতা শণাক্তকরণ জরিপ’ ২০১৩ এর ১ জুনে শুরু হয় যা ৩১ আগস্ট’১৩ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু জরিপ কাজটি এখনও পূর্ণভাবে শেষ হয়নি। সমাজসেবা ওয়েবসাইট সূত্রমতে, সারা দেশে শনাক্তকরণ হয়েছে মাত্র ১%। দেশের বেশিরভাগ এলাকায় ভালোভাবে কোন প্রচার-প্রচারণা হয়নি। ফলে অধিকাংশ মানুষ কিছুই জানেন না। এতে জরিপের উদ্দেশ্যটি ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং দেশের বৃহৎ এই জনগোষ্ঠী বঞ্চিত থেকে যাবে বলে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

 

আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ও উন্নয়ন কর্মী হিসেবে জরিপ কার্যক্রমের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলাম। কাজ করতে গিয়ে আমার এলাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানের যা জেনেছি তার বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

 

প্রধান সমস্যাগুলো হচ্ছে……

১) জরিপ কার্যে দক্ষ জনবলের অভাব,

২) মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য মাঠকর্মীগণের প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব,

৩) দুর্বল প্রচার-প্রচারণার ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অভিভাবকদের অসচেতনতা ও হীনমন্যতা।

 

খুলনার অধিকাংশ মানুষের মতে, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় এবং এলাকায় এলাকায় মাইকিং এবং বিভিন্ন স্টেশন (যেমন- ট্রেন, বাস ও নৌ স্টেশনগুলিতে হ্যান্ডবিল, লিফলেট বিতরণ ও পোস্টারিং করা), পাশাপাশি এলাকার মসজিদে মসজিদে নিয়মিত মাইকিং ও মসজিদের ইমাম সাহেবরা জুম্মা’র নামাজে পরপর কয়েক সপ্তাহ ঘোষণা দিলে জরিপের অবস্থা এমন দুর্বল হত না এবং সঠিকভাবে শনাক্তকরণের তথ্য বেরিয়ে আসত। এতে করে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সঠিক জরিপ হত।

 

জরিপে অংশগ্রহণকারী মাঠকর্মী, যারা প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক জ্ঞানে দুর্বল তাদের অধিকাংশই বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপের তথ্য সংগ্রহ করেন নি। কিছু ক্ষেত্রে এমন হয়েছে, এলাকার কোন ব্যক্তির কাছে অথবা কোন বাড়িতে গিয়ে বা কোন গ্রাম চৌকিদার, এলাকার মানুষের মুখে শুনে একস্থানে বসেই এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করেছেন। এর কারণে যেমন অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ বাদ পড়ে গেছে। আবার প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক জ্ঞানের পর্যাপ্ত অভাবের পাশাপাশি প্রতিবন্ধিতার ধরণ সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকেই তারা জরিপ থেকে বাদ দিয়েছেন। আমার এলাকার কিছু ব্যক্তিকে আমার চোখের সামনেই বাদ দেয়া হয়েছে। ছায়েরা খাতুন এক চোখে দেখতে পান না। দায়িত্বপ্রাপ্ত মাঠকর্মী বলেছেন, তিনি প্রতিবন্ধী নন, তার ফরম পূরণ হবে না। মোসলেমের জন্ম থেকে একটি পা ছোট ও চিকন। তিনি ভালভাবে হাঁটতে ও কাজ করতে পারেন না। তাকে এবং মোঃ ইসলাম নামের অপর এক ব্যক্তি, যার দুই হাতের মাংসপেশী খুবই দুর্বল, কোন শক্তি পান না। তাদের এবং এমন অনেককেই সমাজসেবা অধিদফতরের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে প্রতিবন্ধিতা শনাক্ত করলেও জরিপের অন্তর্ভুক্ত ডাক্তার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত না করায় তাদের জরিপে অন্তর্ভুক্ত করেন নি।

 

 

আমি নিজে একজন ডাক্তার তা জেনে এলাকার অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উল্লেখিত অভিযোগ আনেন আমার কাছে। সমাজসেবা অধিদফতরের মাঠকর্মী এবং ডাক্তারদের এ নিয়ে বলতে গেলে তারা ব্যাঙ্গাÍক কিছু কথা বলেন এবং দুর্ব্যবহারও করেন আমার সাথে। এমনও কটুক্তি আসে, আপনি কিসের ডাক্তার! জরিপে নিযুক্ত ডাক্তার মাস্টার্স পাশ ও ফিজিওথেরাপিতে স্পেশালিস্ট, আপনার কি জ্ঞান আছে!!

 

 

আমি এতটাই বিস্মিত কিছুই বলার ভাষা পেলাম না। ডাক্তারি পেশায় নিযুক্ত আছি দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি। বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে সারা দেশের প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলোর সাথে কাজ করছি। পাশাপাশি ২০০৬ সাল থেকে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করি। যা হোক, পরবর্তীতে উপায়ান্ত না দেখে সমাজসেবা অধিদফতরের স্পেশালাইজড ডাক্তার (এম,বি,বি,এস) কর্তৃক লিখে দেয়া প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণের প্রেসক্রিপশন দেখানোর পরেও জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নাই তাদের। আমিও নাছোড়বান্দার মত কয়েকজন নিয়ে লাগাতার কয়েকবার যাই। বারেবারে ডাক্তারকে বলে, পরীক্ষা করিয়ে অনেকটা জোর করেই স্বল্প সংখ্যককে অন্তর্ভুক্ত করাতে সমর্থ হই।

 

জানা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষও এই মতামত প্রকাশ করেন অসংখ্য প্রতিবন্ধী মানুষ বাদ পড়েছেন। একইভাবেই কাউকে জরিপের পর বাদ দেয়া হয়েছে আবার কাউকে অন্তর্ভুক্তই করা হয়নি। অনেকেই বলেছেন, মাঠকর্মীদের দুর্ব্যবহারের কথা। গাজী ফাহাদ নামে এক প্রতিবন্ধী কিশোরের মা জানিয়েছেন, তিনি তার ছেলেকে নিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে তাদের দুর্ব্যবহারের কারণে রাগ করে চলে আসেন। পরবর্তীতে বাদ পড়া লোকদের ডাকা হলে তিনি অভিযোগ করেন তাকে অপমান করা হয়েছে। আমি নিজে অনেক বুঝিয়েও ছবি তুলতে রাজী করাতে পারি নি তাকে। অনেকে আছেন নানান প্রতিবন্ধকতার কারণে ঘরের বাইরে গিয়ে ছবি তুলতে অক্ষম যাদের বাসায় গিয়ে ডাক্তারী পরীক্ষা ও ছবি তোলা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অনেক অনুরোধ করেও ডাক্তার ও ফটোগ্রাফারকে  সেসব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যায়নি।

 

অনেক ক্ষেত্রে মাঠকর্মীরা অসম্পূর্ণ ফর্ম পূরণ করে এনেছেন। যেমন- অস¤পূর্ণ ঠিকানা (কোথাও ঠিকানা নেই), মোবাইল নাম্বার ভুল (ডিজিট কম) ইত্যাদি। পরবর্তীতে এ সমস্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। সমাজসেবা অধিদফতর কর্তৃক যেসব মাঠকর্মীদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা আবার নিজেরা পরিশ্রম না করে স্বল্প মূল্যে দৈনিক হাজিরার চুক্তির ভিত্তিতে ভাড়া করা লোক দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করিয়েছে।

 

জরিপ কার্যক্রম অসফল হবার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, প্রতিবন্ধী মানুষের অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব, হীনমন্যতা ও নিরুৎসাহ। সরকারও জরিপ কাজের উদ্দেশ্য স¤পর্কে দেশের মানুষকে সঠিকভাবে জানাতে ব্যর্থ বিধায় অধিকাংশই নিরুৎসাহিত কিংবা এর গুরুত্ব বুঝতে অসমর্থ ছিলেন। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন অটো চালক রুবেল; তার অটোরিক্সায় খুলনা থেকে খালিশপুর যাচ্ছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, প্রতিবন্ধিতা শণাক্তকরণ জরিপে অংশগ্রহণ করেছে কিনা? জানালো, আমার ওসবে দরকার নাই। দিনমজুর মানুষ। কাজ করব, খাব। সুলতান নামের আরেক শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরও একি কথা, সাহায্য-সহযোগিতার দরকার নেই। কাজ করবে, ভাত খাবে, ওসব ঝামেলায় যেতে চায় না। দেশের নাগরিক হিসেবে এ জরিপে অংশগ্রহণের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করলাম। আমার কথায় কাজ হল না। যা বুঝলাম জরিপের গুরুত্ব বোঝাতে ব্যাপক প্রচারণার দরকার ছিল। আবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিভাবকদের জরিপের তথ্য অনুযায়ী পরবর্তীতে ছবি তোলা ও ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য ফোন বা ঠিকানা অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডাকলে বেশির ভাগের মাঝেই কাজের ব্যস্ততা, বাসায় না থাকা, ভুলে যাওয়া বা আনা নেয়া সমস্যা ইত্যাদি নানান অজুহাতে এড়িয়ে যাবার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বাসায় গিয়ে তাদের নিয়ে যেতে চাইলে অনেক অভিভাবক বিব্রত বিরক্ত হন। কেউ বাসায় নেই বলে খোঁজাখুঁজির নামে কালক্ষেপন করেন। তদুপরি অনেক অভিভাবকরা তাদের সন্তান বা আত্মীয়কে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বলে স্বীকার করতে চান না। আমি নিজে সরেজমিনে একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের বাড়িতে যাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছে জেনে। সেখানে সত্যিই তিন জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছিলেন। আমরা তাদের জরিপে অন্তর্ভুক্ত করানোর উদ্দেশ্যে অনেক বুঝালাম কিন্তু কোন ফল হল না।

 

জরিপ শুরু হওয়ার পর সারা দেশের যে স্থানেই গিয়েছি, সর্বত্রই আলাপ করেছি, ভাই, আপা, চাচা, চাচী, আপনারা কি প্রতিবন্ধিতা শণাক্তকরণ জরিপ’১৩ এ অংশগ্রহণ করেছেন? তারা বলেন, সেটা আবার কি? এদের বেশির ভাগই তৃণমূল পর্যায়, ছিন্নমূল ও ভ্রাম্যমান যার শতকরা ৮০(%) ভাগ লোক জানিয়েছেন তারা জরিপের কিছুই জানেন না।

 

প্রতিবন্ধী মানুষের মাঝে শিক্ষিত অভিভাবকদের মতামত হল, জাতীয় পর্যায়ে কোন কাজ করতে হলে সমাজের সকলেরই আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। শুধু সরকার সচেতন হবে কিন্তু জনগণ সচেতন হবে না আবার জনগণ সচেতন হবে কিন্তু সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারির আন্তরিকতার অভাব থাকবে, এভাবে কোন প্রচেষ্টা সফল হয় না। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এ কার্যক্রম প্রকৃতভাবে সফল হবার সম্ভাবনা রয়েছে।