নগরপিতার কাছে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা

43

 

সাবরিনা সুলতানা

 

কল্পনা করুন, একদিন ঘুম ভেঙে আবিষ্কার করলেন আপনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছেন না। পরীক্ষা নিরীক্ষায় জানা গেল আপনি চিরতরে চলন ক্ষমতা হারিয়েছেন।  হুইলচেয়ারে বসেই যাপন করতে হবে বাকি জীবন। অথবা আচমকাই চোখের দৃষ্টি শক্তি বা শ্রবণ শক্তি হারিয়েছেন। দেখতে পাচ্ছেন না। শুনতে কিম্বা বলতেও পারছেন না। পারছেন না যত্রতত্র নিজের ইচ্ছে মতন হেঁটে বেড়াতে। তা বলে কি জীবন থেমে যাবে?!!

 

নাহ্! একেবারেই না। হাঁ, হতে পারে, চলাফেরায় অন্যের সহায়তা লাগছে। সেই সাথে আপনার বিচরণের ক্ষেত্রও সীমিত হয়ে আসতে বাধ্য। খুব জরুরি না হলে জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যাওয়া বা গণপরিবহন ব্যবহার এড়াতে চাওয়ার প্রবণতা শুরু হবে আপনার মাঝে। একদিকে হুইলচেয়ার র‌্যাম্পযুক্ত বাসের অভাব। অন্যদিকে এদেশের ভবন বা স্থাপনাগুলোতে অপ্রতুল প্রবেশগম্যতা ব্যবস্থা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি মানুষের সহানুভূতির অভাব তো রয়েছেই। লোকে আপনাকে করুণা করতে কার্পণ্য করবে না, কিন্তু সহায়তা করবে খুব কমই। আপনার সন্তান যদি প্রতিবন্ধী হয়, কয়েক ধাপ সিঁড়িই তার শিক্ষার পথে দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিংবা রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজগুলোও যদি না হয় তার জন্যে সহায়ক! যদি না থাকে ব্রেইল পদ্ধতি বা ইশারা ভাষার ব্যবহার সবখানে।

 

দেশের হাজারো সমস্যার মাঝে প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়ক চাহিদাসম্পন্ন এই ব্যবস্থাগুলো খুব কি অবাস্তব ভেবে উড়িয়ে দেবেন ভাবছেন!

কিন্তু বাস্তবতা আসলেই ভিন্ন! আপনি হয়ত তাদের কথা খুব কমই জানেন, কারণ তাদেরকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ আপনার হয় না। সুযোগ হয় না, কারণ তাদের চলার পথটুকু মসৃণ করার পরিবর্তে চার দেয়ালের গণ্ডিতে তাদের বন্দি রাখতেই অভ্যস্ত এ সমাজ।

 

কেমন দুঃস্বপ্নের মতো শোনাচ্ছে, তাই না? আপনার জন্য যা অবাস্তব তা বিপুল এই জনগোষ্ঠীর জীবনের নির্মম এক দুঃস্বপ্ন। কারণ তাদের নাগরিক অধিকার বঞ্চিত, অবহেলিত। অন্ধকারাচ্ছন্ন কালকুঠুরীতে আবদ্ধ স্বপ্নগুলো ধূলিসাৎ হতে চলেছে শুধুমাত্র আপনাদের অবজ্ঞার কারণেই!

সিঁড়ি যদি হয় আপনার অধিকার তবে কেন র‌্যাম্প/ব্রেইল/ইশারা ভাষা ইত্যাদি বিভিন্ন চাহিদাকে আলাদা করে ভাবা হচ্ছে না তা কি ভেবেছেন একবারও? তারাও সমাজের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে চাহিদাগুলো পূরণ হলে। কিন্তু নীতি নির্ধারনী পর্যায়ের বড় বড় ফাইলে লাল ফিতায় বাক্সবন্দী হয়ে আছে তাদের চাহিদাগুলো। আর নির্বাচনী ইশতেহার বা রাজনৈতিক ইস্যুগুলোতেও বিপুল এই জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা নেই তেমন। দুঃখজনক সত্য দেশের অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই সমস্যাগুলো প্রাধান্য পায় নি সিটি করপোরেশন নির্বাচনী প্রচারণাতেও।

 

বিভিন্ন মত বিনিময় সভা-সমাবেশে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে নিজের শহরকে নিয়ে প্রত্যেকেই যখন স্বপ্নে মাতোয়ারা তখন প্রতিবন্ধী মানুষেরাও স্বপ্ন দেখছে তাদের বাসযোগ্য ব্যবস্থাগুলো নির্মাণে নব নির্বাচিত নগরপিতার দায়িত্বে ঘাটতি থাকবে না। কিন্তু তাদের জানতে হবে। জানাতেও হবে এই দাবী চাহিদাগুলোর কথা। কি তাদের সেই চাহিদাগুলো?

 

  •   সিটি করপোরেশনের সকল উন্নয়ন পরিকল্পনায় (সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিবীক্ষণ ও পর্যালোচনা) প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বান্ধব ব্যবস্থা     নেয়া এবং তাদের সম্পৃক্ত করেই কাজ করার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের সময় এ বিষয়ে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
  •  প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য র‌্যাম্পযুক্ত গণপরিবহন চালু হলে তাদের যাতায়াত আরও বৃদ্ধি পাবে যারা চার দেয়ালে আবদ্ধ হয়ে আছে।
  •  সিটি কর্পোরেশেনের আওতাধীন সকল বাস টার্মিনাল, স্থাপনা বা ভবন সমূহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্য করতে হবে জাতীয় ইমারত বিধিমালা আইন ২০০৮ এর সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা অংশটি মাথায় রেখে।
  •  প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য সমান্তরাল ফুটপাত, তাতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ল্যান্ডমার্ক দিতে হবে এবং ফুটপাতের শুরু ও শেষে (ইমারত বিধি আইন অনুযায়ী) ১২ ইঞ্চির জন্য ১ ইঞ্চি অনুপাতে ঢাল দিতে হবে যেন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী নির্বিঘ্নে ফুটপাতের ওপর দিয়ে চলাচল করতে পারেন।
  •   সিটি কর্পোরেশেন এর সকল উন্নয়ন বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরি।
  •   সকল গণটয়লেট প্রতিবন্ধী নাগরিকের প্রবেশ উপযোগী করে তৈরি বা সংস্কার করা প্রয়োজন।
  •   মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একীভূত শিক্ষা নিশ্চিত করা।
  •   প্রতিবন্ধী নাগরিকদের দ্বারা পরিচালিত সংগঠনগুলোকে (ডিপিও) সহজ উপায়ে সরাসরি অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে ।
  •   নারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণসহ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে।
  •   সর্বোপরি সিটি কর্পোরেশেন এলাকাগুলোকে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের উপযোগি করে গড়ে তুলতে হবে।

 

একদিন পূরণ হবে এই প্রত্যাশায় খুব সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদাগুলো। খুব কঠিন কিছু নয়, অথচ যার বাস্তবায়ন হলে প্রতিবন্ধী মানুষেরা নির্বিঘ্নে বাধাহীনভাবে নিজের ঘর থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় মুক্ত চলাচলের স্বাধীনতা পাবেন। ইচ্ছের ডানা মেলে র‌্যাম্প ক্ত যানবাহনে বেড়িয়ে পড়বেন যেখানে সেখানে। তাদের জন্য থাকবে নির্দিষ্ট থামার জায়গা। দুপাশের ফুটপাত হবে ঢালু। শিক্ষালয়ে থাকবে তাদের উপযোগী পরিবেশ। তাদের নিয়ে কাজ করতে গেলে কেউ বলবে না, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ করে নি সিটি করপোরেশন।

 

নিশ্চয়-ই আমাদের নগরপিতাও বিশ্বাস করেন এই বিশাল প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মাঝেও রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। তারা তাদের শারীরিক সীমাবদ্ধতা ডিঙ্গিয়ে সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম আর আমাদের নগরপিতা শুধু এই অনুভবের বীজ বপন করবেন সমাজের আনাচে কানাচে। সন্তানতুল্য এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে একেবারেই বঞ্চিত না রেখে তাদের সমস্যা সমাধানে ধীরে ধীরে প্রত্যয়ী হবেন এই আমাদের বিশ্বাস। আমাদের আরও বিশ্বাস সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই গড়ে উঠবে একদিন আমাদের স্বপ্নের দেশ। অ-প্রতিবন্ধী এবং প্রতিবন্ধী মানুষ নির্বিশেষে সকলের সহায়ক ব্যবস্থা সম্বোলিত বাসযোগ্য বাংলাদেশ।