বাড়ি13th issue, December 2015ক্ষমতায়নের স্বপ্নে

ক্ষমতায়নের স্বপ্নে

 

সাবরিনা সুলতানা

 

বছর কয়েক আগের এক পড়ন্ত দুপুর। কমলাপুর স্টেশনে কোন এক ট্রেনের জানালার ধারে বসে আছি। গভীর মনোযোগে স্টেশনের কর্মব্যস্ততা দেখছি। যেকোন মূহুর্তেই ছাড়বে ট্রেনটা। চিন্তিত ভঙ্গিতে লাগেজ সমেত যাত্রীদের হুড়োহুড়ি ছুটোছুটি। রকমারি পণ্য নিয়ে ফেরিওয়ালাদের হাঁকাহাঁকি। অসংখ্য অগুনতি মানুষ পিলপিল করে ছুটছে। রাস্তায় বেরুলেই মানুষ দেখতে ইচ্ছে হয় আমার। তাদের দেখে রঙ বেরঙের গল্পকথা মাথায় ঘোরে। প্রতিজনেরই নিশ্চয় হরেক রঙের গল্প আছে, যেমন আছে আমার। সেই গল্পগুলো ভাবতে ইচ্ছে হয়। জানতে ইচ্ছে হয়। বুঝতে ইচ্ছে হয়। আমি রোজ মানুষগুলোকে দেখি। প্রতি নিয়তই দেখছি। নতুন কিছু শিখছি। ভালো মন্দের পাঁচ মিশালী অভিজ্ঞতা হচ্ছে।

 

সেদিন ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগ মূহুর্তে আপু আপু রবে ছুটতে ছুটতে আমার জানালার কাছে থমকে দাঁড়িয়েছিলো এক ছেলে। আমাকে দেখা মাত্রই তার কালো ফ্রেমের মোটা চশমার আড়ালে এক চিলতে হাসির ছোঁয়া। কিছু একটা হাতের মুঠে গুজে দিতে দিতে লাজুক মুখে বলেছিলো, ‘ট্রেন ছেড়ে দিলে এটা পইড়ো আপু, আর সময় করে উত্তর দিও কিন্তু’।

পৃষ্ঠা জুড়ে গুটি গুটি হরফে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাস্তবতায় ছোঁয়া নির্মম কিছু আবেগীপনা। ক্ষণে ক্ষণে রঙ পাল্টানো আবেগগুলো নির্মমই হয়। এতেও তাই ছিলো। টুকরো টুকরা আবেগে আমার আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার! আমি খুশিতে আঁটখানা হয়ে বহু বছরের অনভ্যস্ত কাঁপা কাঁপা হাতে কলম ধরেছিলাম। কিন্তু ততদিনে হয়তো আমার উত্তরের প্রয়োজনীয়তা তার কাছে ফুরিয়েছিলো। এমন অঙ্গীকার বহুবার বহুজনেই করেছে। আবেগ তাড়িত কণ্ঠে জানিয়েছে, সাথে আছি। পাশে আছি। আমৃত্যু থাকবো। অঙ্গীকার ভেঙ্গেছে। আমার স্বপ্ন দেখার মাত্রা কমে নি। তবে- যেখানে পরিবর্তনশীলতাই মানুষের ধর্ম, সেখানে মিছেই কেনো আবেগী অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় মানুষগুলো?! এমন আবেগী প্রশ্নরা মনে ভীর যে করে নি তা নয়।

 

তাই সম্ভবত মাঝে সাঝে চিৎকার দিয়ে জানান দিতে ইচ্ছে হয়েছে, স্বপ্ন দেখানোর আগে সেটা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেবার সাহস নিয়ে সামনে এসো, নতুবা তফাৎ হাঁটো।

এই দেশ, রাষ্ট্র তথা সমাজব্যবস্থা প্রতি নিয়ত তাই করে যায়। স্বপ্ন দেখিয়ে ভুলে যায়। হাততালি দিয়ে স্বাগত জানিয়ে আমরাও ভুলে গিয়ে নতুন কোন স্বপ্নে মেতে উঠি। কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়ে পাল্টা প্রশ্ন কী ছুড়ে দিতে চেষ্টা করেছি কখনো?!

 

আমিও স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। স্বপ্নের মাঝে লাগামহীন ইচ্ছে পূরণ করা যায়! কিন্তু তার মানে এই নয় যে স্বপ্নের বাস্তবায়ন অসম্ভব। অসম্ভব শব্দটি আসলে আমাকে তেমন একটা নাড়া দেয় নি কখনো। হয়তো তাই স্বপ্নের বাস্তবায়নে বাস্তব – অবাস্তব যে কোন কিছুর পিছেই প্রাণপনে ছোটার দুঃসাহস ভর করে মনে। বাধা-সমস্যা, পূরণ হবে- কি না ইত্যাকার কোন ভাবনাই মাথায় লাগে না। তেমনই এক প্রতিবন্ধী মানুষের বাসযোগ্য বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি আমি যেখানে নেই কোন মতবাদ-ভেদাভেদ। নেই কোন বঞ্চনা, অমানবিক জীবন বয়ে বেড়ানোর নিদারুণ যন্ত্রণা। আছে কেবলি সম অধিকার। ফিনিক্স পাখির মতোন উড়ে চলার স্বপ্ন নিয়ে যেখানে সেখানে প্রবেশাধিকার। যে কোন যানবাহনে তড়তড়িয়ে উঠে পড়া। সহপাঠির সাথে খুনসুটি, টিচারের বকুনি…অতঃপর স্কুল মাঠের কড়কড়ে রোদ্দুরে কান লাল করা শাস্তি! বাবা মায়ের মৃদু শাসন, অতি আদরে বেড়ে ওঠা। কখন যেনো ভাইয়া আপুদের হাত ধরে প্রতিযোগিতার এ সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠার তীব্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যাওয়া।

 

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর নিতান্তই হাতে গোনা অল্পসংখ্যক মানুষ সমাজের বিভিন্ন বাধাগুলোর সাথে অসম্ভব এক প্রতিকূলতার মাঝে লড়াই করে নিজেকে যোগ্য প্রমাণের চেষ্টা করে চলেছেন অবিরাম। আর বাকিরা নিজেদের শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অক্ষমতা ভেবে নিজের ভাগ্যকেই দোষারোপ করে যাচ্ছেন। বাবা মা পরিবার তথা সমাজের কটাক্ষকে নিয়তি ধরে তীব্র হতাশায় নিজের ভেতর গুটিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন নতুবা পরনির্ভরশীলতায় ভর করে জীবন ধারণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। হতাশা বরাবরই বিলাসিতা আমার কাছে। পরিবার তথা সমাজের “তুমি পারবে না” “তুমি করো না” এই শুনে শুনেই বেড়ে ওঠা এই মানুষেরা নিজেদের অযোগ্য ভাবতে বাধ্য হওয়াটা সমাজ ব্যবস্থাকেই কি দায়ী করে না?!

 

আবার যদি নিজেকে পাল্টা প্রশ্ন করি! আমরা নিজেদের অবস্থার জন্য কতটা দায়ী? কতটা সচেতন নিজের অধিকার স¤পর্কে বা আরো সহজ করে বলা যায়, প্রতি মূহুর্তের বেঁচে থাকাকে উপভোগ্য করতে কতটা সচেষ্ট আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা? প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোর (ডিপিও) দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিজেদের অধিকার বিষয়ে সচেতন হওয়ার জন্য আমরা কতটা সচেষ্ট? নিজের প্রতি এই প্রশ্নগুলো ছুড়ে দেয়া আমার কাছে বেশ জরুরি মনে হয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল –

 

Inclusion matters: access and empowerment for people of all abilities,

“একীভূতকরণ: সামর্থ্য নির্বিশেষে প্রতিবন্ধী মানুষসহ সকলের প্রবেশাধিকার ও ক্ষমতায়ন”।

 

 

এক সময় সারা বিশ্বে প্রতিবন্ধী মানুষের মর্যাদা সমুন্নত রাখতেই এবং সিআরপিডি বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন করে ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর ডিজঅ্যাবিলিটি (আইডিডি) এই নামকরণ পরিবর্তিত হয়ে ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর পারসনস উইথ ডিজএ্যাবিলিটিজ (আইডিপিডি) করা হয়েছিলো।

কিন্তু আজ অবধি আমাদের দেশে “আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস” সেই পুরনো নামেই পালিত হয় দিনটি। বিষয়টি ভাবায় বটে! আমরা কি তবে নতুনত্বকে ভয় পাই! পরিবর্তনে অস্বস্তিবোধ করি?! প্রশ্ন এসেই যায়, যারা প্রতিবন্ধী মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে অটল তারা আসলে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার বা মর্যাদা বাস্তবায়নে সত্যিই উদ্যোগী??

 

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও মর্যাদার সুরক্ষায় কল্যাণ আইন ২০০১ এর পালা সাঙ্গ করে সিআরপিডি এর আলোকে গঠিত হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩। দীর্ঘ দুই বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এই আইনের বিধিমালা প্রকাশিত হল গেজেট আকারে। আইনসহ নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের সর্বস্তরের কমিটিতে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বের জোরালো দাবীও মেনে নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে সকল জেলা কমিটিতে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের জন্য পরিপত্র জারি করা হয়েছে দেশের সবগুলো জেলাতে।

বর্তমান সরকার বৈষম্য পীড়িত মানুষের জন্য অতুলনীয় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়নও দেখা যাচ্ছে। সরকারের বড় সাফল্য নারীর ক্ষমতায়ন। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে প্রতিবন্ধী মানুষ! এইভাবে আমরা কি ভাবতে শিখেছি?!

 

আজ যদি সরকারের কাছে প্রতিবন্ধী মানুষেরা জানতে চেয়ে বসেন, সিআরপিডি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়নে তা কতটুকু?? সরকারের নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী মানুষের সেবা, অধিকার আইন, তাদের জন্য অনেক কিছু করার চেষ্টা দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়নের বিষয়টি নিয়ে সরকারের ভূমিকা কী?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে সরকার যে দারুণ ভাবে প্রস্তুত তা কি আমরা ভেবেছি কখনো!

 

সুপ্রিয় পাঠক আপনি মোটেও এমন ভাবতে পারবেন না, সরকারি পর্যায়ে কিছু কর্মসংস্থান ছাড়া আর কোনভাবেই সরকার প্রতিবন্ধী মানুষকে ক্ষমতায়িত করে নি। আপনি একেবারেই বলতে পারবেন না প্রতিবন্ধী কোটা, নিয়োগ বা বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধি ছাড়া কিছুই তো নেই কোথাও। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার বিষয়ে সরকার যতটা ভাবাতে পেরেছে সমাজকে কিন্তু তারা নিজেরা ক্ষমতায়িত হয়ে নীতি নির্ধারণীর জায়গায় বসে নিজেদের অধিকার সুরক্ষায় কাজ করবে এমনই এক ধরণের ভাবনা পাচ্ছি সরকার কর্তৃক প্রণীত আমাদের নতুন আইনে।

এতে দেখা যাচ্ছে সরকার প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে একীভূত সমাজ গঠনে বদ্ধপরিকর। যদি সত্যিই এর বাস্তবায়ন করা যায়, সঠিকভাবে বলা দরকার, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে আর বলার অপেক্ষা রাখে না প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনযাত্রায় সত্যিই অকল্পনীয় অবদান রাখবে।

তবে প্রতিবন্ধী মানুষকেও জানতে হবে, ভাবতে হবে এবং ভাবাতে হবে এই আইনে আসলে কী রয়েছে।

 

আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা নিজেরা কী ভাবতে শিখেছি, আমরাও প্রতিনিধিত্ব করতে পারি?! নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই দিয়ে নেতৃত্ব চর্চার শুরু করতে পারি?! এই আইনে সকল মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে এই সমাজের সকল স্তরে, সকল ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও। এই আইনের সকল কমিটিতে প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ সংরক্ষণ অর্থাৎ তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।

আমরা সরকারের আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সিআরপিডি মনিটরিং কমিটিতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা তাদের সংগঠনের কোন প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা রাখতেই পারি। এমনকি জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটিতেও বেসরকারি প্রতিনিধির মধ্যে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব দেখি নি। কিন্তু এই আইনের ৬৪টি জেলায় ৬৪টি কমিটির প্রতিটি  একজন নারী ও একজন পুরুষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। এখানেই শেষ নয়, সারা দেশের ৪৮৭ টি উপজেলার প্রতিটি কমিটি এবং অন্যান্য শহর কমিটিগুলো মিলিয়ে দেশে অন্তত প্রায় ৬০০ এর মতো কমিটি গঠন হবার কথা যাতে অবশ্যই প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

 

আমরা কী ভাবতে পারি, আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা সরকারী প্রতিনিধিত্বে অথবা রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়নে যুগান্তকারী এক পরিবর্তন ঘটাতে পারি?

সর্বশেষ

বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে শিক্ষা উপকরণ সংকট; নানামুখী সমস্যায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা

অপরাজেয় প্রতিবেদক পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সঠিক রঙের ব্যবহার, সহায়ক উপকরণ, ইন্ডিকেটর বা সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণে সহায়ক সফটওয়্যার ও অডিও বইয়ের অভাবসহ নানামুখী সমস্যার কারণে সাধারণ...

মাসিক আর্কাইভ

Translate | অনুবাদ