কচ্ছপের গতিতে নতুন বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)

48

ছবিঃ শিহাব উল ইসলাম

 

সগির হোসেন খান 

আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব প্রবেশগম্যতা মানেই কোন ভাবে একটি র‌্যাম্প। যা আমাদের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কোন ভূমিকাই রাখতে পারে না। অথচ সরকার এ সমস্যাকে আইনে এবং বিভিন্ন নীতিমালায় গুরুত্ব সহকারে চিহ্নিত করেছে। এটি নিশ্চিতে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধারা।

 

এদেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার অংশ নিয়ে প্রথম কাজ শুরু হয় মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৬ (খসড়া) থেকে। এর আগে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতা সংক্রান্ত আইন বা বিধিমালা তৈরির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তেমন তাগিদ অনুভব হয় নি কারো মাঝে। এরপর ভৌত অবকাঠামোতে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রস্তুত করা হয় মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮। এর ৭ম অধ্যায়ের ৬৪ নং ধারায় সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতে করণীয় উল্লেখ করে যে বিষয়গুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা হল লিফট, র‌্যাম্প, দরজা, রেলিং, টয়লেট, গাড়ি রাখার স্থান সহ অন্যান্য স্থানসমূহ যা দেশের সকল নাগরিকেরা নিয়মিত ব্যবহার করেন। এর সঠিক মাপসহ করণীয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে পরিশিষ্ট এর ২ নং সাধারণ নিয়মে। শুধু ধারাই অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি সাথে এই বিধান মেনে না চললে কঠোর শাস্তির সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। একই নীতিমালার আলোকে দেশের অন্যান্য মহানগর ইমারত বিধিমালাও সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে উপযুক্ত।

 

২০০৮-২০১৫, প্রায় সাত বছরের বেশি হতে চললো। এতদিনেও বিধিমালা ২০০৮ হালনাগাদ হয় নি। নিয়ম অনুযায়ী দুই বছর পরপর এটি হালনাগাদ করা হয়। বিধিমালা ২০০৬ খসড়া যা ২০০৮ এ পাশ হয়, তার আগে ১৯৯৩ তে আইন প্রণীত হয়েছিল প্রথম। পৃথিবীর কোন দেশেই এত দেরিতে ইমারত নির্মাণ বিধি হালনাগাদের কাজ হয় না। একে তো অনেক দেরি তার ওপর সর্বশেষ ২০১১ থেকে নতুন করে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) এর খসড়া হালনাগাদের কাজ শুরু হলেও তা চলছে কচ্ছপের গতিতে। সর্বশেষ জানা যায়, বিভিন্ন দিক ঘুরে বিএনবিসি যায় বুয়েটের কাছে। তারাও দীর্ঘদিন এ নিয়ে কাজ করার পর ২০১৪ সালে এটি পৌঁছে হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিটিউটে (এইচবিআরআই)। তাদের আরও সংযোজনের পরই মন্ত্রণালয়ে জমা হবার কথা কিন্তু সেও বছর গড়াতে চললো প্রায়। ফলাফল বিএনবিসি (খসড়া) আজ অবধি কার্যকরী হয় নি।

 

এ বিষয়ে এইচবিআরআইতে যোগাযোগ করা হলে গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুস সালাম বলেন, নতুন আইনে বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষের কথা ভেবেই Universal Accessibility অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

চুড়ান্তকরণ প্রসঙ্গে জানান, আইনটিতে বিভিন্ন সুপারিশ দেয়ার কারণে বেশ বড় হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে একে নিখুঁত করার প্রক্রিয়া চলছে। আশা করছি চলতি বছরের জুন-জুলাই নাগাদ মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করতে পারবো আমরা।

 

পুরাতন ভবন সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিধিমালায় সাধারণত পুরাতন ভবনের বিষয়ে উল্লেখ থাকে না। ফলে যে দিকনির্দেশনা দেয়া থাকে তার আলোকেই পুরাতন ভবনগুলো সংস্কার করা হবে। তবে এ বিষয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোকে আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে পরামর্শ প্রদান করেন তিনি।

পূর্বে জাতীয় ইমারত বিধিমালা ২০০৮ এ কোন মনিটরিং কমিটি ছিল না। রাজউক এর তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিস, সিভিল এভিয়েশন, আইএলও এই ব্যবস্থাপনাগুলো নজরদারির দায়িত্ব পেলেও এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কোন উদ্যোগ ছিল বলে জানা নেই।

 

অবস্থার প্রেক্ষাপটে নীতিমালা এবং আইনের সাথে বাস্তবতার কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। আইন-বিধিমালা সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকে, শাস্তির জন্য নানান ধারা থাকে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। এই দেশের নাগরিক হয়েও সর্বত্র স্বাধীন চলাচল থেকে বঞ্চিত হচ্ছি আমরা। এটাই বাস্তবতা! এইভাবেই চলছে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন।

সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, বিধিমালা বা নীতিমালা কিংবা আইন বাস্তবায়ন না হওয়ার বড় কারণ হল নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকা। যার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের পক্ষে শহরের সব ভবন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব যদি নাও হয় অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো যেমন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল, সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠান, গণস্থাপনাগুলো কঠোর পর্যবেক্ষণ এর আওতায় আনা গেলে তা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব করা খুবই সহজ হবে।

 

ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট বাংলাদেশ (আইএবি) এর সভাপতি আবু সাঈদ এম আহমেদ বলেন, ন্যাশানাল বিল্ডিং কোড গেজেট আকারে পার্লামেন্টে আইন করা হয়েছিল ১৯৯৩ তে। ২০১৪ (খসড়া) আইন হিসেবে প্রণয়নের চিন্তা হচ্ছিল যার একটি ভাল দিক হল, শুধু মূল অংশটি আইন তৈরি হবে যাতে এর সংজ্ঞা বাস্তবায়ন কমিটি স¤পর্কে বিস্তারিত রেখে বাকিটা নিয়মিত হালনাগাদ হতে থাকবে। আসলে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ এ সর্বজনীন প্রবেশগম্যতার অংশে শুধুমাত্র শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয় এবং যেহেতু এটি আইন নয় তাই মেনে চলার ক্ষেত্রেও তেমন কোন বাধ্যবাধকতা অনেকের কাছেই ছিল না। তবে এবার নতুন বিএনবিসি আইন প্রণয়ন হয়ে গেলে এটি মেনে চলতেও সকলে বাধ্য থাকবে। তাছাড়া এর অন্য ভাল দিক হল শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের পাশাপাশি এতে ক্ষীণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ এবং শ্রবণ-বাক প্রতিবন্ধী মানুষের সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নকশাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

তার কাছে আরও জানা যায়, ন্যাশানাল বিল্ডিং কোড পুরো বাংলাদেশের জন্য। আর বিধিমালা একটি শহরের জন্য, যেমন; ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা। এভাবে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ইত্যাদি প্রতিটা মহানগরই মূলটার আদলে নিজেদের জন্য বিশেষ নির্দেশনায় তৈরি করে নেয়া।

মনিটরিং ব্যবস্থা ও নতুন বিএনবিসি সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জেবুন নাসরিন আহমেদ বলেন, আগে সূচীপত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উল্লেখ ছিল। বর্তমানে যা ধারাগুলোর সাথে যুক্ত করে দেয়া হচ্ছে যাতে তা দ্বিধার তৈরি না করে। আর আইন মনিটরিং করে সাধারণত রাজউক, পৌরসভা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান। স্থাপনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব প্রবেশগম্যতা ব্যবস্থা বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ধারণা আছে বলে মনে হয় না। তাই করণীয় সম্পর্কে ধারণা দিতে প্রয়োজন তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের। তাছাড়া ইমারত বিধিমালায় নতুন ভবন তৈরির সময় করণীয় সম্পর্কে উল্লেখ থাকলেও পুরাতন ভবনের ক্ষেত্রে কিছুই বলা নেই। এভাবেই নীতিমালাগুলোতে ফাঁক রয়ে যায়। তবে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হলে বুয়েট সহযোগিতা দেবে বলে আশ্বাস প্রদান করেন তিনি।

 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব মোঃ শহীদ উল্লাহ খন্দকার বলেন, সরকারি বিভিন্ন ভবনের নকশা পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (পিডব্লিউডি) থেকে প্রস্তুত করা হয়। সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষের সুযোগ সুবিধাসমূহ উল্লেখ থাকলে আমাদের পর্যবেক্ষণ কাজে সুবিধা হয়। তার মতে, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন এবং আর্কিটেকচারাল ডিজাইন এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের বিষয়ে জোর দেওয়া উচিত। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইএমইডি মনিটরিং এর সময় যদি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা সংক্রান্ত সমস্ত কিছু নকশায় থাকে তাহলে বিষয়টির উপর জোর দেয়া যায় নতুবা আমাদের কিছুই করার থাকে না।

 

প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে এলোকেশন অব বিজনেস ঠিক করে দেয়া আছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়েই যদি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানগুলোই যদি তাদের কর্মপরিকল্পনায় প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদা মাথায় রেখে দেশের উন্নয়নে কার্যক্রম চালিয়ে যায়, বিশেষত প্রবেশগম্যতার বিষয়ে তাহলে সেদিন দূরে নয় যেদিন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব স্বদেশের দেখা পাবো আমরা। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়ে মন্ত্রণালয় ভিত্তিক বরাদ্দ গুরুত্ব পায় না উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে। আর যখনই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তাদের চাহিদাগুলো নিশ্চিত করতে বলা হয় তখনই তারা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতি দিকনির্দেশ করে দেন যেহেতু প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারের সব বিষয়ই আজও সমাজের কল্যাণ মনে করা হয়। কল্যাণের এই চিন্তাধারা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে আমাদের। সমাজের মূলধারায় সম অধিকার নিশ্চিতের কথা ভেবে কাজ করলে আমাদের বাধামুক্ত স্বাধীন চলাচলের অধিকার অর্জন হবেই একদিন।