আমলাতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারিতায় স্থবির অধিকার আইনের বিধি প্রণয়ন বেসরকারি সংস্থার নেতৃবৃন্দ নীরব

49

 

প্রধান প্রতিবেদন

 

রাজনৈতিক নেতৃত্বকে খুশি করতে আমলাতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারিতায় ও বেসরকারি সংস্থার নেতৃবৃন্দের নীরব ভূমিকায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর বিধি প্রণয়ন স্থবির হয়ে আছে। অন্যদিকে অধিকার আইনের এক মাস পরে পাশ হওয়া নিউরো ডেভলাপমেন্টাল সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ এর বিধি দ্রুতই প্রকাশ হতে যাচ্ছে। সমাজ কল্যাণ ও আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকতাদের সাথে আলাপে এই তথ্য বের হয়ে এসেছে।

সমাজকল্যাণ সচিব তরিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন নিউরো ডেভলাপমেন্টাল ট্রাস্ট আইনের বিধির গেজেট প্রকাশের জন্য সরকারি প্রেসে পাঠানো হয়েছে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। অধিকার ও সুরক্ষা আইনের বিধি প্রসঙ্গে তিনি অপরাজেয়কে জানান, এটি এখনও আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং এর প্রতীক্ষায়। কবে নাগাদ সম্পন্ন হবে তিনি জানেন না।

 

জানা যায়, ২০১৩ সালের শুরুতে এই দুই আইনের কোনটি আগে পাশ হবে এমন দ্বন্দ্ব দেখা যায়। জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামসহ বেসরকারি সংস্থার নেতৃবৃন্দ এই জনগোষ্ঠির মূল আইন আগে পাশ করার জোরালো দাবি জানায়। এ সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও মূল আইন প্রথমে পাশ করার প্রতি আগ্রহী ছিলেন।

জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের সভাপতি ও মহাসচিবকে মূল আইনের বিধি বিষয়ে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জানতে চাইলে, তারা এই প্রতিবেদককে প্রথমে জানান আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এই বিধি পাশ হচ্ছে। পরবর্তীতে প্রতিবেদক তাদের তথ্য সম্পর্ক চ্যালেঞ্জ করলে, তারা তাদের ভাষ্য পরিবর্তন করেন। এমন কি অধিকার আইন আগে প্রণীত হওয়া নিয়ে অতীতে যারা সোচ্চার ছিলেন, এ পরিস্থিতিতে নীরব ভূমিকায় সেই নেতারা।

 

এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক যুগ্ম সচিব সুলতান মাহমুদ হজ্জ্ব থেকে ফিরেছেন মাত্র, তাই তিনি কোন মন্তব্য দিতে চান নি এই প্রতিবেদককে। আইন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রফিকুল হাসান হজ্জ্ব করতে যাওয়ায় বর্তমানে এটি যুগ্ম সচিব নরেন দাস এর তত্ত্বাবধানে আছে। তিনি এ প্রসঙ্গে মন্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এদিকে বেসরকারি সংস্থার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের বেশির ভাগের কন্ঠে দ্বৈত নীতি ও বহুমুখী মনোভাব পাওয়া গেছে। কেউ মনে করছেন অধিকার আইনের বিধি দ্রুত প্রণয়নের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়েরই প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। কারো মতে, জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম যথাযথ ভূমিকা পালন করছে না। ফলে এই মূহুর্তে অধিকার আইনের বিধি নিয়ে কন্ঠ তোলার কেউ-ই নেই এমন হতাশাও দেখা গিয়েছে অনেকের মাঝে।

 

সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবিলিটি (সিএসআইডি) এর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহরুল আলম বলেন, এক্ষেত্রে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের ভূমিকা অনেক। কিন্তু সমস্যা হল ফোরাম কিছুই বলে না।

অধিকার আইনের বিধি বিষয়ে বলার মত কন্ঠস্বর আসলে এই মূহুর্তে তেমন নেই, এই মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, আমি ফোরামে থাকলে এমন হত না তা নিশ্চিত করে বলছি।

 

ডিজঅ্যাবিলিটি ইন্টারন্যাশনাল এর নির্বাহী বোর্ডের সদস্য জনাব মনসুর আহমেদ চৌধুরী আক্ষেপ জানিয়ে বলেন, মূল আইনের বিধি প্রসঙ্গে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম এবং অন্যান্যদের ভূমিকা আমাকে অবাক করে দেয়। তাদেরই উচিৎ মন্ত্রী-সচিব পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করে আগামী দুই মাসের মধ্যে এই বিধি কার্যকরের উদ্যোগ নেয়া।

এদিকে অধিকার আইনের বিধি নিয়ে গড়িমসি জন্য সরকারি আমলাদেরকেই দায়ী করছেন ডিপিও নেটওয়ার্ক- প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) এর পরিচালক রফিক জামান। তিনি বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিধি প্রণয়ন প্রক্রিয়া এই বছরেও সম্পূর্ণ হবে কিনা তা নিয়ে আমরা যথেষ্ট সন্দিহান।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ে এক সময়ে বেসরকারি সংস্থার কার্যকর ভূমিকা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন তারা নিজেদের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নিয়ে ব্যস্ত এবং আমলাদের আনুকল্যের প্রতি মনোযোগী। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলোও জাতীয় পর্যায়ে সংগঠিত নয়। ফলে আমলারা এর সুযোগ নিচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক সরকারের উচ্চ পর্যায়ে একজন প্রতিবন্ধী কর্মকর্তা ক্ষোভ নিয়ে বলেন, উন্নয়ন নামের বাণিজ্যের ভাগীদার বেসরকারি সংস্থার নেতৃত্বে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সুরক্ষা কখনও সম্ভব নয়। এই সত্য প্রতিবন্ধী মানুষেরা যতদিন না বুঝবে, ততদিন তাদের অধিকার সুরক্ষা হবে না।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে সম্পর্কহীন আমাদের প্রতিবন্ধী মানুষরা আন্তর্জাতিক নির্দেশনা থাকার পরও অধিকার বঞ্চিত থেকে যাবে। বাস্তবায়িত হবে না মূল আইনের ৩৬ ধারা।

 

দুই আইনের বিধি প্রসঙ্গে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের পরিচালক নাফিসুর রহমান বলেন, ঘোড়ার আগে গাড়ি চলে যাচ্ছে। যা হোক, মূল আইনের বিধি দ্রুত তৈরিতে আমরা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলবো।

নিউরো ডেভলাপমেন্টাল সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন প্রসঙ্গে সরকারের হাতকে ঈশ্বরের হাত আখ্যায়িত করে সুইড বাংলাদেশ এর সভাপতি জওয়াহেরুল ইসলাম মামুন বলেন, আইন থাকে সরকারি আমলাদের হাতে। তাদের মর্জিতেই এর উঠা নামা চলে। আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব করে দিয়েছি, আর কিছুই করার নেই। তিনি আরও বলেন, ট্রাস্ট আইনের বিধির অগ্রগতি চলছে কারণ মন্ত্রণালয় খুব তৎপর। তাছাড়া এই আইন তৎকালীন সচিব নাসিমা বেগমের তড়িৎ হস্তক্ষেপে আগে হয়ে যাচ্ছিলো। আমাদের প্রবল আপত্তির মুখে অধিকার আইন আগে সংসদে উঠে। নতুবা তাও হয়ত হতো না।

 

অপরদিকে সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) এর নির্বাহী পরিচালক এ.এইচ.এম. নোমান খান অপরাজেয়কে জানান, সমাজল্যাণ সচিব তরিকুল ইসলাম ও ফাউন্ডেশন এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসরিন আরা সুরাত আমিন এখনও নতুন। তাই হয়তো তাদের এই বিষয়গুলো বুঝতে খানিকটা সময় লাগছে। বিধি আইন মন্ত্রণালয়ে থাকলেও তাদের প্রতিনিয়ত চাপের মুখে রাখার দায়িত্ব সমাজকল্যাণকেই নিতে হবে। তবে তিনি গেজেটের জন্য কতদিন অপেক্ষা করতে হবে এমন এক প্রশ্নের জবাবে এই প্রতিবেদককে বলেন, এটি আমারও প্রশ্ন।

 

এছাড়া স্থগিত ৩১ ও ৩৬ নং এই দুই ধারা প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন ৩৬ পাশ হওয়া সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, এ বছর পাশ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই অবিলম্বে এই স্থগিত দুই ধারাসহ এই বিধি প্রকাশে সম্মিলিতভাবে সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোকে সোচ্চার হতে হবে।

একই প্রসঙ্গে পিএনএসপি পরিচালক রফিক জামান ৩১ ধারা দ্রুত পাওয়া গেলেও ৩৬ পাশ না হওয়ার পিছনে সরকারি আমলাদের দায়ী করেছেন। তবে ৩৬ পাশ না হলে বৈষম্য রোধ সম্ভব হবে না বলে তিনি জানান।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আইন বাস্তবায়নে জাতীয় সমন্বয় ও জেলা কমিটি গঠনের জন্য সংসদ সদস্যদের তালিকা এসে গেছে। শুধু জাতীয় সমন্বয় কমিটি ও  জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠনের অপেক্ষায়। তবে প্রতিবন্ধী মানুষেরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তাদের জন্য একমাত্র আইনের কমিটিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকছে না।

 

উল্লেখ্য, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে পিএনএসপি এই আইনের কমিটিতে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বের দাবীতে আন্দোলন করে।

চট্টগ্রাম সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ পরিচালক বন্দনা দাশ নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রামের জেলা কমিটির মনোয়ন হয়ে গেছে। এই কমিটিতে মনোনীত হয়েছেন চট্টগ্রামের দুই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের প্রতিনিধি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হেনা আক্তার ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সাজ্জাদ কাওসার।