বাড়ি12th Issue, September 2015হুইলচেয়ারে মুক্ত চলাচল; শুরু হোক নিজের ঘর থেকেই

হুইলচেয়ারে মুক্ত চলাচল; শুরু হোক নিজের ঘর থেকেই

 

সালমা মাহবুব

 

২০০৪ সালে আমরা তখন মগবাজারে ভাড়া বাসায় থাকতাম তখন সিদ্ধেশ্বরীতে আমাদের নতুন বাসার কাজ যখন শুরু হয়। হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে গিয়ে আমাকে বেশ কিছু সমস্যায় পড়তে হতো। বিশেষত র‌্যাম্পের অভাবে সব জায়গায় যেতে না পারা। নিজে নিজে এক সিট থেকে অন্য সিটে, যেমন বিছানা থেকে চেয়ারে বা চেয়ার থেকে বিছানায় কারও সাহায্য ছাড়া উঠতে বা নামতে না পারা, টয়লেটের দরজা চাপা হওয়ার কারণে চেয়ারটি নিয়ে সেখানে প্রবেশে সমস্যা ইত্যাদি। প্রতি মুহুর্তেই প্রত্যেকের কাছে অনেক সাহায্য নিতে হতো আমার। আর সবসময় ভাবতাম ভাড়া বাসায় স্বাধীন চলাচলে আমার যে প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়েছে তা নিজের বাড়িতে থাকবে না।

 

সেখানে আমি একাই টয়লেটে যেতে পারবো। কারও সাহায্য লাগবে না, শুধু দরজাটি চওড়া হতে হবে আমার হুইলচেয়ারটি ঢোকার জন্য। আর দরজার চৌকাঠটি হতে হবে নিচু, ব্যস। হুইলচেয়ার নিয়ে আরও সহজভাবে টয়লেটে প্রবেশের সমস্যাটি সমাধান করা যায়, দরজা চওড়া করার পাশাপাশি, যদি চৌকাঠ না দিয়ে ঘরের মেঝে থেকে টয়লেটের মেঝেটি এক থেকে দেড় ইঞ্চি নামিয়ে দেয়া অথবা ঢালু করে দেয়া যেতে পারে। তবে এই বিষয়টি ঐ সময় আমার জানা ছিল না। বাইরের দেশগুলোতে হুইলচেয়ার প্রবেশগম্য ঘরের জন্য তাই করা হয়।

যা হোক, নতুন বাসাটিতে আমার টয়লেটের সাথেই লাগোয়া বারান্দা। ওপাশে বিশাল খেলার মাঠ। বারান্দাটাও বেশ বড়। ভেবেছিলাম যখন তখন চলে যাব বারান্দায়। শিশুকিশোরদের উচ্ছল প্রাণবন্ত ছুটোছুটি দেখবো। নিজে তো কখনো এ সুযোগ পাই নি। এসব দেখতে দেখতে চায়ের সাথে বিকেলটা আমার ভালোই কাটবে। কিংবা একটু মুক্ত হাওয়ার স্বাদ নেয়া যাবে। অথবা মন খুব খারাপ হলে চলে যাব ছাদে। খোলা বিশাল আকাশের নীচে বুক ভরে শ্বাস নিতে। সেখানে লিফট তো রয়েছেই। সেই সময়টায় আমার বাইরের জগতের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। তখন আমি ঘর থেকে বের হতাম খুবই কম। হয়তো বছরে দুবার কি তিনবার। তাই এই সামান্য চাওয়াগুলো আমার কাছে আকাশসম ছিল। দুঃখের বিষয় এর কোনটিই পূরণ হয় নি।

 

নতুন বাসায় এসে আমার স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। আমার টয়লেটের চৌকাঠ ঘরের মেঝে থেকে ৩ ইঞ্চি উঁচু। দরজা যথেষ্ট চওড়া নয়। আমার ঘর থেকে বারান্দা যাবার পথে ৪ ইঞ্চি উঁচু চৌকাঠ। যদিও স্লাডিং গ্লাস ডোর দেয়া, যার ট্রেইলটি সাধারণত মাটির সাথে মেশানো বা ১ ইঞ্চির বেশি উঁচু হয় না। কিন্তু আমাদের ডেভেলপাররা কেন ৪ ইঞ্চি উঁচু চৌকাঠ দিয়ে এমনটি করলেন তা তারাই ভাল জানেন। অনেক অনুরোধ করেও তাদের মত পাল্টানো গেল না। বারান্দার দেয়ালটিও তৈরি করা হলো মেঝে থেকে আড়াই ফিট উচ্চতায়। তাই আমার ঘরে বসে বা বারান্দায় গিয়েও হুইলচেয়ারে বসে সেই খেলার মাঠটি দেখা যায় না। শুধু ছেলেদের হৈ চৈ এর আওয়াজ ভেসে আসে। আর ছাদ, সে তো সোনার হরিণ! আমাদের ভবনটি দশতলা আর লিফট শেষ হয়ে গেছে নয়তলায় এসে। বাকি একতলা পায়ে হেঁটে উঠতে হয়, নিরাপত্তার কারণে। নিজ গৃহেও তাই নিজের চলাচলের স্বাধীনতা আর তৈরি হলো না। নতুন বাসায় এসেও রয়ে গেলাম সেই বন্দী জীবনেই।

 

সব সময়ই ভাবতাম এই অসুবিধাগুলো কি করে দূর করতে পারি। বাসায় ইন্টানেট সংযোগ নেবার পর শুরু হলো নতুন জীবন। নিজেকে নিয়ে নতুন করে ভাবনা। এই দেশের কোন কিছু আমাদের জন্য তৈরি হবে না। হলেও কবে হবে তা জানা নেই। তাই যা আছে তার মাঝেই খুঁজে নিতে হবে নিজের পথ। তাই প্রথমে নতুন একটি হুইলচেয়ার কিনে সিআরপি থেকে নিজের সুবিধা অনুযায়ী কিছু মডিফিকেশেন করে নিলাম। নিজেদের অজ্ঞতাও অনেকটা আমাদের চলার পথকে কঠিন করে রাখে। যেমন আমি জানতাম না কি করে টয়লেটের দরজার সামনের উঁচু চৌকাঠের সাথে একটি বহনযোগ্য র‌্যাম্প আমার এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে। যা কাঠ দিয়ে নিজেরাই তৈরি করে নেয়া যায়। অনলাইন থেকে হুইলচেয়ারে সহজ জীবন যাপনের পদ্ধতি স¤পর্কে এমন অনেক কিছু জানা হলো। বহিঃর্বিশ্বে আমাদের চলাচলের বিভিন্ন সহায়ক ব্যবস্থা দেখে উদ্যোগি হলাম নিজের ঘরেই সেই রকম কিছু ব্যবস্থা নিজের জন্য তৈরি করে নিতে।

 

লিফটের সামনের সিঁড়ি দুটি দিয়ে শুরু আমার এই যাত্রা। খুব সামান্য এই উদ্যোগ। কিছু মানুষকে এর উপকারিতা বোঝানো। মাত্র অল্প কিছু টাকা, আড়াই হাজার টাকায় একটি র‌্যাম্প। হাঁ, আমার ভবনে লিফট পর্যন্ত পৌঁছুতে বা লিফট থেকে বের হয়ে ঐ সিঁড়ি দু’টো পার হতে হয়। মাত্র দুটো করে সিঁড়ি, একটি সম্মুখে আর একটি পাশে। ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানটি খুব সহজেই একটি র‌্যাম্প সেখানে করে দিতে পারতেন। কিন্তু করেন নি। এখন যেমন বলা হচ্ছে লিফট পর্যন্ত পৌছুতে র‌্যাম্প থাকতে হবে। ২০০৪ সালে তখন ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় এটা ছিল না। এখন থাকলেও বা কজনে তা মানছেন!

যা হোক, র‌্যাম্প তৈরির শুরুটা খুব একটা সহজ ছিলো না। এটা ২০০৯ সালের কথা! দশতলা ভবনের প্রতিটা ফ্ল্যাটের সবার মতামত নেবার জন্য এক এক করে তাদের ঘরে গেলাম। তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম র‌্যাম্প কি জিনিস। এর উপকারিতা কি! এবং এই র‌্যা¤পটি যে শুধু একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী বা আমার একার কাজেই লাগবে তা নয়। একজন বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী মহিলা সবার জন্য প্রয়োজনীয় এটি। আমার ভাল লেগেছিল তারা কেউ আমার কাজে ‘না’ বলেন নি। বরং উৎসাহ দিয়েছেন। একজন তো বললেন, একবার তাকে হাসপাতাল থেকে হুইলচেয়ারে ফিরতে হয়েছিল, তখন ভীষণ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিলে হুইলচেয়ারসহ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে।

 

প্রতিবেশীদের আন্তরিক স্বদিচ্ছে থাকায় সবাইকে বোঝানো আমার জন্য সহজ হয়েছিলে এবং ১৫ই ডিসেম্বর ২০১০ সিদ্ধেশ্বরীর ডম ইনো পেশিওর এই ফ্ল্যাট বাড়িতে র‌্যম্পতৈরির কাজ স¤পন্ন হলো। যা ছিল আমাদের সংগঠন বি-স্ক্যান থেকে প্রথম মাঠ পর্যায়ের অ্যাডভোকেসিমূলক কাজ। যারা আমায় এই কাজে সহযোগিতা করেছেন আমি তাদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ।

এর পাশাপাশি আমার টয়লেটের সামনেও একটি বহনযোগ্য কাঠের র‌্যাম্প তৈরি করিয়ে নিয়েছিলাম স্বাধীন ও মুক্ত চলাচলের উদ্দেশ্যে। তবে বারান্দায় যাওয়ার র‌্যাম্পটি আমি তৈরি করতে পারি নি ঘরে যথেষ্ট জায়গা না থাকার কারণে।

 

সামান্য সচেতনতা, কিছু সম্মিলিত উদ্যোগ পালটে দিতে পারে প্রতিবন্ধী মানুষের পথের প্রতিবন্ধকতা। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নিজের ঘরেও এমন ছোট ছোট প্রচেষ্টা উদ্যোগ সবাই যদি নিতে শুরু করে প্রবেশগম্যতা নিয়ে সমস্যার চিত্রটা পাল্টে যেতে সময় লাগবে না খুব একটা।

সর্বশেষ

বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে শিক্ষা উপকরণ সংকট; নানামুখী সমস্যায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা

অপরাজেয় প্রতিবেদক পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সঠিক রঙের ব্যবহার, সহায়ক উপকরণ, ইন্ডিকেটর বা সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণে সহায়ক সফটওয়্যার ও অডিও বইয়ের অভাবসহ নানামুখী সমস্যার কারণে সাধারণ...

মাসিক আর্কাইভ

Translate | অনুবাদ